মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০১৪

ফতোওয়া ঈমান: ঈমান সম্পর্কে অতি গুরুত্বপূর্ণ ১২০টি প্রশ্নোত্তর (১ম পর্ব)

ফতোওয়া ঈমান: ঈমান সম্পর্কে অতি গুরুত্বপূর্ণ ১২০টি প্রশ্নোত্তর (১ম পর্ব)



ফতোওয়া ঈমান: ঈমান সম্পর্কে অতি গুরুত্বপূর্ণ ১২০টি প্রশ্নোত্তর (১ম পর্ব)
মূল: শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন (রহ.)
অনুবাদক: মুহাঃ আব্দুল্লাহ আল-কাফী ও আব্দুল্লাহ শাহেদ আল-মাদানী 



প্রশ্নঃ (১) তাওহীদ কাকে বলে? উহা কত প্রকার ও কি কি?
উত্তরঃ তাওহীদ শব্দটি (وحد) ক্রিয়ামূল থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এর আভিধানিক অর্থ কোন জিনিসকে একক হিসাবে নির্ধারণ করা। ‘না’ বাচক ও ‘হ্যাঁ’ বাচক উক্তি ব্যতীত এটির বাস্তবায়ন হওয়া সম্ভব নয়। 

অর্থাৎ একককৃত বস্ত ব্যতীত অন্য বস্ত হতে কোন বিধানকে অস্বীকার করে একককৃত বস্তর জন্য তা সাব্যস্ত করা। উদাহরণ স্বরূপ আমরা বলব, “আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মা’বূদ নেই” একথার সাক্ষ্য দেয়া ব্যতীত কোন ব্যক্তির তাওহীদ পূর্ণ হবে না। যে ব্যক্তি এই সাক্ষ্য প্রদান করবে, সে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য সকল বস্ত হতে উলুহিয়্যাতকে (ইবাদত) অস্বীকার করে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত করবে। কারণ শুধুমাত্র নাফী বা ‘না’ বাচক বাক্যের মাধ্যমে কোন বস্তকে গুণাগুণ থেকে মুক্ত করা হয়। আর শুধুমাত্র ‘হ্যাঁ’ বাচক বাক্যের মাধ্যমে কোন বস্তর জন্য কোন বিধান সাব্যস্ত করলে সেই বিধানে অন্যের অংশ গ্রহণকে বাধা প্রদান করে না। যেমন উদাহরণ স্বরূপ যদি আপনি বলেন, ‘অমুক ব্যক্তি দাঁড়ানো’। এই বাক্যে আপনি তার জন্য দন্ডায়মান হওয়াকে সাব্যস্ত করলেন। তবে আপনি তাকে দন্ডায়মান গুণের মাধ্যমে একক হিসাবে সাব্যস্ত করলেন না। হতে পারে এই গুণের মাঝে অন্যরাও শরীক আছে। অর্থাৎ অমুক ব্যক্তির সাথে অন্যান্য ব্যক্তিগণও দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। আর যদি বল, “যায়েদ ব্যতীত আর কেউ দাঁড়ানো নেই” তবে আপনি দন্ডায়মান হওয়াকে শুধুমাত্র যায়েদের সাথে সীমিত করে দিলেন। এই বাক্যে আপনি দন্ডায়মানের মাধ্যমে যায়েদকে একক করে দিলেন এবং দাঁড়ানো গুণটিকে যায়েদ ব্যতীত অন্যের জন্য হওয়াকে অস্বীকার করলেন। এভাবেই তাওহীদের প্রকৃত রূপ বাস্তবায়ন হয়ে থাকে। অর্থাৎ নাফী (না বোধক) ও ইছবাত (হ্যাঁ বোধক) বাক্যের সমন্বয় ব্যতীত তাওহীদ কখনো প্রকৃত তাওহীদ হিসাবে গণ্য হবে না। মুসলিম বিদ্বানগণ তাওহীদকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেন।

১)      তাওহীদুর্‌ রুবূবীয়্যাহ
২)      তাওহীদুল উলুহীয়্যাহ
৩)      তাওহীদুল আসমা অস্‌ সিফাত

   কুরআন ও হাদীছ গভীরভাবে গবেষণা করে আলেমগণ এই সিদ্ধানে- উপনীত হয়েছেন যে, তাওহীদ উপরোক্ত তিন প্রকারের মাঝে সীমিত।

প্রথমতঃ তাওহীদে রুবূবীয়্যার বিস্তারিত পরিচয়ঃ

   সৃষ্টি, রাজত্ব, কর্তৃত্ব ও পরিচালনায় আল্লাহকে এক হিসাবে বিশ্বাস করার নাম তাওহীদে রুবূবীয়্যাহ্‌।

১- সৃষ্টিতে আল্লাহর একত্বঃ আল্লাহ একাই সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা। তিনি ছাড়া অন্য কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
) هَلْ مِنْ خَالِقٍ غَيْرُ اللَّهِ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالاَرْضِ لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ (
“আল্লাহ ছাড়া কোন স্রষ্টা আছে কি? যে তোমাদেরকে আকাশ ও জমিন হতে জীবিকা প্রদান করে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মা’বূদ নেই।” (সূরা ফাতিরঃ ৩) কাফিরদের অন্তসার শুন্য মা’বূদদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে আল্লাহ বলেন,
 )أَفَمَنْ يَخْلُقُ كَمَنْ لاَ يَخْلُقُ أَفَلاَ تَذَكَّرُوْنَ(
“সুতরাং যিনি সৃষ্টি করেন, তিনি কি তারই মত, যে সৃষ্টি করে না? তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না?” (সূরা নাহলঃ ১৭) সুতরাং আল্লাহ তাআ’লাই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। তিনি সকল বস্ত সৃষ্টি করেছেন এবং সুবিন্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তাআ’লার কর্ম এবং মাখলুকাতের কর্ম সবই আল্লাহর সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। তাই আল্লাহ তাআ’লা মানুষের কর্মসমূহও সৃষ্টি করেছেন্ত একথার উপর ঈমান আনলেই তাকদীরের উপর ঈমান আনা পূর্ণতা লাভ করবে। যেমন আল্লাহ বলেছেন,
)وَ اللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُوْنَ(
“আল্লাহ তোমাদেরকে এবং তোমাদের কর্মসমূহকেও সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আস্তসাফ্‌ফাতঃ ৯৬) মানুষের কাজসমূহ মানুষের গুণের অন্তর্ভুক্ত। আর মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি। কোন জিনিষের স্রষ্টা উক্ত জিনিষের গুণাবলীরও স্রষ্টা।

যদি বলা হয় আল্লাহ ছাড়া অন্যের ক্ষেত্রেও তো সৃষ্টি কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেছেন,
)تَبَارَكَ اللَّهُ اَحْسَنُ الْخَالِقِيْنَ (
“আল্লাহ সৃষ্টিকর্তাদের মধ্যে উত্তম সৃষ্টিকর্তা।” (সূরা মুমিনূনঃ ১৪) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, কিয়ামতের দিন ছবি অংকনকারীদেরকে বলা হবে, তোমরা দুনিয়াতে যা সৃষ্টি করেছিলে, তাতে রূহের সঞ্চার কর। উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তর এই যে, আল্লাহর মত করে কোন মানুষ কিছু সৃষ্টি করতে অক্ষম। মানুষের পক্ষে কোন অসি-ত্বহীনকে অসি-ত্ব দেয়া সম্ভব নয়। কোন মৃত প্রাণীকেও জীবন দান করা সম্ভব নয়। আল্লাহ ছাড়া অন্যের তৈরী করার অর্থ হল নিছক পরিবর্তন করা এবং এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত করা মাত্র। মূলতঃ তা আল্লাহরই সৃষ্টি। ফটোগ্রাফার যখন কোন বস্তর ছবি তুলে, তখন সে উহাকে সৃষ্টি করে না। বরং বস্তটিকে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তন করে মাত্র। যেমন মানুষ মাটি দিয়ে পাখির আকৃতি তৈরী করে এবং অন্যান্য জীব-জন্তু বানায়। সাদা কাগজকে রঙ্গীন কাগজে পরিণত করে। এখানে মূল বস্ত তথা কালি, রং ও সাদা কাগজ সবই তো আল্লাহর সৃষ্টি। এখানেই আল্লাহর সৃষ্টি এবং মানুষের সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে উঠে।

২- রাজত্বে আল্লাহর একত্বঃ মহান রাজাধিরাজ একমাত্র আল্লাহ তাআ’লা। তিনি বলেনঃ
)تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ(
“সেই মহান সত্বা অতীব বরকতময়, যার হাতে রয়েছে সকল রাজত্ব। আর তিনি প্রতিটি বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান।” (সূরা মুলকঃ ১) আল্লাহ আরো বলেন,
)قُلْ مَنْ بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيْهِ(
“হে নবী! আপনি জিজ্ঞাসা করুন, সব কিছুর কর্তৃত্ব কার হাতে? যিনি আশ্রয় দান করেন এবং যার উপর কোন আশ্রয় দাতা নেই।” (সূরা মুমিনূনঃ ৮৮) সুতরাং সর্ব সাধারণের বাদশাহ একমাত্র আল্লাহ তাআ’লা। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে বাদশাহ বলা হলে তা সীমিত অর্থে বুঝতে হবে। আল্লাহ তাআ’লা অন্যের জন্যেও রাজত্ব ও কর্তৃত্ব সাব্যস্ত করেছেন। তবে তা সীমিত অর্থে। যেমন তিনি বলেন,
)أَوْ مَا مَلَكْتُمْ مَفَاتِحَهُ(
“অথবা তোমরা যার চাবি-কাঠির (নিয়ন্ত্রনের) মালিক হয়েছো।” (সূরা নূরঃ ৬১)

আল্লাহ আরো বলেনঃ
)إِلا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ(
“তবে তোমাদের স্ত্রীগণ অথবা তোমাদের আয়ত্বধীন দাসীগণ ব্যতীত।” (সূরা মুমিনূনঃ ৬) আরো অনেক দলীলের মাধ্যমে জানা যায় যে, আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরও রাজত্ব রয়েছে। তবে এই রাজত্ব আল্লাহর রাজত্বের মত নয়। সেটা অসম্পূর্ণ রাজত্ব। তা ব্যাপক রাজত্ব নয়। বরং তা একটা নির্দিষ্ট সীমা রেখার ভিতরে। তাই উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, যায়েদের বাড়ীতে রয়েছে একমাত্র যায়েদেরই কর্তৃত্ব ও রাজত্ব। তাতে আমরের হস্তক্ষেপ করার কোন ক্ষমতা নেই এবং বিপরীত পক্ষে আমরের বাড়ীতে যায়েদও কোন হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তারপরও মানুষ আপন মালিকানাধীন বস্তর উপর আল্লাহ প্রদত্ত নির্ধারিত সীমা-রেখার ভিতরে থেকে তাঁর আইন্তকানুন মেনেই রাজত্ব করে থাকে। এজন্যই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অকারণে সম্পদ বিনষ্ট করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمْ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَامًا(
“যে সমস্ত ধন্তসম্পদ আল্লাহ তোমাদের জীবন ধারণের উপকরণ স্বরূপ দান করেছেন, তা তোমরা নির্বোধ লোকদের হাতে তুলে দিওনা।” (সূরা নিসাঃ ৫) মানুষের রাজত্ব ও মুলূকিয়ত খুবই সীমিত। আর আল্লাহর মালিকান ও রাজত্ব সর্বব্যাপী এবং সকল বস্তকে বেষ্টনকারী। তিনি তাঁর রাজত্বে যা ইচ্ছা, তাই করেন। তাঁর কর্মের কৈফিয়ত তলব করার মত কেউ নেই। অথচ সকল মানুষ তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।

৩- পরিচালনায় আল্লাহর একত্বঃ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এক ও অদ্বিতীয় ব্যবস্থাপক এবং পরিচালক। তিনি সকল মাখলূকাত এবং আসমান্তযমিনের সব কিছু পরিচালনা করেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
)أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ(
“সৃষ্টি করা ও আদেশ দানের মালিক একমাত্র তিনি। বিশ্ব জগতের প্রতিপালক আল্লাহ তা’আলা অতীব বরকতময়।” (সূরা আ’রাফঃ ৫৪) আল্লাহর এই পরিচালনা সর্বব্যাপী। কোন শক্তিই আল্লাহর পরিচালনাকে রুখে দাঁড়তে পারে না। কোন কোন মাখলূকের জন্যও কিছু কিছু পরিচালনার অধিকার থাকে। যেমন মানুষ তার ধন্তসম্পদ, সন্তান্তসন্ততি এবং কর্মচারীদের উপর কর্তৃত্ব করে থাকে। কিন্তু এ কর্তৃত্ব নির্দিষ্ট একটি সীমার ভিতরে। উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমাদের বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণিত হল যে, তাওহীদে রুবূবীয়্যাতের অর্থ সৃষ্টি, রাজত্ব এবং পরিচালনায় আল্লাহকে একক হিসাবে বিশ্বাস করা।

দ্বিতীয়তঃ তাওহীদুল উলুহীয়্যাহ্‌ঃ

   এককভাবে আল্লাহর এবাদত করার নাম তাওহীদে উলুহীয়্যাহ। মানুষ যেভাবে আল্লাহর এবাদত করে এবং নৈকট্য হাসিলের চেষ্টা করে, অনুরূপ অন্য কাউকে এবাদতের জন্য গ্রহণ না করা। তাওহীদে উলুহীয়্যাতের ভিতরেই ছিল আরবের মুশরিকদের গোমরাহী। এ তাওহীদে উলূহিয়াকে ক্রেন্দ্র করেই তাদের সাথে জিহাদ করে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের জান্তমাল, ঘরবাড়ী ও জমি-জায়গা হরণ হালাল মনে করেছিলেন। তাদের নারী-শিশুদেরকে দাস্তদাসীতে পরিণত করেছিলেন। এই প্রকার তাওহীদ দিয়েই আল্লাহ তাআ’লা রাসূলগণকে প্রেরণ করেছিলেন এবং সমস্ত আসমানী কিতাব নাযিল করেছেন। যদিও তাওহীদে রুবূবীয়্যাত এবং তাওহীদে আসমা ওয়াস্‌ সিফাতও নবীদের দাওয়াতের বিষয়বস্ত ছিল, কিন্তু অধিকাংশ সময়ই নবীগণ তাদের স্বজাতীয় লোকদেরকে তাওহীদে উলুহীয়্যার প্রতি আহবান জানাতেন। মানুষ যাতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য এবাদতের কোন অংশই পেশ না করে, সদাসর্বদা রাসূলগণ তাদের উম্মতদেরকে এই আদেশই দিতেন। চাই সে হোক নৈকট্যশীল ফেরেশতা, আল্লাহর প্রেরিত নবী, আল্লাহর সৎকর্মপরায়ণ অলী বা অন্য কোন মাখলুক। কেননা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও এবাদত করা বৈধ নয়। যে ব্যক্তি এই প্রকার তাওহীদে ত্রুটি করবে, সে কাফির মুশরিক। যদিও সে তাওহীদে রুবূবীয়াহ এবং তাওহীদে আসমা ওয়াস্‌ সিফাতের স্বীকৃতী প্রদান করে থাকে। সুতরাং কোন মানুষ যদি এ বিশ্বাস করে যে, আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকারী, একমাত্র মালিক এবং সব কিছুর পরিচালক, কিন্তু আল্লাহর এবাদতে যদি অন্য কাউকে শরীক করে, তবে তার এই স্বীকৃতী ও বিশ্বাস কোন কাজে আসবে না। যদি ধরে নেয়া হয় যে, একজন মানুষ তাওহীদে রুবূবীয়াতে এবং তাওহীদে আসমা ওয়াস্‌ সিফাতে পূর্ণ বিশ্বাস করে, কিন্তু সে কবরের কাছে যায় এবং কবরবাসীর এবাদত করে কিংবা তার জন্য কুরবানী পেশ করে বা পশু জবেহ করে তাহলে সে কাফির এবং মুশরিক। মৃত্যুর পর সে হবে চিরস্থায়ী জাহান্নামী। আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
)إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ(
“নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি শির্কে লিপ্ত হবে, আল্লাহ তার উপর জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। তার ঠিকানা জাহান্নাম। আর জালেমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” (সূরা মায়িদাঃ ৭২) কুরআনের প্রতিটি পাঠকই একথা অবগত আছে যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে সমস্ত কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করেছেন, তাদের জান্তমাল হালাল মনে করেছেন এবং তাদের নারী-শিশুকে বন্দী করেছেন ও তাদের দেশকে গণীমত হিসাবে দখল করেছেন, তারা সবাই একথা স্বীকার করত যে, আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালক। তারা এতে কোন সন্দেহ পোষণ করত না। কিন্তু যেহেতু তারা আল্লাহর সাথে অন্যেরও উপাসনা করত, তাই তারা মুশরিক হিসাবে গণ্য হয়েছে এবং তাদের জান্তমাল হরণ হালাল বিবেচিত হয়েছে।

তৃতীয়তঃ তাওহীদুল্‌ আসমা ওয়াস্‌ সিফাতঃ

তাওহীদুল্‌ আসমা ওয়াস্‌ সিফাতের অর্থ হল, আল্লাহ নিজেকে যে সমস্ত নামে নামকরণ করেছেন এবং তাঁর কিতাবে নিজেকে যে সমস্ত গুণে গুণাম্বিত করেছেন সে সমস্ত নাম ও গুণাবলীতে আল্লাহকে একক ও অদ্বিতীয় হিসাবে মেনে নেওয়া। আল্লাহ নিজের জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন, তাতে কোন পরিবর্তন, পরিবর্ধন, তার ধরণ বর্ণনা এবং কোন রূপ উদাহরণ পেশ করা ব্যতীত আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত করার মাধ্যমেই এ তাওহীদ বাস্তবায়ন হতে পারে। সুতরাং আল্লাহ নিজেকে যে নামে পরিচয় দিয়েছেন বা নিজেকে যে গুণাবলীতে গুণান্বিত করেছেন, তাঁর উপর ঈমান আনয়ন করা আবশ্যক। এ সমস্ত নাম ও গুণাবলীর আসল অর্থ আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করে তার উপর ঈমান আনতে হবে- কোন প্রকার ধরণ বর্ণনা করা বা দৃষ্টান্ত পেশ করা যাবেনা। এই প্রকারের তাওহীদে আহলে কিবলা তথা মুসলমানদের বিরাট একটি অংশ গোমরাহীতে পতিত হয়েছে। এক শ্রেণীর লোক আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকারের ক্ষেত্রে এতই বাড়াবাড়ি করেছে যে, এর কারণে তারা ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে। আর এক শ্রেণীর লোক মধ্যম পন'া অবলম্বন করেছে। আর এক শ্রেণীর লোক আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের কাছাকাছি। কিন্তু সালাফে সালেহীনের মানহাজ হল, আল্লাহ নিজের জন্য যে নাম নির্ধারণ করেছেন এবং নিজেকে যে সবগুণে গুণাম্বিত করেছেন, সে সব নাম ও গুণাবলীরর উপর ঈমান আনয়ন করতে হবে।

আল্লাহর কতিপয় নামের দৃষ্টান্তঃ

১) الحي القيوم)) আল্লাহ তাআ’লার অন্যতম নাম হচ্ছে, “আল হাইয়্যুল্‌ কাইয়্যুম” এই নামের উপর ঈমান রাখা আমাদের উপর ওয়াজিব। এই নামটি আল্লাহর একটি বিশেষ গুণেরও প্রমাণ বহন করে। তা হচ্ছে, আল্লাহর পরিপূর্ণ হায়াত। যা কোন সময় অবর্তমান ছিলনা এবং কোন দিন শেষও হবে না। অর্থাৎ আল্লাহ তাআ’লা চিরঞ্জীব। তিনি সবসময় আছেন এবং সমস্ত মাখলুকাত ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরও অবশিষ্ট থাকবেন। তাঁর কোন ধ্বংস বা ক্ষয় নেই।

২) আল্লাহ নিজেকে السميع (আস্‌ সামীউ) শ্রবণকারী নামে অভিহিত করেছেন। তার উপর ঈমান আনা আবশ্যক। শ্রবণ করা আল্লাহর একটি গুণ। তিনি মাখলুকাতের সকল আওয়াজ শ্রবণ করেন। তা যতই গোপন ও অস্পষ্ট হোক না কেন।

আল্লাহর কতিপয় সিফাতের দৃষ্টান্তঃ

   আল্লাহ বলেনঃ
)وَقَالَتْ الْيَهُودُ يَدُ اللَّهِ مَغْلُولَةٌ غُلَّتْ أَيْدِيهِمْ وَلُعِنُوا بِمَا قَالُوا بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ يُنفِقُ كَيْفَ يَشَاءُ(
“ইয়াহুদীরা বলে আল্লাহর হাত বন্ধ হয়ে গেছে। বরং তাদের হাতই বন্ধ। তাদের উক্তির দরুন তারা আল্লাহর রহমত হতে বঞ্চিত হয়েছে, বরং আল্লাহর উভয় হাত সদা উম্মুক্ত, যেরূপ ইচ্ছা ব্যয় করেন।” (সূরা মায়িদাঃ ৬৪) এখানে আল্লাহ তাআ’লা নিজের জন্য দু’টি হাত সাব্যস্ত করেছেন। যা দানের জন্য সদা প্রসারিত। সুতরাং আল্লাহর দু’টি হাত আছে। এর উপর ঈমান আনতে হবে। কিন্তু আমাদের উচিৎ আমরা যেন অন্তরের মধ্যে আল্লাহর হাত কেমন হবে সে সম্পর্কে কোন কল্পনা না করি এবং কথার মাধ্যমে যেন তার ধরণ বর্ণনা না করি ও মানুষের হাতের সাথে তুলনা না করি। কেননা আল্লাহ বলেছেন,
)لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ(
“কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা শুরাঃ ১১) আল্লাহ বলেন,
)قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّي الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ(
“হে মুহাম্মাদ! আপনি ঘোষণা করে দিন যে, আমার প্রতিপালক প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা, পাপকাজ, অন্যায় ও অসংগত বিদ্রোহ ও বিরোধিতা এবং আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করা, যার পক্ষে আল্লাহ কোন দলীল-প্রমাণ অবতীর্ণ করেন নি, আর আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলা যে সম্বন্ধে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই, (ইত্যাদি কাজ ও বিষয় সমূহ) হারাম করেছেন।” (সূরা আরাফঃ ৩৩) আল্লাহ আরো বলেন,
)وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُوْلَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا(
“যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নাই, সেই বিষয়ে অনুমান দ্বারা পরিচালিত হয়ো না, নিশ্চয়ই কর্ণ, চক্ষু, অন্তর ওদের প্রত্যেকের নিকট কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (সূরা বানী ইসরাঈলঃ ৩৬) সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর হাত দু’টিকে মানুষের হাতের সাথে তুলনা করল, সে আল্লাহর বাণী “কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়” একথাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল এবং আল্লাহর বাণী,
)فَلَا تَضْرِبُوا لِلَّهِ الْأَمْثَالَ(
তোমরা আল্লাহর জন্য দৃষ্টান্ত পেশ করো না। (সূরা নাহলঃ ৭৪) এর বিরুদ্ধাচরণ করল। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর গুণাবলীর নির্দিষ্ট কোন কাইফিয়ত বর্ণনা করল, সে আল্লাহর ব্যাপারে বিনা ইলমে কথা বলল এবং এমন বিষয়ের অনুসরণ করল, যে সম্পর্কে তার কোন জ্ঞান নেই।

আল্লাহর সিফাতের আরেকটি উদাহরণ পেশ করব। তা হল আল্লাহ আরশের উপরে সমুন্নত হওয়া। কুরআনের সাতটি স্থানে আল্লাহ তাআ’লা উল্লেখ করেছেন যে তিনি আরশের উপরে বিরাজমান। প্রত্যেক স্থানেই (استوى على العرش) “ইসতাওয়া আলাল আরশি” বাক্যটি ব্যবহার করেছেন। আমরা যদি আরবী ভাষায় ইসতিওয়া শব্দটি অনুসন্ধান করতে যাই তবে দেখতে পাই যে,(استوى)  শব্দটি সব সময় (على) অব্যয়ের মাধ্যমে ব্যবহার হয়ে থাকে। আর (استوى)  শব্দটি এভাবে ব্যবহার হলে ‘সমুন্নত হওয়া’ এবং ‘উপরে হওয়া’ ব্যতীত অন্য কোন অর্থে ব্যবহার হয় না। সুতরাং الرَّحْمَنُ عَلَىْ العَرْشِ اسْتَوَى এবং এর মত অন্যান্য আয়াতের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ সৃষ্টি জগতের উপরে সমুন্নত হওয়া ছাড়াও আরশের উপরে বিশেষ একভাবে সমুন্নত। প্রকৃতভাবেই আল্লাহ আরশের উপরে। আল্লাহর জন্য যেমনভাবে সমুন্নত হওয়া প্রযোজ্য, তিনি সেভাবেই আরশের উপরে সমুন্নত। আল্লাহর আরশের উপরে হওয়া এবং মানুষের খাট-পালং ও নৌকায় আরোহনের সাথে কোন সামঞ্জস্যতা নেই। এমনিভাবে মানুষের যানবাহনের উপরে চড়া এবং আল্লাহর আরশের উপরে হওয়ার মাঝে কোন সামঞ্জস্যতা নেই। আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
)وَجَعَلَ لَكُمْ مِنْ الْفُلْكِ وَالْأَنْعَامِ مَا تَرْكَبُونَ لِتَسْتَوُوا عَلَى ظُهُورِهِ ثُمَّ تَذْكُرُوا نِعْمَةَ رَبِّكُمْ إِذَا اسْتَوَيْتُمْ عَلَيْهِ وَتَقُولُوا سُبْحانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنقَلِبُونَ(
“তিনি তোমাদের আরোহনের জন্য সৃষ্টি করেন নৌযান ও চতুষ্পদ জন্তু যাতে তোমরা তার উপর আরোহণ করতে পার, তারপর তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ স্মরণ কর যখন তোমরা ওর উপর স্থির হয়ে বস এবং বলঃ পবিত্র ও মহান তিনি, যিনি এদেরকে আমাদের জন্য বশীভূত করেছেন, যদিও আমরা সমর্থ ছিলাম না এদেরকে বশীভূত করতে। আর আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তন করবো।” (সূরা যুখরুফঃ ১২-১৪) সুতরাং মানুষের কোন জিনিষের উপরে উঠা কোন ক্রমেই আল্লাহর আরশের উপরে হওয়ার সদৃশ হতে পারে না। কেননা আল্লাহর মত কোন কিছু নেই।

   যে ব্যক্তি বলে যে, আরশের উপরে আল্লাহর সমুন্নত হওয়ার অর্থ আরশের অধিকারী হয়ে যাওয়া, সে প্রকাশ্য ভুলের মাঝে রয়েছে। কেননা এটা আল্লাহর কালামকে আপন স্থান থেকে পরির্বতন করার শামিল এবং ছাহাবী এবং তাবেয়ীদের ইজমার সম্পূর্ণ বিরোধী। এ ধরণের কথা এমন কিছু বাতিল বিষয়কে আবশ্যক করে, যা কোন মুমিনের মুখ থেকে উচ্চারিত হওয়া সংগত নয়। কুরআন মাজীদ আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
)إِنَّا جَعَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ(
“আমি এই কুরআনকে আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার।” (সূরা যুখরুফঃ ৩) আরবী ভাষায় ইসতাওয়া শব্দের অর্থ ‘সমুন্নত হওয়া’ এবং ‘স্থির হওয়া’। আর এটাই হল ইসতিওয়া শব্দের আসল অর্থ। সুতরাং আল্লাহর বড়ত্বের শানে আরশের উপর যেভাবে বিরাজমান হওয়া প্রযোজ্য, সেভাবেই তিনি বিরাজমান। যদি ইসতিওয়ার (সমুন্নত হওয়ার) অর্থ ইসতিওলা (অধিকারী) হওয়ার মাধ্যমে করা হয়, তবে তা হবে আল্লাহর কালামকে পরিবর্তন করার শামিল। আর যে ব্যক্তি এরূপ করল, সে কুরআনের ভাষা যে অর্থের উপর প্রমাণ বহণ করে, তা অস্বীকার করল এবং অন্য একটি বাতিল অর্থ সাব্যস্ত করল। 

   তাছাড়া “ইসতিওয়া” এর যে অর্থ আমরা বর্ণনা করলাম, তার উপর সালাফে সালেহীন ঐকমত্য (ইজমা) পোষণ করেছেন। কারণ উক্ত অর্থের বিপরীত অর্থ তাদের থেকে বর্ণিত হয়নি। কুরআন এবং সুন্নাতে যদি এমন কোন শব্দ আসে সালাফে সালেহীন থেকে যার প্রকাশ্য অর্থ বিরোধী কোন ব্যাখ্যা না পাওয়া যায়, তবে সে ক্ষেত্রে মূলনীতি হল উক্ত শব্দকে তার প্রকাশ্য অর্থের উপর অবশিষ্ট রাখতে হবে এবং তার মর্মার্থের উপর ঈমান রাখতে হবে।

যদি প্রশ্ন করা হয় যে, সালাফে সালেহীন থেকে কি এমন কোন কথা বর্ণিত হয়েছে যা প্রমাণ করে যে, “ইসতাওয়া” অর্থ “আলা” (আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন)? উত্তরে আমরা বলব হ্যাঁ, অবশ্যই তা বর্ণিত হয়েছে। যদি একথা ধরে নেয়া হয় যে, তাঁদের থেকে এর প্রকাশ্য তাফসীর বর্ণিত হয়নি, তবেও এ সমস্ত ক্ষেত্রে সালাফে সালেহীনের মানহাজ (নীতি) হল, কুরআন এবং সুন্নাহর শব্দ যে অর্থ নির্দেশ করবে, আরবী ভাষার দাবী অনুযায়ী শব্দের সে অর্থই গ্রহণ করতে হবে।

ইসতিওয়ার অর্থ ইসতিওলা দ্বারা করা হলে যে সমস্ত সমস্যা দেখা দেয়ঃ

১) ইসতিওলা অর্থ কোন বস্তর মালিকানা হাসিল করা বা কোন যমিনের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তাই ইসতিওয়ার অর্থ ইসতিওলার মাধ্যমে করা হলে অর্থ দাঁড়ায়, আকাশ-জমিন সৃষ্টির আগে আল্লাহ আরশের মালিক ছিলেন না, পরে মালিক হয়েছেন। আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
)إِنَّ رَبَّكُمْ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ(
“নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক হলেন সেই আল্লাহ যিনি ছয় দিনে আকাশ এবং জমিন সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশের উপরে সমুন্নত হলেন।” (সূরা আরাফঃ ৫৪)
২) “আর্‌-রাহমানু আ’লাল আরশিস্‌ তাওয়া” অর্থ যদি ইস্‌তাওলার মাধ্যমে করা শুদ্ধ হয় তাহলে এ কথাও বলা শুদ্ধ হবে যে, আসমান্তযমিন সৃষ্টি করার পূর্বে বা সৃষ্টি করা পর্যন্ত আরশ আল্লাহর কর্তৃত্বের মধ্যে ছিলনা। এমনিভাবে অন্যান্য মাখলুকাতের ক্ষেত্রেও একই ধরণের কথা প্রযোজ্য। এ ধরণের অর্থ আল্লাহর শানে শোভনীয় নয়।
৩) এটি আল্লাহর কালামকে তার আপন স্থান থেকে সরিয়ে দেয়ার শামিল।
৪) এ ধরণের অর্থ করা সালাফে সালেহীনের ইজমার পরিপন্থী।

   তাওহীদুল আসমা ওয়াস্‌ সিফাতের ক্ষেত্রে সার কথা এই যে, আল্লাহ নিজের জন্য যে সমস্ত নাম ও গুণাবলী সাব্যস্ত করেছেন, কোন পরিবর্তন,  বাতিল বা ধরণ-গঠন কিংবা দৃষ্টান্ত পেশ করা ছাড়াই তার প্রকৃত অর্থের উপর ঈমান আনয়ন করা আমাদের উপর ওয়াজিব।

প্রশ্নঃ (২) যাদের কাছে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে প্রেরণ করা হয়েছিল, তাদের শির্ক কি ধরণের ছিল?
উত্তরঃ যাদের নিকট নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে প্রেরণ করা হয়েছিল, তারা তাওহীদে রুবূবীয়্যাতে আল্লাহর সাথে কাউকে শির্ক করত না। কুরআনে কারীমের ভাষ্য অনুযায়ী জানা যায় যে, তারা কেবলমাত্র তাওহীদে উলুহীয়াতে আল্লাহর সাথে শির্ক করত। রুবূবীয়াতের ক্ষেত্রে তাদের বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহই একমাত্র রব বা পালনকর্তা। তিনি অসহায়ের ডাকে সাড়া প্রদানকারী এবং বিপদাপদ দূরকারী।

   কিন্তু তারা এবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক করত। এ ধরণের শির্ক মুসলিমকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। কেননা তাওহীদের অর্থ হল আল্লাহকে এবাদতের ক্ষেত্রে একক করা। আল্লাহর জন্য কতিপয় নির্দিষ্ট হক রয়েছে, যা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করা ওয়াজিব। এই হকগুলো তিন প্রকারঃ

১)      মালিকানার অধিকার
২)      এবাদত পাওয়ার অধিকার
৩)      নাম ও গুণাবলীর অধিকার

এই জন্যই উলামাগণ তাওহীদকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেন। তাওহীদুর রুবূবীয়্যা, তাওহীদুল আসমা ওয়াস্‌ সিফাত এবং তাওহীদুল উলুহীয়া। মুশরিকরা শেষ প্রকারের তাওহীদে আল্লাহর সাথে শরীক করত, আল্লাহর সাথে অন্যকে অংশীদার সাব্যস্ত করত। আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
)وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا(
“তোমরা আল্লাহর এবাদত কর এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না।” (সূরা নিসাঃ ৩৬) আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
(إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ)
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে হারাম করে দিয়েছেন, তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম এবং জালেমদের জন্য কোন সাহায্যকারী থাকবে না।” (সূরা মায়িদাঃ ৭২) আল্লাহ আরো বলেন,
)إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ(
“নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শির্ক করাকে ক্ষমা করেন না। তবে এর চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের গুনাহ যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করে দেন।” (সূরা নিসাঃ ৪৮) আল্লাহ তাআ’লা আরো বলেন,
)وَقَالَ رَبُّكُمْ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ(
“এবং তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব। নিশ্চয়ই যারা আমার এবাদত করতে অহংকার করবে, তারা অচিরেই অপমানিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (সূরা গাফেরঃ ৬০) আল্লাহ তাআ’লা সূরা কাফিরূনে বলেন,
)قُلْ يَاأَيُّهَا الْكَافِرُونَ لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ وَلَا أَنْتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ وَلَا أَنَا عَابِدٌ مَا عَبَدتُّمْ وَلَا أَنْتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ(
“বল হে কাফিররা! আমি তার এবাদত করি না, যার এবাদত তোমরা কর, এবং তোমরাও তার এবাদতকারী নও, যার এবাদত আমি করি এবং আমি এবাদতকারী নই তার, যার এবাদত তোমরা করে আসছ।” (সূরা কাফেরূনঃ ১-৫)

প্রশ্নঃ (৩) আকীদাহ ও অন্যান্য দীনি বিষয়ের ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মূলনীতিগুলো কি কি?
উত্তরঃ আকীদাহ ও দ্বীনের অন্যান্য বিষয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মূলনীতি হল আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাত এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে পরিপূর্ণরূপে আঁকড়িয়ে ধরা। আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
)قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمْ اللَّهُ(
“হে নবী! আপনি বলুন যে, তোমরা যদি আল্লাহর ভালবাসা পেতে চাও, তাহলে আমার অনুসরণ কর। তবেই আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন।” (সূরা আল-ইমরানঃ ৩১) আল্লাহ আরো বলেন,
)مَنْ يُطِعْ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا(
“যে ব্যক্তি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর অনুসরণ করল সে স্বয়ং আল্লাহর অনুসরণ করল। আর যারা মুখ ফিরিয়ে নিবে, আমি তাদের জন্য আপনাকে সংরক্ষণকারী হিসাবে প্রেরণ করিনি।” (সূরা নিসাঃ ৮০) আল্লাহ আরো বলেন,
)وَمَا آتَاكُمْ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا(
“এবং আল্লাহর রাসূল তোমাদেরকে যা প্রদান করেন, তা তোমরা গ্রহণ কর আর যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করেন, তা থেকে তোমরা বিরত থাক।” (সূরা হাশরঃ ৭) যদিও আয়াতটি গণীমতের মাল বন্টনের ক্ষেত্রে নাযিল হয়েছে, তবে শরীয়তের অন্যান্য মাসায়েলের ক্ষেত্রেও উত্তমভাবে প্রযোজ্য হবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুমআর নামাজের খুৎবায় বলতেন,
أَمَّا بَعْدُ فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ وَخَيْرُ الْهُدَى هُدَى مُحَمَّدٍ বوَشَرُّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ وكل ضلالة فى النار
“অতঃপর সর্বোত্তম বাণী হচ্ছে আল্লাহর কিতাব, সর্বোত্তম নির্দেশনা হচ্ছে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর নির্দেশনা। সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হচ্ছে দ্বীনের ভিতরে নতুন বিষয় আবিষ্কার করা। প্রতিটি বিদ্‌আতই গোমরাহী। আর প্রতিটি গোমরাহীর পরিণাম জাহান্নাম।” রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ
“তোমরা আমার সুন্নাত এবং আমার পরে হেদায়েত প্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নাতের অনুসরণ করবে এবং উহাকে দৃঢ়ভাবে আকঁড়িয়ে ধরবে। আর তোমরা দ্বীনের বিষয়ে নতুন আবিস্কৃত বিষয় হতে সাবধান থাকবে। কারণ প্রতিটি নব আবিস্কৃত বিষয়ই বিদ্‌আত আর প্রতিটি বিদ্‌আতই গোমরাহী।” এ সম্পর্কে আরো অসংখ্য দলীল-প্রমাণ রয়েছে। সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পথ হল আল্লাহর কিতাব, রাসূলের সুন্নাত এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের পথকে আঁকড়িয়ে ধরা। তারা সদাসর্বদা দ্বীন কায়েমের প্রচেষ্টা করেন, এর ভিতর বিভেদ সৃষ্টি করেন না। আল্লাহ বলেন,
)شَرَعَ لَكُمْ مِنْ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ(
“তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন এমন দ্বীনকে, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহ (আঃ)কে আর যা আমি অহী করেছিলাম তোমাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মূসা ও ঈসা (আঃ)কে, এই বলে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওতে বিভেদ সৃষ্টি করো না।” (সূরা শুরাঃ ১৩) তাদের মাঝে কখনো মতবিরোধ হয়ে থাকলে তা হয়েছে কেবল এমন ক্ষেত্রে, যাতে ইজতেহাদ করা বৈধ আছে। এই ধরণের মতবিরোধ অন্তরে বিভেদ সৃষ্টি করে না। ইজতেহাদী বিষয়ে আলেমদের মাঝে মতবিরোধ হওয়া সত্বেও আপনি তাদের মাঝে একতা এবং একে অপরের প্রতি ভালবাসা দেখতে পাবেন।

প্রশ্নঃ (৪) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত কারা?
উত্তরঃ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত তারাই, যারা আকীদা ও আমলের ক্ষেত্রে সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরে এবং তার উপর ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং অন্য কোন দিকে দৃষ্টি দেয় না। এ কারণেই তাদেরকে আহলে সুন্নাত রূপে নামকরণ করা হয়েছে। কেননা তাঁরা সুন্নাহর ধারক ও বাহক। তাদেরকে আহলে জামাতও বলা হয়। কারণ তাঁরা সুন্নাহর উপর জামাতবদ্ধ বা ঐক্যবদ্ধ। আপনি যদি বিদ্‌আতীদের অবস্থার প্রতি দৃষ্টিপাত করেন, তবে দেখতে পাবেন যে, তারা আকীদা ও আমলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দলে বিভক্ত। তাদের এ অবস্থা এটাই প্রমাণ করে যে, তারা যে পরিমাণ বিদ্‌আত তৈরী করেছে সে পরিমাণ সুন্নাত থেকে দূরে সরে গেছে।

প্রশ্নঃ (৫) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভবিষ্যৎ বাণী করে গেছেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর উম্মত বিভিন্ন দলে বিভক্ত হবে। সম্মানিত শায়খের কাছে এর ব্যাখ্যা জানতে চাই।
উত্তরঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছহীহ হাদীছের মাধ্যমে সংবাদ দিয়েছেন যে, ইয়াহুদীরা ৭১ দলে বিভক্ত হয়েছে, নাসারারা বিভক্ত হয়েছে ৭২ দলে। আর এই উম্মাতে মুহাম্মাদী বিভক্ত হবে ৭৩ দলে। একটি দল ব্যতীত সমস্ত দলই জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এটি হল সেই দল, যারা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর সাহাবীদের সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। এই দলটি দুনিয়াতে বিদ্‌আতে লিপ্ত হওয়া থেকে সুরক্ষিত থাকবে এবং পরকালে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে। এটিই হল সাহায্যপ্রাপ্ত দল, যা কিয়ামত পর্যন্ত হকের উপর বিজয়ী থাকবে।

  কোন কোন আলেম এই জাহান্নামী ৭২ ফির্কার পরিচয় নির্ধারণ করার প্রয়াস পেয়েছেন। প্রথমতঃ বিদ্‌আতীদেরকে পাঁচভাগে ভাগ করেছেন এবং প্রত্যেক ভাগ থেকে শাখা-প্রশাখা বের করে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কর্তৃক ঘোষিত ৭২ টি ফির্কা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কিছু কিছু আলেম ফির্কাগুলো নির্ধারণ না করাই উত্তম মনে করেছেন। কারণ এই ফির্কা ৭২এ নির্ধারিত থাকার পরও আরো অসংখ্য মানুষ গোমরা হয়েছে। তারা আরো বলেন এই সংখ্যা শেষ হবে না। শেষ যামানায় কিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে এর সর্বশেষ সংখ্যা সম্পর্কে জানা সম্ভব নয়। সুতরাং উত্তম হল রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা সংক্ষেপ (অস্পষ্ট) রেখেছেন, তা সংক্ষেপ (অস্পষ্ট) রাখা। আমরা এভাবে বলব যে, এই উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। ৭২ দল জাহান্নামে যাবে এবং মাত্র একদল জান্নাতে যাবে। অতঃপর বলব, যে দলটি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর সাহাবীদের সুন্নাহর বিরোধীতা করবে, সে এই ৭২ দলের অন্তর্ভুক্ত হবে।

প্রশ্নঃ (৬) নাজাত প্রাপ্ত দলের বৈশিষ্ট কি? কোন ব্যক্তির মাঝে উক্ত বৈশিষ্টসমূহের কোন একটি অবর্তমান থাকলে সে ব্যক্তি কি নাজাত প্রাপ্ত দল হতে বের হয়ে যাবে?
উত্তরঃ ফির্কা নাজীয়ার প্রধান বৈশিষ্ট হল আকীদাহ, এবাদত, চরিত্র ও আচার ব্যবহারে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নাতকে আঁকড়িয়ে ধরা।

আপনি দেখতে পাবেন যে, আকীদার ক্ষেত্রে তাঁরা আল্লাহর কিতাব এবং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নাহর অনুসারী। উলুহীয়াত, রুবূবীয়াত এবং আসমা ওয়াস্‌ সিফাতের ক্ষেত্রে তারা কুরআন সুন্নাহর আলোকে সঠিক বিশ্বাস পোষণ করে থাকেন।

এবাদতের ক্ষেত্রে আপনি দেখতে পাবেন যে, তারা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নাহর পরিপূর্ণ বাস্তবায়নকারী। এবাদতের প্রকার, পদ্ধতি, পরিমাণ, সময়, স্থান এবং এবাদতের কারণ ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নাহর অনুসরণ করাই তাদের বৈশিষ্ট। আপনি তাদের নিকট দ্বীনের ব্যাপারে কোন বিদ্‌আত খোঁজে পাবেন না। তাঁরা আল্লাহ এবং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর সাথে সর্বোচ্চ আদব রক্ষা করে চলেন। আল্লাহ অনুমতি দেননি, এবাদতের ক্ষেত্রে এমন বিষয়ের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে তারা আল্লাহ এবং রাসূলের অগ্রণী হয়না।

আখলাক-চরিত্রের ক্ষেত্রেও আপনি তাদেরকে অন্যদের চেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের অধিকারী দেখতে পাবেন। মুসলমানদের কল্যাণ কামনা করা, অপরের জন্য উদার মনের পরিচয় দেয়া, মানুষের সাথে হাসি মুখে কথা বলা, উত্তম কথা বলা, বদান্যতা, বীরত্ব এবং অন্যান্য মহান গুণাবলী তাদের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট।

পার্থিব বিষয়াদিতে আপনি তাদেরকে দেখতে পাবেন যে, তারা সততার সাথে সকল প্রকার লেনদেন সম্পন্ন করে থাকেন। কাউকে ধোকা দেন না। ক্রয়-বিক্রয়ের সময় তারা দ্রব্যের আসল অবস্থা বর্ণনা করে দেন। এদিকে ইঙ্গিত করেই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
الْبَيِّعَانِ بِالْخِيَارِ مَا لَمْ يَتَفَرَّقَا فَإِنْ صَدَقَا وَبَيَّنَا بُورِكَ لَهُمَا فِي بَيْعِهِمَا وَإِنْ كَتَمَا وَكَذَبَا مُحِقَتْ بَرَكَةُ بَيْعِهِمَا
“পৃথক হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েরই ক্রয়-বিক্রয় বাতিল করার অধিকার রয়েছে। যদি তারা উভয়েই সত্য বলে এবং দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করে, আল্লাহ তাদের বেচা-কেনায় বরকত দান করেন। আর যদি মিথ্যা বলে এবং দোষ-ত্রুটি গোপন করে, তবে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের ভিতর থেকে বরকত উঠিয়ে নেওয়া হয়।”

উপরে যে সমস্ত গুণাবলীর আলোচনা করা হল, কোন ব্যক্তির মাঝে উক্ত গুণাবলীর কোন বৈশিষ্ট অবর্তমান থাকলে এ কথা বলা যাবে না যে, সে নাজাত প্রাপ্ত দল হতে বের হয়ে গেছে। প্রত্যেকেই আপন আপন আমল অনুযায়ী মর্যাদা লাভ করবে। তবে তাওহীদের ক্ষেত্রে ত্রুটি করলে নাজাত প্রাপ্ত দল হতে বের হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্‌আতের বিষয়টিও অনুরূপ। কিছু কিছু বিদ্‌আত এমন আছে, যা মানুষকে নাজী ফির্কা থেকে বের করে দেয়। তবে চরিত্র ও লেনদেনের ভিতরে কেউ ত্রুটি করলে সে নাজাত প্রাপ্ত দল থেকে বের হবে না। বরং মর্যাদা কমিয়ে দিবে।

আখলাকের বিষয়টি একটু দীর্ঘ করে বর্ণনা করা দরকার। চরিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পরস্পরে একতাবদ্ধ থাকা এবং আল্লাহ তাআ’লা যে হকের উপর ঐক্যবদ্ধ থাকার আদেশ দিয়েছেন, তার উপর অটুট থাকা। আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
)شَرَعَ لَكُمْ مِنْ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ(
“তিনি (আল্লাহ্‌) তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন এমন দ্বীনকে, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহ (আঃ)কে। আর যা আমি অহী করেছিলাম তোমাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মূসা ও ঈসা (আঃ)কে, এই বলে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং ওতে মতভেদ করো না।” (সূরা শুরাঃ ১৩) আল্লাহ তাআ’লা সংবাদ দিয়েছেন যে, যারা নিজেদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত হয়েছে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। আল্লাহ বলেন,
)إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ(
“নিশ্চয় যারা দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে আপনি কোন ব্যাপারেই তাদের অন্তর্ভুক্ত নন।” (সূরা আনআ’মঃ ১৫৯) সুতরাং ঐক্যবদ্ধ থাকা নাজী ফির্কার (আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের) অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট। তাদের মাঝে কোন ইজতেহাদী বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে তাদের এই মতবিরোধ পরস্পরের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ এবং শত্রুতার সৃষ্টি করে না; বরং তারা বিশ্বাস করে যে, তারা পরস্পরে ভাই। যদিও তাদের মাঝে এই মতভেদের সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি তাদের একজন এমন ইমামের পিছনেও নামায আদায় করে থাকে, তার দৃষ্টিতে সেই ইমাম ওযু বিহীন। আর ইমাম বিশ্বাস করে যে, সে ওযু অবস্থায় রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের লোকেরা উটের গোশত খেয়ে ওযু করে নি এমন ইমামের পিছনেও নামায আদায় করে থাকে। ইমাম মনে করে যে, উটের গোশত খেলে ওযু ভঙ্গ হয় না। আর মুক্তাদী মনে করে যে, ওযু ভঙ্গ হয়ে যায়। তা সত্বেও সে মনে করে উক্ত ইমামের পিছনে নামায আদায় করা জায়েয আছে। এমনটি তারা এ জন্যই করে যে, ইজতেহাদের কারণে যে সমস্ত মতভেদ সৃষ্টি হয়, তা প্রকৃত পক্ষে মতভেদ নয়। কেননা প্রত্যেকেই আপন আপন দলীলের অনুসরণ করে থাকে। তারা মনে করেন তাদের কোন দ্বীনি ভাই দলীলের অনুসরণ করতে গিয়ে যদি কোন আমলে তাদের বিরোধীতা করেন প্রকৃত পক্ষে তারা বিরোধীতা করেননি; বরং তাদের অনুরূপই করেছেন। কারণ তারাও দলীলের অনুসরণ করার প্রতি আহবান জানান। যেখানেই তা পাওয়া যাক না কেন।

অধিকাংশ আলেমের কাছে এ বিষয়টি অস্পষ্ট নয় যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর যুগে ছাহাবীদের ভিতরে এরকম অনেক বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। তিনি কাউকে ধমক দেননি বা কারও উপর কঠোরতা আরোপ করেননি। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন খন্দকের যুদ্ধ হতে ফেরত আসলেন, তখন জিবরীল (আঃ) এসে অঙ্গীকার ভঙ্গকারী বানু কুরায়যায় অভিযান পরিচালনার প্রতি ইঙ্গিত করলেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)  ছাহাবীদেরকে বললেন, তোমাদের কেউ যেন বানু কুরায়যায় না গিয়ে আসরের নামায না পড়ে। সাহাবীগণ এ কথা শুনে মদীনা হতে বের হয়ে বানু কুরায়যার দিকে রওনা দিলেন। পথি মধ্যে আসরের নামাযের সময় হয়ে গেল। তাদের কেউ নামায না পড়েই বানু কুরায়যায় পৌঁছে গেলেন। এদিকে নামাযের সময় শেষ হয়ে গেল। তারা বললেনঃ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, আসরের নামায অবশ্যই বানী কুরায়যায় গিয়ে পড়তে হবে। তাদের কেউ নামায ঠিক সময়েই পড়ে নিল। তাদের কথা হল রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে তাড়াতাড়ি বের হতে বলেছেন। তাঁর কথার অর্থ এটা নয় যে, আমরা সময় মত নামায না পড়ে পিছিয়ে নিব। এরাই সঠিক ছিল। তদুপুরি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’দলের কাউকে ধমক দেননি। সাহাবীগণও একজন অন্যজনের সাথে শত্রুতা পোষণ করেন নি বা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর বক্তব্য বুঝার ক্ষেত্রে ভিন্নমত হওয়া সত্বেও তাদের মাঝে বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়নি।

এই হাদীছটি বুঝতে গিয়ে যে মতভেদের সূচনা হয়েছিল, তার কারণে তাদের মধ্যে শত্রুতা বা দলাদলির সৃষ্টি হয়নি। এজন্য আমি মনে করি সুন্নী মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিৎ। তাদের মাঝে যেন কোন প্রকার দলাদলি সৃষ্টি না হয়। যাতে তারা পরস্পরে কাঁদা ছুড়াছুড়ি করবে, একে অপরকে শত্রু মনে করবে এবং ইজতেহাদী মাসআলায় মতভেদ হওয়ার কারণে একজন অপর জনকে ঘৃণা করবে। আমি মনে করি দলীলের ভিত্তিতে ইজতেহাদী কোন মাসআলায় মতভেদ হওয়া সত্বেও, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারীদের ঐকবদ্ধ হওয়া উচিৎ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া। কারণ ইসলাম ও মুসলমানদের প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য শত্রুরা চায় যে, মুসলমানেরা পরস্পরে বিভক্ত হোক। সুতরাং আমাদের উচিৎ নাজী ফির্কার বৈশিষ্টে বৈশিষ্ট মন্ডিত হয়ে হকের উপর ঐক্যবদ্ধ থাকা।

প্রশ্নঃ (৭) দ্বীনের ভিতরে মধ্যম পন্থা বলতে কি বুঝায়?
উত্তরঃ দ্বীনের ভিতরে মধ্যম পন্থা অবলম্বনের অর্থ এই যে, মানুষ দ্বীনের মধ্যে কোন কিছু বাড়াবে না। যাতে সে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে ফেলে। এমনিভাবে দ্বীনের কোন অংশ কমাবে না। যাতে সে আল্লাহর নির্ধারিত দ্বীনের কিছু অংশ বিলুপ্ত করে দেয়।

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর জীবনীর অনুসরণ করাও দ্বীনের মধ্যে মধ্যম পন্থা অবলম্বনের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর জীবনাদর্শ অতিক্রম করা দ্বীনের ভিতরে অতিরঞ্জনের শামিল। তাঁর জীবন চরিতের অনুসরণ না করা তাঁকে অবহেলা করার অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, একজন লোক বলল আমি আজীবন রাত্রি বেলা তাহাজ্জুদের নামায পড়ব। রাত্রিতে কখনই নিদ্রা যাব না। কারণ নামায সর্বশ্রেষ্ঠ এবাদাত। তাই আমি নামাযের মাধ্যমে বাকী জীবনের রাত্রিগুলো জাগরণ করতে চাই। আমরা তার উত্তরে বলব যে, এই ব্যক্তি দ্বীনের মাঝে অতিরঞ্জিতকারী। সে হকের উপর নয়। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর যুগে এরকম হয়েছিল। তিন জন লোক একত্রিত হয়ে একজন বলল, আমি সারা রাত্রি নামায আদায় করব। আর একজন বলল আমি সারা বছর রোযা রাখব এবং কখনো তা ছাড়ব না। তৃতীয় জন বলল আমি স্ত্রী সহবাস করব না। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর কাছে এই সংবাদ পৌঁছলে তিনি বললেন একদল লোকের কি হল তারা এ রকম কথা বলে থাকে? অথচ আমি রোযা রাখি এবং কখনো রোযা থেকে বিরত থাকি। রাত্রে ঘুমাই এবং আল্লাহর এবাদত করি। স্ত্রীদের সাথেও মিলিত হই। এটি আমার সুন্নাত। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নাহ থেকে বিমুখ থাকবে সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। এই লোকেরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করার কারণে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্নতার ঘোষণা করলেন। কেননা তারা রোযা রাখা না রাখা, রাত্রি জাগরণ করা, ঘুমানো এবং স্ত্রী সহবাস করার ক্ষেত্রে তাঁর সুন্নাতকে প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েছিল। দ্বীনী বিষয়ে যে ব্যক্তি অবহেলা করে বলবে যে, আমার নফল এবাদতের দরকার নেই। শুধ ফরজ ইবাদতগুলো পালন করব। আসলে সে ব্যক্তি ফরজ আমলেও অবহেলা করে থাকে। সঠিক পথের অনুসারী হল সেই ব্যক্তি যে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নাহর উপর চলবে। অন্য একটি দৃষ্টান্ত হল, মনে করুন তিন জন ভাল লোকের পাশে রয়েছে একজন ফাসেক ব্যক্তি। তিনজনের একজন বলল, আমি এই ফাসেককে সালাম দিব না। তার থেকে দূরে থাকব এবং তার সাথে কথা বলব না। অপর জন বলল, আমি এর সাথে চলব, তাকে সালাম দিব, হাসি মুখে তার সাথে কথা বলব, তাকে দাওয়াত দিব এবং তার দাওয়াতে আমিও শরীক হব। আমার নিকট সে অন্যান্য সৎ লোকের মতই। তৃতীয়জন বলল, আমি এই ফাসেক ব্যক্তিকে তার পাপাচারিতার কারণে ঘৃণা করি। তার ভিতরে ঈমান থাকার কারণে আমি তাকে ভালবাসি। তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করব না। তবে তাকে সংশোধনের কারণে বর্জন করা হলে তা ভিন্ন কথা। তাকে বর্জন করলে যদি তার পাপাচারিতা আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা হয়, তবে আমি তাকে বর্জন করব না। এই তিনজনের প্রথম ব্যক্তি বেশী বাড়াবাড়ি করল। দ্বিতীয়জন ত্রুটি করল এবং তৃতীয়জন মধ্যম পন্থা ও সঠিক পথের অনুসরণ করল।

অন্যান্য সকল এবাদত ও মানুষের মুআমালাতের ক্ষেত্রেও অনুরূপ। মানুষ এতে ত্রুটি, বাড়াবাড়ি, এবং মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে থাকে।

আরো একটি উদাহরণ ভাল করে শ্রবণ করুন। মনে করুন একজন লোক তার স্ত্রীর কথায় চলে। তার স্ত্রী তাকে যেখানে পাঠায় সেখানে যায়। সে তার স্ত্রীকে অন্যায় কাজ হতে বাধা প্রদান করে না এবং ভাল কাজে উৎসাহ দেয় না। সকল ক্ষেত্রেই স্ত্রী তার উপর কর্তৃত্ব করছে এবং তার মালিক হয়ে বসেছে।

আরেক ব্যক্তি তার স্ত্রীর কোন ব্যাপারেই গুরুত্ব দেয়না। তার স্ত্রীর সাথে অহংকার করে চলে। যেন তার স্ত্রী তার কাছে চাকরানীর চেয়ে অবহেলিত। অন্য ব্যক্তি মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে এবং আল্লাহ ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রদত্ব সীমা অনুযায়ী স্ত্রীর সাথে আচরণ করে থাকে। আল্লাহ বলেন,
)وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ(
“তাদের (স্ত্রীদের) জন্য তোমাদের উপর হক রয়েছে, যেমন তাদের উপর তোমাদের হক রয়েছে।” (সূরা বাকারাঃ ২২৮) কোন পুরুষ তার স্ত্রীকে হেয় প্রতিপন্ন করবে না। স্ত্রীর কোন একটি চরিত্রকে অপছন্দ করলে হয়ত অন্য একটি গুণ দেখে সে সন্তুষ্ট হয়ে যাবে। শেষ ব্যক্তি মধ্যম পন্থা অবলম্বনকারী, প্রথম ব্যক্তি স্ত্রীর সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় শিথিল এবং দ্বিতীয় ব্যক্তি ত্রুটিকারী (অবহেলাকারী ও অবজ্ঞাকারী)। হে পাঠক! আপনি সকল এবাদত ও আচর-আচরণকে উক্ত উদাহরণগুলোর উপরে অনুমান করুন।

প্রশ্নঃ (৮) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নিকট ঈমান অর্থ কি? ঈমান কি বাড়ে এবং কমে?
উত্তরঃ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মতে ঈমানের অর্থ হল অন্তরের বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকারোক্তি এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল- এই তিনটি বিষয়ের সমষ্টির নাম।

যেহেতু উক্ত বিষয় সমূহের সমষ্টির নাম ঈমান সে হিসাবে, তা বাড়বে এবং কমবে এটিই স্বাভাবিক। কারণ অন্তরের বিশ্বাসেরও তারতম্য হয়ে থাকে। অতএব সংবাদ শুনে কোন কিছু বিশ্বাস করা আর আপন চোখে দেখে বিশ্বাস করা এক কথা নয়। অনুরূপভাবে একজনের দেয়া সংবাদ বিশ্বাস করা আর দু’জনের সংবাদ বিশ্বাস করা এক কথা নয়। এ জন্যই ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেন,
)وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِ الْمَوْتَى قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ قَالَ بَلَى وَلَكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِى(
“হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দেখান আপনি কিভাবে মৃতকে জীবিত করেন। আল্লাহ বললেন, তুমি কি বিশ্বাস কর না? ইবরাহীম (আঃ) বললেন, বিশ্বাস তো অবশ্যই করি, কিন্তু আমার অন্তর যাতে পরিতৃপ্ত হয় এজন্য আমি স্বচক্ষে দেখতে চাই।” (সূরা বাকারাঃ ২৬০) কাজেই অন্তরের বিশ্বাস এবং তার স্তীরতা ও প্রশান্তির দিক থেকেও ঈমান বৃদ্ধি পায়। মানুষ তার অন্তরে ইহা সহজেই অনুভব করে থাকে। সে যখন ইসলামী অনুষ্ঠান বা ওয়াজ মাহফিলে উপস্থিত হয়ে জান্নাত ও জাহান্নামের আলোচনা শুনে, তখন তার ঈমান বৃদ্ধি পায়। এমন কি সে যেন জান্নাত- জাহান্নাম স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছে। সে যখন মজলিস থেকে উঠে যায়, তখন গাফলতি চলে আসে এবং এই বিশ্বাস কমতে থাকে।

এমনিভাবে মুখের আমলের (যিকর্‌) কারণেও ঈমান বৃদ্ধি পায়। কেননা যে ব্যক্তি দশবার আল্লাহর যিক্‌র করল, সে একশতবার যিক্‌র্‌কারীর সমান নয়। দ্বিতীয় ব্যক্তির আমল প্রথম ব্যক্তির আমলের চেয়ে অনেক বেশী। তাই তার ঈমান বেশী হওয়াই স্বাভাবিক।

এমনিভাবে যে ব্যক্তি পরিপূর্ণভাবে এবাদত সম্পন্ন করবে আর যে ব্যক্তি ত্রুটিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করবে- উভয়ে সমান নয়।

এমনিভাবে আমলের মাধ্যমেও ঈমান বাড়ে। যে ব্যক্তি বেশী আমল করে তার ঈমান কম আমলকারীর চেয়ে বেশী। ঈমানের বেশী-কম হওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট দলীল-প্রমাণ রয়েছে। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)وَمَا جَعَلْنَا أَصْحَابَ النَّارِ إِلَّا مَلَائِكَةً وَمَا جَعَلْنَا عِدَّتَهُمْ إِلَّا فِتْنَةً لِلَّذِينَ كَفَرُوا لِيَسْتَيْقِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ وَيَزْدَادَ الَّذِينَ آمَنُوا إِيمَانًا(
“আমি জাহান্নামের তত্বাবধায়ক হিসেবে ফেরেশতাকেই রেখেছি। আমি কাফেরদেরকে পরীক্ষা করার জন্যই তাদের এই সংখ্যা নির্ধারণ করেছি, যাতে কিতাবধারীরা দৃঢ় বিশ্বাসী হয় এবং মুমিনদের ঈমান বৃদ্ধি পায়।” (সূরা মুদ্দাস্‌ছিরঃ ৩১) আল্লাহ তাআ’লা আরো বলেন,
)وَإِذَا مَا أُنزِلَتْ سُورَةٌ فَمِنْهُمْ مَنْ يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَذِهِ إِيمَانًا فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا فَزَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ وَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ فَزَادَتْهُمْ رِجْسًا إِلَى رِجْسِهِمْ وَمَاتُوا وَهُمْ كَافِرُونَ(
“আর যখন কোন সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, এ সূরা তোমাদের মধ্যে কার ঈমান কতটা বৃদ্ধি করল? তবে যারা ঈমানদার, এ সূরা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং তারা আনন্দিত হয়েছে। বস্তুতঃ যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে এটি তাদের অন্তরে কলুষের সাথে আরো কলুষ বৃদ্ধি করেছে এবং তারা কাফের অবস্থায়ই মৃত্যু করল।” (সূরা তাওবাঃ ১২৪-২৫) ছহীহ হাদীছে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণিত আছে,
مَا رَأَيْتُ مِنْ نَاقِصَاتِ عَقْلٍ وَدِينٍ أَذْهَبَ لِلُبِّ الرَّجُلِ الْحَازِمِ مِنْ إِحْدَاكُنَّ
“দ্বীন ও জ্ঞানে অপূর্ণ হওয়া সত্বেও জ্ঞানী পুরুষদের জ্ঞানকে তোমাদের চেয়ে অধিক হরণকারী আর কাউকে দেখিনি।” সুতরাং ঈমান বাড়ে এবং কমে। প্রশ্ন হল ঈমান বাড়ার কারণ কি?

ঈমান বৃদ্ধি হওয়ার উপায় সমূহঃ

প্রথম উপায়ঃ আল্লাহর সমস্ত নাম ও গুণাবলীসহ আল্লাহ তাআ’লার পরিচয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। আল্লাহ তাআ’লা এবং তাঁর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান যতই বৃদ্ধি পাবে, নিঃসন্দেহে তার ঈমানও তত বৃদ্ধি পাবে। এ জন্যই যে সমস্ত আলেম আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন তারা এ সম্পর্কে জ্ঞানহীন আলেমদের চেয়ে ঈমানের দিক থেকে অধিক শক্তিশালী।
দ্বিতীয় উপায়ঃ সৃষ্টির ভিতরে আল্লাহর নিদর্শন সমূহ সম্পর্কে গবেষণা করা এবং আল্লাহ মানব জাতিকে যে জীবন বিধান দিয়েছেন, তার ভিতরে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা। মানুষ আল্লাহর সৃষ্টিরাজি নিয়ে যতই চিন্তা করবে, ততই তার ঈমান বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
)وَفِي الْأَرْضِ آيَاتٌ لِلْمُوقِنِينَ وَفِي أَنفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ(
“বিশ্বাসীদের জন্য পৃথিবীতে নিদর্শনাবলী রয়েছে। এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও, তোমরা কি অনুধাবন করবে না?” (সূরা যারিয়াতঃ ২০) আল্লাহর সৃষ্টিরাজির মধ্যে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করলে যে ঈমান বৃদ্ধি পায়, এ মর্মে অনেক দলীল-প্রমাণ রয়েছে।
তৃতীয় উপায়ঃ বেশী বেশী সৎ কাজ সম্পাদন করা। সৎ আমল যতই বৃদ্ধি পাবে, ঈমান ততই বৃদ্ধি পাবে। এই সৎ আমল মুখের কথার মাধ্যমে হোক, কিংবা কাজের মাধ্যমে হোক যেমন যিক্‌র-আযকার, নামায, রোযা এবং হজ্জ। এসব কিছুই ঈমান বৃদ্ধির মাধ্যম। 

ঈমান কমে যাওয়ার কারণ সমূহঃ

প্রথম কারণঃ আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা ঈমান কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। কেননা আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান যতই কমবে, ঈমানও তত কমতে থাকবে।
দ্বিতীয় কারণঃ সৃষ্টিতে ও শরীয়তে আল্লাহর আয়াত সম্পর্কে গবেষণা করা থেকে বিরত থাকা। কেননা আল্লাহর সৃষ্টিতে চিন্তা-ভাবনা না করা ঈমানের ঘাটতি হওয়ার অন্যতম কারণ।
তৃতীয় কারণঃ গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়া। কেননা গুনাহের কাজ করলে অন্তরে এবং ঈমানের উপর বিরাট প্রভাব পড়ে। এই জন্যই নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ                                                              
“ব্যভিচারী ঈমান থাকা অবস্থায় ব্যভিচারে লিপ্ত হতে পারে না।”
চতুর্থ কারণঃ সৎ আমল না করা ঈমান হ্রাস পাওয়ার অন্যতম কারণ। কিন্তু যদি বিনা কারণে কোন ওয়াজিব কাজ ছেড়ে দেয় তাহলে ঈমান কমার সাথে সাথে সে শাস্তির সম্মুখীন হবে। অবশ্য গ্রহণযোগ্য কারণে ওয়াজিব ছেড়ে দিলে অথবা ওয়াজিব নয় এমন কাজ ছেড়ে দিলে ঈমানের ঘাটতি হবে, কিন্তু শাস্তির সম্মুখীন হবে না। এই জন্যই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মহিলাদেরকে জ্ঞান ও দ্বীনের ক্ষেত্রে অপূর্ণ বলেছেন। এর কারণ হিসাবে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তাদের যখন মাসিকের রক্ত বের হয়, তখন তারা নামায-রোযা থেকে বিরত থাকে। অথচ মাসিক অবস্থায় নামায-রোযা থেকে বিরত থাকার কারণে তাদেরকে দোষারূপ করা হয় না। বরং তা থেকে বিরত থাকার আদেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু যেহেতু পুরুষদের তুলনায় তাদের আমল কম হয়ে গেল, সে হিসাবে তারা পুরুষেরে চেয়ে কম ঈমানের অধিকারী।

প্রশ্নঃ (৯) হাদীছে জিবরীলে ঈমানের ব্যাখ্যায় রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ঈমান হল ‘আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখা, তাঁর ফেরেশতা, আসমানী কিতাব এবং তাঁর রাসূলগণের উপর বিশ্বাস রাখা, পরকালের উপর বিশ্বাস এবং ভাগ্যের ভাল-মন্দের উপর বিশ্বাস রাখার নাম।’ অথচ আবদুল কায়েস গোত্রের প্রতিনিধি দলের হাদীছে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈমানের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ঈমান হল ‘আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই তিনি এক ও অদ্বিতীয়, একথার সাক্ষ্য দেয়া, নামায কায়েম করা, যাকাত দেয়া এবং গণীমতের মালের এক পঞ্চমাংশ প্রদান করা।’ উপরের উভয় হাদীছের মধ্যে আমরা কিভাবে সমন্বয় করব?
উত্তরঃ এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পূর্বে আমি বলতে চাই যে, আল্লাহর কিতাব এবং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর সুন্নাহর ভিতরে কোন পারস্পরিক দ্বন্দ্ব নেই। কুরআনের এক অংশ অন্য অংশের বিরোধী নয়। এমনিভাবে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর সুন্নাহর ক্ষেত্রেও একই কথা। কুরআন ও সুন্নাতে পরস্পর বিরোধী কোন জিনিষ নেই। এ মূলনীতিটি মনে রাখলে কুরআনহাদীছ বুঝার অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
 )أَفَلا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيْرًا(
“তারা কি কুরআন গবেষণা করেনা? এটি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নিকট থেকে হত, তাহলে তারা উহাতে অনেক মতভেদ দেখতে পেত।” (সূরা নিসাঃ ৮২) কুরআনের ভিতরে যেহেতু মতবিরোধ নাই, রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীছের ক্ষেত্রেও তাই। এক হাদীছ অন্য হাদীছের বিরোধী নয়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যদি এক স্থানে ঈমানকে একভাবে ব্যাখ্যা করেন এবং অন্য স্থানে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেন, যা আপনার দৃষ্টিতে প্রথম ব্যাখ্যার বিরোধী মনে হয়, কিন্তু আপনি যদি গভীরভাবে চিন্তা করেন, তাহলে আপনি কোন দ্বন্দ্ব পাবেন না।

হাদীছে জিবরীলে (আঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দ্বীনকে ইসলাম, ঈমান, ইহসান এই তিনভাগে ভাগ করেছেন। আর আবদুল কায়েস গোত্রের প্রতিনিধি দলের হাদীছে শুধুমাত্র দ্বীনের একটি মাত্র প্রকার তথা ইসলামের কথা উল্লেখ করেছেন। যেখানে শুধুমাত্র ইসলামের কথা উল্লেখ হবে, সেখানে ঈমানকেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কারণ মুমিন হওয়া ব্যতীত ইসলামের যাবতীয় বিধি-বিধান পালন করা সম্ভব নয়। আবার যেখানে শুধুমাত্র ঈমানের আলোচনা হবে, সেখানে ইসলামও অন্তর্ভুক্ত হবে। কারণ প্রত্যেক মুমিনকে ইসলামের বিধি-বিধান মেনে চলতে হবে। আর যেখানে ঈমান ও ইসলাম একই সাথে উল্লেখ হবে, সেখানে ঈমান দ্বারা উদ্দেশ্য হবে অন্তরের বিষয়সমূহ। আর ইসলাম দ্বারা উদ্দেশ্য হবে বাহ্যিক আমল সমূহ। ইলম অর্জনকারীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা। শুধুমাত্র ইসলামের আলোচনা আসলে ঈমানও তার ভিতরে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
)إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الإِسْلامُ(
“ইসলামই আল্লাহর কাছে একমাত্র মনোনীত দ্বীন। (সূরা আল-ইমরানঃ ১৯) আর এটা জানা বিষয় যে, ইসলাম আকীদাহ, ঈমান ও বাহ্যিক আমলের সমষ্টি। এককভাবে ঈমানের উল্লেখ হলে ইসলামকে তার ভিতরে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দু’টি একসাথে উল্লেখ হলে ঈমানের অর্থ হবে অন্তরে বিশ্বাস করার বিষয়সমূহ আর ইসলামের অর্থ হবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাহ্যিক আমলসমূহ। এই জন্যই পূর্ববর্তী যুগের কোন কোন আলেম বলেছেন, ইসলাম প্রকাশ্য বিষয় এবং ঈমান গোপনীয় বিষয়। কারণ তা অন্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট। আপনি কখনো দেখতে পাবেন যে, মুনাফেক ব্যক্তি নামায পড়ছে, রোযা রাখছে এবং সাদকা করছে। এই ব্যক্তি প্রকাশ্যভাবে মুসলমান কিন্তু মু’মিন নয়। আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
)وَمِنْ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ( 
“মানুষের মধ্যে কিছু মানুষ এমন আছে, যারা বলে আমরা আল্লাহর উপর এবং পরকালের উপর ঈমান আনয়ন করেছি; অথচ তারা মুমিন নয়”। (সূরা বাকারাঃ ৮)

প্রশ্নঃ (১০) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীছে জিবরাঈলে বলেছেন, ঈমান হল আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস, আল্লাহর কিতাবের উপর বিশ্বাস, রাসূলদের উপর বিশ্বাস, পরকালের উপর বিশ্বাস এবং ভাগ্যের ভাল-মন্দের উপর বিশ্বাস স্থাপন। অন্য হাদীছে রয়েছে, ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা-প্রশাখা রয়েছে। উভয় হাদীছের মধ্যে আমরা কিভাবে সমন্বয় করব?
উত্তরঃ যে ঈমানের মাধ্যমে আকীদাহ্‌ উদ্দেশ্য, তার রুকন মোট ছয়টি। সেগুলো হাদীছে জিবরাঈলে উল্লেখিত হয়েছে। জিবরীল (আঃ) যখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, উত্তরে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ঈমান হল তুমি বিশ্বাস করবে আল্লাহর প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি, রাসূলগণের প্রতি, পরকালের প্রতি এবং ভাগ্যের ভাল-মন্দের প্রতি। অপর পক্ষে যেখানে ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা-প্রশাখা থাকার কথা বলা হয়েছে, সেখানে ঈমানের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার সৎ আমল উদ্দেশ্য। এই জন্য নামাযকে ঈমানের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ বলেন,
)وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِيعَ إِيمَانَكُمْ إِنَّ اللَّهَ بِالنَّاسِ لَرَءُوفٌ رَحِيمٌ(
“আল্লাহ তোমাদের ঈমানকে বিনষ্ট করবেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি অতীব দয়ালু”। (সূরা বাকারাঃ ১৪৩) তাফসীরকারকগণ বলেছেন, এখানে ঈমান দ্বারা বায়তুল মুক্বাদ্দাসের দিকে ফিরে আদায় করা নামায উদ্দেশ্য। কেননা ছাহাবীগণ কা’বার দিকে মুখ করে নামায আদায়ের পূর্বে বাইতুল মুক্বাদ্দাসের দিকে ফিরে নামায আদায় করতেন।

প্রশ্নঃ (১১) মসজিদে আসার অভ্যাস আছে এমন ব্যক্তিকে কি আমরা মুমিন হিসাবে সাক্ষ্য দিতে পারি?
উত্তরঃ কোন সন্দেহ নাই যে, কোন ব্যক্তি যদি নামাযের জন্য মসজিদে আসে, তার মসজিদে আসাটাই তার ঈমানের পরিচয় বহন করে। কারণ তা না হলে কিসে তাকে ঘর থেকে বের করে মসজিদে যাওয়ার কষ্ট স্বীকার করতে বাধ্য করল?

প্রশ্নকারী যে হাদীছটির দিকে ইঙ্গিত করেছেন তা হল, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِذَا رَأَيْتُمُ الرَّجُلَ يَعْتَادُ الْمَسْجِدَ فَاشْهَدُوا لَهُ بِالْإِيمَانِ
“তোমরা যদি কোন ব্যক্তিকে মসজিদে আসতে অভ্যস্ত দেখ, তবে তার ঈমান আছে বলে সাক্ষ্য প্রদান কর”। কিন্তু এই হাদীছটি দূর্বল। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে এই হাদীছটি ছহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়নি।

প্রশ্নঃ (১২) আল্লাহ তাআ’লা সম্পর্কে শয়তান একজন মানুষকে এমন ওয়াস্‌ ওয়াসা (কুমন্ত্রনা) প্রদান করে যে, সে ঈমান চলে যাওয়ার আশঙ্কা করে। এ সম্পর্কে আপনার উপদেশ কি?
উত্তরঃ প্রশ্নকারী যে সমস্যার কথা ব্যক্ত করলেন এবং যার পরিণতিকে ভয় করছেন, আমি তাকে বলব যে, হে ভক্ত! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। উক্ত সমস্যার ভাল ফলাফল ব্যতীত মন্দ কোন ফল হবে না। কেননা এই ওয়াস্‌ওয়াসাগুলো শয়তান মুমিনদের মাঝে প্রবেশ করায়, যাতে সে মানুষের ঈমানকে দূর্বল করে দিতে পারে এবং তাদেরকে মানষিক অস্থিরতায় ফেলে দিয়ে ঈমানী শক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে। শুধু তাই নয় অনেক সময় মুমিনদের সাধারণ জীবনকে বিপন্ন করে তুলে।

   প্রশ্নকারী ব্যক্তির সমস্যাই মুমিনদের প্রথম সমস্যা নয় এবং শেষ সমস্যাও নয়; বরং দুনিয়াতে একজন মুমিন অবশিষ্ট থাকলেও এই সমস্যা বর্তমান থাকবে। সাহাবীগণও এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত,
 جَاءَ نَاسٌ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَسَأَلُوهُ إِنَّا نَجِدُ فِي أَنْفُسِنَا مَا يَتَعَاظَمُ أَحَدُنَا أَنْ يَتَكَلَّمَ بِهِ قَالَ وَقَدْ وَجَدْتُمُوهُ قَالُوا نَعَمْ قَالَ ذَاكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ                                                               
“সাহাবীদের একদল লোক রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর কাছে আগমণ করে জিজ্ঞাসা করল, আমরা আমাদের অন্তরে কখনো কখনো এমন বিষয় অনুভব করি, যা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করা আমাদের কাছে খুব কঠিন মনে হয়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন যে, সত্যিই কি তোমরা এরকম পেয়ে থাক? তাঁরা বললেন হ্যাঁ, আমরা এরকম অনুভব করে থাকি। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এটি তোমাদের ঈমানের স্পষ্ট প্রমাণ”।

    রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেন,
 يَأْتِي الشَّيْطَانُ أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ مَنْ خَلَقَ كَذَا مَنْ خَلَقَ كَذَا حَتَّى يَقُولَ مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ فَإِذَا بَلَغَهُ فَلْيَسْتَعِذْ بِاللَّهِ وَلْيَنْتَهِ                                              
“তোমাদের কারো কাছে শয়তান আগমণ করে বলে, কে এটি সৃষ্টি করেছে? কে ঐটি সৃষ্টি করেছে? এক পর্যায়ে বলে কে তোমার প্রতিপালককে সৃষ্টি করেছে? তোমাদের কারও অবস্থা এরকম হলে সে যেন শয়তানের কুমন্ত্রনা হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং এরকম চিন্তা-ভাবনা করা হতে বিরত থাকে।” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত,
جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ  فَقَالَ إنِّى اُحَدِّثُ نَفْسِى بِالشَّيْءِ لَأَنْ يَكُونَ حُمَمَةً أَحَبُّ إِلَيْهِ مِنْ أَن ْ يَتَكَلَّمَ بِهِ فَقَالَ النبي صلى الله عليه وسلم الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي رَدَّ أَمْرَهُ إِلَى الْوَسْوَسَةِ                                                           
“নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর কাছে একজন লোক আগমণ করে বলল, আমার মনে কখনো এমন কথার উদয় হয়, যা উচ্চারণ করার চেয়ে আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া আমার কাছে বেশী ভাল মনে হয়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি এই বিষয়টিকে নিছক একটি মনের ওয়াস্‌ওয়াসা হিসাবে নির্ধারণ করেছেন।”

   শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া (রঃ) তাঁর কিতাবুল ঈমানে বলেছেন, মুমিন ব্যক্তি শয়তানের প্ররোচনায় কখনো কুফরীর ওয়াস্‌ওয়াসায় পতিত হয়। এতে তাদের অন্তর সংকুচিত হয়ে যায়। সাহাবীগণ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর কাছে ব্যক্ত করলেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের কেউ কেউ তার অন্তরে এমন বিষয় অনুভব করে, যা মুখে উচ্চারণ করার চেয়ে আকাশ থেকে জমিনে পড়ে যাওয়াকে অধিক শ্রেয় মনে করে। এটা শুনে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ইহা ঈমানের সুস্পষ্ট আলামত। অন্য বর্ণনায় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি শয়তানের কুমন্ত্রণাকে নিছক একটি মনের ওয়াস্‌ওয়াসা হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। মুমিন ব্যক্তি এই ধরণের ওয়াস্‌ওয়াসাকে অপছন্দ করা সত্বেও তার মনে এর উদয় হওয়া এবং তা প্রতিহত করতে প্রাণপন চেষ্টা করা তার ঈমানদার হওয়ার প্রমাণ বহন করে। যেমন কোন মুজাহিদের সামনে শত্রু এসে উপস্থিত হল। মুজাহিদ শত্রুকে প্রতিহত করল এবং পরাজিত করল। এটি একটি বিরাট জিহাদ। এই জন্যই ইলম অর্জনকারী ও এবাদতে লিপ্ত ব্যক্তিগণ বেশী বেশী ওয়াস্‌ওয়াসা এবং সন্দেহে পতিত হয়ে থাকে। অথচ অন্যদের এ রকম হয়না। কেননা এরা তো আল্লাহর পথ অনুসরণ করে না। এরা আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হয়ে প্রবৃত্তির অনুসরণে লিপ্ত রয়েছে। শয়তানের উদ্দেশ্যও তাই। অপর পক্ষে যারা ইলম অর্জন এবং এবাদতের মাধ্যমে তাদের প্রতিপালকের পথে চলে, শয়তান তাদের শত্রু। সে তাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে রাখতে চায়।

   প্রশ্নকারীকে আমি বলব যে, যখন আপনি বুঝতে পারবেন, এটা শয়তানের কুমন্ত্রনা, তখন তার বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হোন। আর জেনে রাখুন যে, আপনি যদি তার সাথে সদা-সর্বদা যুদ্ধে লিপ্ত থাকেন, তার পিছনে না ছুটেন, তাহলে সে আপনার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। যেমন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي مَا وَسْوَسَتْ بِهِ صُدُورُهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَكَلَّمْ          
“আমলে পরিণত করা অথবা মুখে উচ্চারণ না করা পর্যন্ত আল্লাহ তাআ’লা আমার উম্মতের মনের ওয়াস্‌ওয়াসাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।”

আপনাকে যদি বলা হয় শয়তান মনের ভিতরে ওয়াস্‌ওয়াসা দেয় তা কি আপনি বিশ্বাস করেন? সেটাকে আপনি কি  সত্য মনে করেন? আপনার মনে আল্লাহ সম্পর্কে যে ধরণের ওয়াস্‌ওয়াসার উদয় হয়, তার ব্যাপারে আপনার ধারণা কি তাই? উত্তরে আপনি অবশ্যই বলবেন, এ ব্যাপারে আমাদের কথা বলা সম্পূর্ণ অনুচিত। হে আল্লাহ! আপনি পূত-পবিত্র। এটি একটি বিরাট অপবাদ। আপনি অন্তর দিয়ে মনের এ সব ওয়াস্‌ওয়াসাকে ঘৃণা করবেন এবং জবানের মাধ্যমে প্রতিবাদ করবেন। আর আপনি এ থেকে দূরে থাকবেন। সুতরাং এগুলো শুধুমাত্র মনের কল্পনা এবং ওয়াস্‌ওয়াসা, যা আপনার অন্তরে প্রবেশ করে থাকে। এটি একটি শয়তানের ফাঁদ। মানুষকে শির্কে লিপ্ত করার জন্যই সে এ ধরণের ফাঁদ পেতে রেখেছে। মানুষকে গোমরাহ করার জন্য শয়তান তাদের শিরা-উপশিরায় চলাচল করে থাকে।

   সামান্য কোন জিনিষের ক্ষেত্রে শয়তান মানুষের মনে কুমন্ত্রনা দেয় না। আপনি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে জনবসতিপূর্ণ বড় বড় শহরের কথা শ্রবণ করে থাকেন। এসমস্ত শহরের অসি-ত্ব সম্পর্কে আপনার অন্তরে বিন্দুমাত্র সন্দেহের উদ্রেক হয়না। অথবা এ ধরণের সন্দেহ হয়না যে, শহরটি বসবাসের উপযোগী নয় অথবা শহরে কোন জন্তমানুষ নেই। এ ক্ষেত্রে সন্দেহ না হওয়ার কারণ হল শয়তানের এতে কোন লাভ নাই। কিন্তু মানুষের ঈমানকে বরবাদ করে দেয়ার ভিতরে শয়তানের বিরাট স্বার্থ রয়েছে। জ্ঞানের আলো এবং হেদায়েতের নূরকে মানুষের অন্তর থেকে নিভিয়ে দেয়ার জন্য ও তাকে সন্দেহ এবং পেরেশানীর অন্ধকার গলিতে নিক্ষেপ করার জন্য শয়তান তার অশ্বারোহী এবং পদাতিক বাহিনী নিয়ে সদা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শয়তানের ওয়াস্‌ওয়াসা থেকে বাঁচার উপযুক্ত ঔষধও আমাদের জন্য বর্ণনা করেছেন। এসব ধারণা থেকে বিরত থাকা এবং শয়তানের ধোকা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে। মুমিন ব্যক্তি যদি ওয়াস্‌ওয়াসা থেকে বিরত থেকে আল্লাহর সন'ষ্টি কামনায় এবাদতে লিপ্ত হয়, আল্লাহর ইচ্ছায় অন্তর থেকে উহা চলে যাবে। সুতরাং আপনার অন্তরে এ জাতীয় যা কিছু উদয় হয়, তা থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ থাকুন। আপনি তো আল্লাহর এবাদত করেন, তাঁর কাছে দু’আ করেন এবং তাঁর বড়ত্ব ঘোষণা করেন। আপনার অন্তরে যে সমস্ত কুধারণার উদয় হয়, তার বর্ণনা যদি অন্যের কাছ থেকে শুনেন, তাহলে আপনি তাকে হত্যা করে ফেলতে ইচ্ছা করবেন। তাই যে সমস্ত ওয়াস্‌ওয়াসা মনের মধ্যে জাগে, তার প্রকৃত কোন অসি-ত্ব নেই; বরং তা ভিত্তিহীন মনের কল্পনা মাত্র। এমনিভাবে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পবিত্র কাপড় পরিধানকারী কোন ব্যক্তির মনে যদি এমন ওয়াস্‌ওয়ার জাগ্রত হয় যে, হয়তোবা কাপড়টি নাপাক হয়ে গেছে, হয়তোবা এ কাপড় পরিধান করে নামায আদায় করলে নামায বিশুদ্ধ হবে না, এমতাবস্থায় সে উক্ত ওয়াস্‌ওয়াসার দিকে ভ্রুক্ষেপ করবে না। উপরোক্ত আলোচনার পর আমার সংক্ষিপ্ত নসীহত এই যেঃ

১)      ওয়াস্‌ওয়াসার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর আদেশ মোতাবেক ওয়াস্‌ওয়াসা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকবে এবং আল্লাহর কাছে শয়তানের প্ররোচনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবে।
২)      বেশী করে আল্লাহর যিকির করবে।
৩)      আল্লাহর সন'ষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে অধিক হারে এবাদতে লিপ্ত থাকবে। যখনই বান্দা পরিপূর্ণরূপে এবাদতে মশগুল থাকবে, ইনশাআল্লাহ এধরণের কুচিন্তা দূর হয়ে যাবে।
৪)      এই রোগ থেকে আল্লাহর কাছে আরোগ্য লাভের জন্য আল্লাহর কাছে বেশী বেশী দু’আ করবে।

প্রশ্নঃ (১৩) কাফেরের উপর কি ইসলাম গ্রহণ করা ওয়াজিব?
উত্তরঃ প্রত্যেক কাফেরের উপরই ইসলাম গ্রহণ করা ওয়াজিব। চাই সে কাফের ইয়াহুদী হোক বা খৃষ্টান হোক। আল্লাহ তাআ’লা কুরআন মজীদে এরশাদ করেন,
)قُلْ يَاأَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِ وَيُمِيتُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَكَلِمَاتِهِ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ(                                                  
“(হে নবী!) আপনি বলে দিন, হে মানবমন্ডলী! আমি আকাশ-জমিনের রাজত্বের মালিক আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের সবার নিকট প্রেরিত রাসূল। তিনি ব্যতীত সত্য কোন উপাস্য নাই। তিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু দান করেন। সুতরাং তোমরা সবাই আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন কর এবং তাঁর প্রেরিত নিরক্ষর নবীর উপর, যিনি বিশ্বাস রাখেন আল্লাহ এবং তাঁর সমস্ত কালামের উপর। তাঁর অনুসরণ কর যাতে সরল পথপ্রাপ্ত হতে পার।” (সূরা আরাফঃ ১৫৮) সুতরাং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর উপর ঈমান আনয়ন করা সমস্ত মানুষের উপর ওয়াজিব। তবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিশেষ অনুগ্রহ করে অমুসলিমদেরকে মুসলমানদের আইন্তকানুন মেনে মুসলিম দেশে বসবাস করার অনুমতি দিয়েছেন।
 )قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنْ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ(                   
“তোমরা যুদ্ধ কর আহলে কিতাবের ঐ লোকদের সাথে, যারা আল্লাহ এবং রোজ হাশরের উপর ঈমান রাখে না। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করে দিয়েছেন, তা হারাম করে না এবং গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম, যতক্ষণ না করজোড়ে তারা জিযিয়া (নিরাপত্তা কর) প্রদান করে।” (সূরা তাওবাঃ ২৯) সহীহ মুসলিম শরীফে বুরায়দা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন কোন যুদ্ধে কাউকে আমীর নির্বাচন করতেন, তখন তাকে আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিতেন। আরো উপদেশ দিতেন সাথীদের সাথে ভাল ব্যবহার করার। আর বলতেন, তাদের সামনে তিনটি বিষয় পেশ করবে, তিনটির যে কোন একটি গ্রহণ করলে তাদের সাথে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকবে। এই সমস্ত বিষয় সমূহের মধ্যে জিযিয়া গ্রহণ অন্যতম। অনেক আলেম ইয়াহুদী-খৃষ্টান ছাড়াও অন্যান্য কাফের-মুশরেকদের কাছ থেকে জিযিয়া গ্রহণ বৈধ বলেছেন।

   মোটকথা অমুসলিমদের উপর আবশ্যক হল, হয় তারা ইসলাম গ্রহণ করবে অথবা ইসলামী শরীয়তের কাছে নতি স্বীকার করে কর দিয়ে ইসলামী শাসনের অধীনে বসবাস করবে।

প্রশ্নঃ (১৪) যে ব্যক্তি ইলমে গায়েব দাবী করবে, তার হুকুম কি?
উত্তরঃ যে ব্যক্তি ইলমে গায়েব দাবী করবে সে কাফের। কেননা সে আল্লাহ তাআ’লাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করল। আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
)قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ وَمَا يَشْعُرُونَ أَيَّانَ يُبْعَثُونَ(
“হে নবী আপনি বলে দিন! আকাশ এবং জমিনে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ গায়েবের সংবাদ জানে না এবং তারা জানে না যে, কখন পুনরুত্থিত হবে।” (সূরা নামলঃ ৬৫) যেহেতু আল্লাহ তাঁর নবীকে এই মর্মে ঘোষণা করার আদেশ দিয়েছেন, আকাশ-জমিনে আল্লাহ ছাড়া গায়েবের খবর আর কেউ জানে না, এরপরও যে ব্যক্তি গায়েবের খবর জানার দাবী করবে, সে আল্লাহকে এই ব্যাপারে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করল। যারা ইলমে গায়েবের দাবী করে, তাদেরকে আমরা বলব, তোমরা কিভাবে এটা দাবী কর অথচ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা জানতেন না। তোমরা বেশী মর্যাদাবান না রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)? যদি তারা বলে আমরা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বেশী মর্যাদাবান, তাহলে তারা এ কথার কারণে কাফের হয়ে যাবে। আর যদি বলে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেশী মর্যাদাবান, তাহলে আমরা বলব কেন তিনি গায়েবের সংবাদ জানেন না? অথচ তোমরা তা জান বলে দাবী করছ? আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
)عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا إِلَّا مَنْ ارْتَضَى مِنْ رَسُولٍ فَإِنَّهُ يَسْلُكُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ رَصَدًا(                                                                  
“তিনি অদৃশ্য সম্পর্কে সম্যকভাবে পরিজ্ঞাত। তিনি অদৃশ্য বিষয় কারও কাছে প্রকাশ করেন না- তাঁর মনোনীত রাসূল ব্যতীত। তখন তিনি তার অগ্রে ও পশ্চাতে প্রহরী নিযুক্ত করেন।” (সূরা জিনঃ ২৬-২৭) ইলমে গায়েবের দাবীদারদের কাফের হওয়ার এটি দ্বিতীয় দলীল। আল্লাহ তাআ’লা তাঁর নবীকে মানুষের জন্য ঘোষণা করতে বলেন যে,
)قُلْ لَا أَقُولُ لَكُمْ عِندِي خَزَائِنُ اللَّهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ لَكُمْ إِنِّي مَلَكٌ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ(  
“আপনি বলুনঃ আমি তোমাদেরকে বলিনা যে, আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডার আছে। তাছাড়া আমি অদৃশ্য জগতের বিষয় অবগতও নই। আমি এমনও বলিনা যে, আমি ফেরেশতা। আমি তো শুধু ঐ ওহীর অনুসরণ করি, যা আমার নিকট প্রেরণ করা হয়।” (সূরা আনআ’মঃ ৫০)

প্রশ্নঃ (১৫) বর্তমান কালের ডাক্তারগণ মাতৃগর্ভে পুত্র সন্তান আছে না কন্যা সন্তান বলে দিতে পারে। আর কুরআনে আছে, وَ يَعْلَمُ مَا فِىْ الأَرْحَامِ অর্থঃ “মাতৃগর্ভে কি আছে তা আল্লাহই জানেন।” ইবনে জারীর মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেন যে, একজন লোক নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে জিজ্ঞাসা করল, আমার স্ত্রী কি সন্তান প্রসব করবে? তখন উক্ত আয়াত নাযিল হয়। কাতাদা থেকেও অনুরূপ তাফসীর বর্ণিত আছে। আল্লাহর বাণী, مَا فِىْ الأَرْحَامِ “গর্ভে যা আছে” এ কথাটি ব্যাপক। এ ব্যাপকতা ভঙ্গকারী বিশেষ কোন দলীল আছে কি? অর্থাৎ কোন অবস্থাতে আল্লাহ ছাড়া অন্যরাও কি মাতৃগর্ভের অবস্থা সম্পর্কে খবর রাখতে পারে?
উত্তরঃ উপরের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আমি বলতে চাই যে, কুরআনের কোন আয়াত কখনই বাস্তব সত্য কোন ঘটনার বিরোধী হতে পারে না। যদিও কখনো কোন ব্যাপারে প্রকাশ্যভাবে এরকম কিছু দেখা যায়, তবে হয়তো এটা হবে নিছক অবাস্তব দাবী অথবা কুরআনের আয়াতটি সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট নয়। কেননা কুরআনের প্রকাশ্য আয়াত এবং প্রকৃত বাস্তব ঘটনা উভয়টিই অকাট্য। দু’টি অকাট্য বিষয়ের মধ্যে কখনো বিরোধ হতে পারে না।

   প্রশ্নে উল্লেখিত বিষয়টি সত্য হয়ে থাকলে বলব যে, অত্যাধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে তারা এখন জানতে পেরেছে যে, মাতৃগর্ভে কি আছে। বর্তমানে ডাক্তারগণ ছেলে সন্তান বা মেয়ে সন্তান হওয়া সম্পর্কে যে আগাম খবর প্রদান করে, তা যদি মিথ্যা হয় তাহলে কোন কথা নেই। আর যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলেও আয়াতের সাথে কোন দ্বন্দ্ব নেই। আয়াতটি গায়েবী বিষয় সংক্রান্ত। এখানে পাঁচটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে যা আল্লাহর জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত। তম্মধ্যে মাতৃগর্ভে কি আছে তা একটি। শিশু মাতৃগর্ভে থাকাবস্থায় গায়েবী বিষয়গুলো হল সে কত দিন মায়ের পেটে থাকবে, কত দিন দুনিয়াতে বেঁচে থাকবে, কি রকম আমল করবে, সে কতটুকু রিজিক গ্রহণ করবে, সৌভাগ্যবান হবে না দুর্ভাগ্যবান হবে। গঠন পূর্ণ হওয়ার পূর্বে ছেলে না মেয়ে হবে এ সম্পর্কে অবগত হওয়া। আর গঠন পূর্ণ হওয়ার পরে মাতৃগর্ভে ছেলে না মেয়ে এ সম্পর্কে অবগত হওয়া ইলমে গায়েবের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা গঠন পূর্ণ হওয়ার মাধ্যমে প্রত্যক্ষ বিষয়ের জ্ঞানের মতই হয়ে গেল। তবে শিশুটি তিনটি অন্ধকারের ভিতরে লুকায়িত অবস্থায় রয়েছে। যদি অন্ধকারের আবরণগুলো অপসারণ করা হয়, তাহলে বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে। ইহা অসম্ভব নয় যে, আল্লাহর সৃষ্টিসমূহের মধ্যে এমন শক্তিশালী যন্ত্র রয়েছে, যা এই তিনটি অন্ধকার ভেদ করতে সক্ষম। যাতে করে শিশুটি ছেলে না মেয়ে, তা জানা যায়। আর আয়াতে মাতৃগর্ভে ছেলে সন্তান বা মেয়ে সন্তান হওয়ার জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছে- একথা বলা হয়নি। হাদীছেও এই মর্মে কোন সুস্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।

   আয়াতের শানে নুযুলের ক্ষেত্রে মুজাহিদ থেকে যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা মুনকাতে। কারণ তিনি তাবেয়ীদের অন্তর্ভুক্ত। 

   কাতাদার তাফসীরের অর্থ এই যে, গঠন হওয়ার পূর্বে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না যে, ছেলে হবে না মেয়ে হবে। গঠন পূর্ণ হওয়ার পর আল্লাহ ব্যতীত অন্যরাও জানতে পারে। ইবনে কাছীর সূরা লুকমানের আয়াতের তাফসীরে বলেন, মাতৃগর্ভে যা আছে তা দিয়ে আল্লাহ তাআ’লা কি সৃষ্টি করতে চান, তিনি ব্যতীত অন্য কেউ জানে না। কিন্তু যখন ছেলে বা মেয়ে হওয়ার কিংবা সৌভাগ্যবান বা দুর্ভাগ্যবান হওয়ার আদেশ দিয়ে দেন, তখন ফেরেশতাগণ এবং অন্যান্য সৃষ্টি জীবেরাও জানে। আল্লাহর বাণী,
) ويعلم مَا فِىْ الأَرْحَامِ(
“মাতৃগর্ভে যা আছে তা একমাত্র আল্লাহই জানেন।” এ থেকে মানুষ কোন কিছু জানতে পারে কিনা। জানলে তা কিসের মাধ্যমে? এ প্রশ্নের জবাবে আমরা বলব যে, আয়াতের মাধ্যমে যদি গঠন প্রণালী পূর্ণ হওয়ার পর ছেলে সন্তান বা মেয়ে সন্তান উদ্দেশ্য হয়, তাহলে বাস্তব উপলব্ধির মাধ্যমে তা নির্ণয় করা সম্ভব। আয়াতের মাধ্যমে আমরা বুঝি যে, মাতৃগর্ভের ছোট-বড় যাবতীয় অবস্থা আল্লাহ তাআ’লা বিস্তারিতভাবে অবগত আছেন। মানুষ শুধুমাত্র গঠন পূর্ণ হওয়ার পর ছেলে না মেয়ে এই একটি মাত্র অবস্থা জানতে পারে। আরো অসংখ্য অবস্থা এখনও রহস্যময় রয়ে গেছে। উসূলবিদগণ উল্লেখ করেছেন যে, কুরআন ও সুন্নাহর ব্যাপকার্থক বিষয়গুলো থেকে কোন জিনিষকে আলাদা করার জন্য কুরআন্তসুন্নাহর কোন দলীল কিংবা ইজমা বা কিয়াস বা বাস্তব উপলোব্ধি অথবা বিশুদ্ধ বিবেকের দরকার। এ ব্যাপারে আলেমদের আলোচনা অত্যন্ত পরিস্কার।

   আর আয়াতের মাধমে যদি সন্তান সৃষ্টির পূর্বের অবস্থা উদ্দেশ্য হয়, তাহলে ডাক্তারদের কথা এবং কুরআনের আয়াতের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব নাই। ডাক্তাররা সন্তান সৃষ্টি হওয়ার পূর্বে বলতে পারে না যে, ছেলে হবে না মেয়ে হবে।

   আল্লাহর জন্য সমস্ত প্রশংসা যে, পৃথিবীতে কুরআন্তসুন্নাহর সুস্পষ্ট দলীল বিরোধী কোন বাস্তব ঘটনা পাওয়া যায়নি। ইসলামের শত্রুরা কিছু কিছু বাস্তব বিষয়ে বাহ্যিকভাবে কুরআন্তসুন্নাহ বিরোধী ভেবে তাতে আঘাত করেছে। আল্লাহর কিতাব বুঝতে অক্ষম হওয়ার কারণে অথবা তাদের উদ্দেশ্য অসৎ হওয়ার কারণেই তারা এমনটি করে থাকে। কিন্তু মুসলিম উম্মার আলেমগণ তাদের এ সমস্ত ভ্রান্ত ধারণার মূলোৎপাটন করে দিয়েছেন।

এব্যাপারে মানুষেরা তিনভাগে বিভক্তঃ

     প্রথম শ্রেণীর লোকেরা কুরআনের আয়াতের প্রকাশ্য অর্থটিকে গ্রহণ করেছে এবং এর বিপরীতে প্রতিটি বাস্তব সত্য বিষয়কে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। অথচ আয়াতটি উক্ত অর্থে সুস্পষ্ট নয়। এতে করে সে নিজের অক্ষমতার কারণে নিজের উপর কিংবা কুরআনের উপর দোষ টেনে এনেছে।

   অন্য একটি দল কুরআনের শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বিমুখ হয়ে পার্থিব বিষয়কেই গ্রহণ করার কারণে নাসি-কে পরিণত হয়েছে।

   অন্য দিকে মধ্যমপন্থী দলের লোকেরা কুরআনের শিক্ষাকে গ্রহণ করেছে এবং বাস্তব সত্য বিষয়াবলীকেই সত্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তারা জানে যে, উভয়টিই সত্য। কারণ কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াতগুলো চাক্ষুষ বস্তগুলোর বিরোধী হতে পারে না। তারা দলীল এবং বিবেক সম্মত বিষয়, উভয়টির উপরই আমল করে। এর মাধ্যমে তাদের দ্বীন এবং বিবেক উভয়টিই নিরাপদ থাকল। ঈমানদারগণ যখন সত্যের ব্যাপারে মতবিরোধ করেন, তখন আল্লাহ তাদেরকে হেদায়েত দান করেন। আল্লাহ যাকে চান সঠিক পথের দিকে পথ প্রদর্শন করেন।

   আল্লাহ আমাদেরকে এবং আমাদের দ্বীনী ভাইদেরকে তাওফীক দান করুন এবং সঠিক পথপ্রাপ্ত এবং সঠিক পথের দিকে আহবানকারী ও উম্মতের জন্য সংশোধনকারী নেতা হিসাবে নির্ধারণ করুন। আমি আল্লাহর কাছে তাওফীক চাই, তারই উপর ভরসা করি এবং তারই দিকে ফিরে যাব।

প্রশ্নঃ (১৬) সূর্য কি পৃথিবীর চার দিকে ঘুরে?
উত্তরঃ মান্যবর শায়খ উত্তরে বলেন যে, শরীয়তের প্রকাশ্য দলীলগুলো প্রমাণ করে যে, সূর্যই পৃথিবীর চতুর্দিকে ঘুরে। এই ঘুরার কারণেই পৃথিবীতে দিবা-রাত্রির আগমণ ঘটে। আমাদের হাতে এই দলীলগুলোর চেয়ে বেশী শক্তিশালী এমন কোন দলীল নাই, যার মাধ্যমে আমরা সূর্য ঘূরার দলীলগুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারি। সূর্য ঘুরার দলীলগুলো হলঃ আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
)فَإِنَّ اللَّهَ يَأْتِي بِالشَّمْسِ مِنْ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنْ الْمَغْرِبِ( 
“আল্লাহ তাআ’লা সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন। তুমি পারলে পশ্চিম দিক থেকে উদিত কর।” (সূরা বাকারাঃ ২৫৮) সূর্য পূর্ব দিক থেকে উঠার মাধ্যমে প্রকাশ্য দলীল পাওয়া যায় যে, সূর্য পৃথিবীর উপর পরিভ্রমণ করে।
২) আল্লাহ বলেনঃ
فَلَمَّا رَأَى الشَّمْسَ بَازِغَةً قَالَ هَذَا رَبِّي هَذَا أَكْبَرُ فَلَمَّا أَفَلَتْ قَالَ يَاقَوْمِ إِنِّي بَرِيءٌ مِمَّا تُشْرِكُونَ        
“অতঃপর যখন সূর্যকে চকচকে অবস্থায় উঠতে দেখলেন তখন বললেনঃ এটি আমার পালনকর্তা, এটি বৃহত্তর। অতপর যখন তা ডুবে গেল, তখন বলল হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যেসব বিষয়ে শরীক কর আমি ওসব থেকে মুক্ত।” (সূরা আনআ’মঃ ৭৮) এখানে নির্ধারণ হয়ে গেল যে, সূর্য অদৃশ্য হয়ে যায়। একথা বলা হয়নি যে, সূর্য থেকে পৃথিবী ডুবে গেল। পৃথিবী যদি ঘূরত তাহলে অবশ্যই তা বলা হত।
৩) আল্লাহ বলেনঃ
)وَتَرَى الشَّمْسَ إِذَا طَلَعَتْ تَتَزَاوَرُ عَنْ كَهْفِهِمْ ذَاتَ الْيَمِينِ وَإِذَا غَرَبَتْ تَقْرِضُهُمْ ذَاتَ الشِّمَالِ(                                                                     
“তুমি সূর্যকে দেখবে, যখন উদিত হয়, তাদের গুহা থেকে পাশ কেটে ডান দিকে চলে যায় এবং যখন অস্ত যায়, তাদের থেকে পাশ কেটে বাম দিকে চলে যায়।” (সূরা কাহাফঃ ১৭) পাশ কেটে ডান দিকে বা বাম দিকে চলে যাওয়া প্রমাণ করে যে, নড়াচড়া সূর্য থেকেই হয়ে থাকে। পৃথিবী যদিনড়াচড়া করত তাহলে অবশ্যই বলতেন সূর্য থেকে গুহা পাশ কেটে যায়। উদয় হওয়া এবং অস্ত যাওয়াকে সূর্যের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এটা থেকে বুঝা যায় যে, সূর্যই ঘুরে। পৃথিবী নয়।
৪) আল্লাহ বলেনঃ
)وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ(                                                                               
“এবং তিনিই দিবা-নিশি এবং চন্দ্র-সূর্য সৃষ্টি করেছেন। সবাই আপন আপন কক্ষ পথে বিচরণ করে।” (সূরা আমবীয়াঃ ৩৩) ইবনে আব্বাস বলেন, লাটিম যেমন তার কেন্দ্র বিন্দুর চার দিকে ঘুরতে থাকে, সূর্যও তেমনিভাবে ঘুরে।
৫) আল্লাহ বলেনঃ
)يُغْشِي اللَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا(                                                  
“তিনি রাতকে আচ্ছাদিত করেন দিনের মাধ্যমে, দিন দৌড়ে দৌড়ে রাতের পিছনে আসে।” (সূরা আ’রাফঃ ৫৪) আয়াতে রাতকে দিনের অনুসন্ধানকারী বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অনুসন্ধানকারী পিছনে পিছনে দ্রুত অনুসন্ধান করে থাকে। এটা জানা কথা যে, দিবা-রাত্রি সূর্যের অনুসারী।
৬) আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِالْحَقِّ يُكَوِّرُ اللَّيْلَ عَلَى النَّهَارِ وَيُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَى اللَّيْلِ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ يَجْرِي لِأَجَلٍ مُسَمًّى أَلَا هُوَ الْعَزِيزُ الْغَفَّار(           
অর্থঃ “তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে। তিনি রাত্রিকে দিবস দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে কাজে নিযুক্ত করেছেন। প্রত্যেকেই বিচরণ করে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত। জেনে রাখুন, তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।” (সূরা যুমারঃ ৫) আয়াতের মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম যে, পৃথিবীর উপরে দিবা-রাত্রি চলমান রয়েছে। পৃথিবী যদি ঘুরতো তাহলে তিনি বলতেন, দিবা-রাত্রির উপর পৃথিবীকে ঘূরান। আল্লাহ তাআ’লা বলেন, “সূর্য এবং চন্দ্রের প্রত্যেকেই চলমান”। এই সমস্ত দলীলের মাধ্যমে জানা গেল যে, সুস্পষ্টভাবেই সূর্য ও চন্দ্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করছে। এ কথা সুস্পষ্ট যে, চলমান বস্তকে বশীভুত করা এবং কাজে লাগানো একস্থানে অবস্থানকারী বস্তকে কাজে লাগানোর চেয়ে অধিক যুক্তিসঙ্গত।
৭) আল্লাহ বলেনঃ
)وَالشَّمْسِ وَضُحَاهَا وَالْقَمَرِ إِذَا تَلَاهَا(                                                    
“শপথ সূর্যের ও তার কিরণের, শপথ চন্দ্রের যখন তা সূর্যের পশ্চাতে আসে।” (সূরা আশ্‌-শামসঃ ১-২) এখানে বলা হয়েছে যে, চন্দ্র সূর্যের পরে আসে। এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, সূর্য এবং চন্দ্র চলাচল করে এবং পৃথিবীর উপর ঘুরে। পৃথিবী যদি চন্দ্র বা সূর্যের চার দিকে ঘুরত, তাহলে চন্দ্র সূর্যকে অনুসরণ করতনা। বরং চন্দ্র একবার সূর্যকে, আর একবার সূর্য চন্দ্রকে অনুসরণ করত। কেননা সূর্য চন্দ্রের অনেক উপরে। এই আয়াত দিয়ে পৃথিবী স্তীর থাকার ব্যাপারে দলীল গ্রহণ করার ভিতরে চিন্তা-ভাবনার বিষয় রয়েছে।
৮) মহান আল্লাহ বলেনঃ
)وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍّ لَهَا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ, وَالْقَمَرَ قَدَّرْنَاهُ مَنَازِلَ حَتَّى عَادَ كَالْعُرْجُونِ الْقَدِيمِ, لَا الشَّمْسُ يَنْبَغِي لَهَا أَنْ تُدْرِكَ الْقَمَرَ وَلَا اللَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِ وَكُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ(                                                              
“সূর্য তার নির্দিষ্ট অবস্থানে আবর্তন করে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারণ। চন্দ্রের জন্যে আমি বিভিন্ন মনযিল নির্ধারিত করেছি। অবশেষে সে পুরাতন খর্জুর শাখার অনুরূপ হয়ে যায়। সূর্যের পক্ষে চন্দ্রকে নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। রাতের পক্ষেও দিনের অগ্রবতী হওয়া সম্ভব নয়। প্রত্যেকেই আপন আপন কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে।” (সূরা ইয়াসীনঃ ৩৮-৪০) সূর্যের চলা এবং এই চলাকে মহা পরাক্রমশালী আল্লাহর নির্ধারণ বলে ব্যাখ্যা করা এটাই প্রমাণ করে যে, সূর্য প্রকৃতভাবেই চলমান। আর এই চলাচলের কারণেই দিবা-রাত্রি এবং ঋতুর পরিবর্তন হয়। চন্দ্রের জন্য মনযিল নির্ধারণ করার অর্থ এই যে, সে তার মনযিলসমূহে স্থানান্তরিত হয়। যদি পৃথিবী ঘুরত, তাহলে পৃথিবীর জন্য মনযিল নির্ধারণ করা হত। চন্দ্রের জন্য নয়। সূর্য কর্তৃক চন্দ্রকে ধরতে না পারা এবং দিনের অগ্রে রাত থাকা সূর্য, চন্দ্র, দিন এবং রাতের চলাচলের প্রমাণ বহন করে।
৯) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় আবু যরকে বলেছেনঃ
أَتَدْرِي أَيْنَ تَذْهَبُ قُلْتُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ قَالَ فَإِنَّهَا تَذْهَبُ حَتَّى تَسْجُدَ تَحْتَ الْعَرْشِ فَتَسْتَأْذِنَ فَيُؤْذَنُ لَهَا وَيُوشِكُ أَنْ تَسْجُدَ فَلَا يُقْبَلَ مِنْهَا وَتَسْتَأْذِنَ فَلَا يُؤْذَنَ لَهَا يُقَالُ لَهَا ارْجِعِي مِنْ حَيْثُ جِئْتِ فَتَطْلُعُ مِنْ مَغْرِبِهَا
“হে আবু যর! তুমি কি জান সূর্য যখন অস্ত যায় তখন কোথায় যায়?  আবু যার বললেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় আরশের নীচে গিয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং পুনরায় উদিত হওয়ার অনুমতি চায়। অতঃপর তাকে অনুমতি দেয়া হয়। সে দিন বেশী দূরে নয়, যে দিন অনুমতি চাবে কিন্তু তাকে অনুমতি দেয়া হবে না। তাকে বলা হবে যেখান থেকে এসেছ, সেখানে ফেরত যাও। অতঃপর সূর্য পশ্চিম দিক থেকেই উদিত হবে।” এটি হবে কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্তে। আল্লাহ সূর্যকে বলবেন, যেখান থেকে এসেছ সেখানে ফেরত যাও, অতঃপর সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সূর্য পৃথিবীর উপরে ঘুরছে এবং তার এই ঘুরার মাধ্যমেই উদয়-অস্ত সংঘটিত হচ্ছে।
১০) অসংখ্য হাদীছের মাধ্যমে জানা যায় যে, উদয় হওয়া, অস্ত যাওয়া এবং ঢলে যাওয়া এই কাজগুলো সূর্যের সাথে সম্পৃক্ত। এগুলো সূর্য থেকে প্রকাশিত হওয়া খুবই সুস্পষ্ট। পৃথিবী হতে নয়।

   হয়তো এ ব্যাপারে আরো দলীল-প্রমাণ রয়েছে। সেগুলো আমার এই মুহূর্তে মনে আসছেনা। তবে আমি যা উল্লেখ করলাম, এই বিষয়টির দ্বার উম্মুক্ত করবে এবং আমি যা উদ্দেশ্য করেছি, তা পূরণে যথেষ্ট হবে। আল্লাহর তাওফীক চাচ্ছি!

প্রশ্নঃ (১৭) আল্লাহকে এক বলে সাক্ষ্য দেয়া এবং মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে আল্লাহর রাসূল হিসাবে সাক্ষ্য দেয়ার অর্থ কি?
উত্তরঃ আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মা’বূূদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রাসূল এ কথার ঘোষণা দেয়া ইসলামে প্রবেশের চাবিকাঠি স্বরূপ। এই সাক্ষ্য দেয়া ব্যতীত ইসলামে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। এই জন্যই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুয়া’য (রাঃ)কে ইয়ামান দেশে পাঠানোর সময় আদেশ দিয়েছিলেন যে, তুমি সর্বপ্রথম এই কথার সাক্ষ্য দেয়ার আহবান জানাবে যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন মা’বূূদ নাই। এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রাসূল।  

   প্রথম বাক্যটি অর্থাৎ “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর অর্থ হচ্ছে, মানুষ অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন উপাস্য নেই। সেই সাথে মুখে এই কালেমাটির উচ্চারণ করবে।

   যার দাসত্ব ও উপাসনা করা হয় তার নাম ইলাহ। (لاَ اِلَهَ اِلاَّ اللَّهُ) “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এই বাক্যটির দু’টি অংশ। একটি ‘না’ বাচক অংশ অপরটি ‘হ্যাঁ’ বাচক অংশ। “লা-ইলাহা” কথাটি ‘না’ বাচক। এবং “ইল্লাল্লাহ” কথাটি ‘হ্যাঁ’ বাচক। প্রথমে সমস্ত বাতিল মা’বূূদের জন্য কৃত সকল প্রকার এবাদতকে অস্বীকার করে দ্বিতীয় বাক্যে তা একমাত্র হক্ক মা’বূূদ আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা হয়েছে।

   “লা-ইলাহ ইল্লাল্লাহ” এর অর্থ ‘আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বূূদ নেই।’ যদি কেউ প্রশ্ন করে যে, আপনি কিভাবে বললেন আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বূূদ নেই? অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, বাস্তবে আল্লাহ ব্যতীত অসংখ্য মা’বূূদের উপাসনা করা হচ্ছে। আল্লাহ ব্যতীত যাদের এবাদত করা হচ্ছে আল্লাহও তাদেরকে মা’বূূদ হিসাবে নাম রেখেছেন। আল্লাহ বলেন,
)فَمَا أَغْنَتْ عَنْهُمْ ءَالِهَتُهُمْ الَّتِى يَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ لَمَّا جَاء أمْرُ رَبِّكَ(       
“আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা যেসব মা’বূূদকে ডাকত, আপনার পালনকর্তার হুকুম যখন এসে পড়বে, তখন কেউ কোন কাজে আসবেনা।” (সূরা হুদঃ ১০১) আল্লাহ আরো বলেনঃ
)وَ لاَ تَجْعَلْ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا ءَاخَرَ(                                                           
“আল্লাহর সাথে অন্য কোন মা’বূূদ স্থির করবেন না”। (সূরা বানী ইসরাঈলঃ ৩৯)  আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)وَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ(                                                              
“আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে মা’বূদ ডেকো না।” (সূরা কাসাসঃ ৮৮) আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
) لَنْ نَدْعُوَ مِنْ دُونِهِ إِلَهًا(
“আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মা’বূদকে আমরা কখনই আহবান করব না।” (সূরা কাহ্‌ফঃ ১৪)

   এখন আমরা কিভাবে বলতে পারি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বূদ নেই। অথচ দেখা যাচ্ছে গাইরুল্লাহর জন্য উলুহিয়্যাত উল্লেখ করা হয়েছে। আর আমরাই বা কিভাবে গাইরুল্লাহর জন্য এবাদত সাব্যস্ত করতে পারি? অথচ রাসূলগণ তাদের সমপ্রদায়ের লোকদেরকে বলেছেন,
)اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ(
“তোমরা এক আল্লাহর এবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন মা’বূদ নাই।” (সূরা আরাফঃ ৫৯)

   উপরোক্ত সমস্যার উত্তর এই যে, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বাক্যটির মধ্যে ইলাহা কথাটির পরে হাক্কুন শব্দ উহ্য রয়েছে। আসলে বাক্যটি এ রকম হবে, (لا اله حق الا الله) (লা-ইলাহা হাক্কুন ইল্লাল্লাহ) হাক্কুন শব্দটি উহ্য মানলেই সমস্যা দূর হয়ে যাবে। তাই আমরা বলব আল্লাহ ছাড়া যাদের এবাদত করা হয়, তারাও মা’বূদ কিন্তু এগুলো বাতিল মা’বূদ। এবাদত বা দাসত্ব পাওয়ার তাদের কোন অধিকার নাই। এ কথার প্রমাণ আল্লাহর বাণী,
)ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ(      
“এটাই প্রমাণিত যে, আল্লাহ-ই সত্য এবং আল্লাহ ব্যতীত তারা যাদের উপাসনা করে তারা সবাই মিথ্যা। আল্লাহ সর্বোচ্চ সুমহান।” (লুকমানঃ ৩০) আল্লাহ আরো বলেনঃ
]أَفَرَأَيْتُمْ اللَّاتَ وَالْعُزَّى, وَمَنَاةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَى, أَلَكُمْ الذَّكَرُ وَلَهُ الْأُنثَى, تِلْكَ إِذًا قِسْمَةٌ ضِيزَى, إِنْ هِيَ إِلَّا أَسْمَاءٌ سَمَّيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ مَا أَنزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلْطَانٍ(      
অর্থঃ “তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত ও ওয্‌যা সম্পর্কে এবং তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে? পুত্র সন্তান কি তোমাদের জন্য এবং কন্যা সন্তান আল্লাহর জন্যে? এমতাবস্থায় এটা তো হবে খুবই অসংগত বন্টন। এগুলো কতগুলো নাম ছাড়া অন্য কিছু নয়, যা তোমরা নিজেরা রেখেছ এবং তোমাদের পূর্ব-পুরুষেরা রেখেছে। এর সমর্থনে আল্লাহ কোন দলীল নাযিল করেন নি।” (সূরা নাজ্‌মঃ ১৯-২৩) আল্লাহ তাআ’লা কুরআনে ইউসুফ (আঃ) এর কথা উল্লেখ করে বলেন,
)مَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءً سَمَّيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ مَا أَنزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلْطَانٍ(    
“তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে নিছক কতগুলো নামের এবাদত কর, সেগুলো তোমরা এবং তোমাদের বাপ-দাদারা নাম করণ করে নিয়েছো। আল্লাহ এদের পক্ষে কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেন নি।” (সূরা ইউসুফঃ ৪০) সুতরাং লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ অর্থ আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নাই। তিনি ব্যতীত অন্যান্য মা’বূূদগুলো সত্য মা’বূদ নয়। বরং তা বাতিল উপাস্য।

   মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রাসূল এ কথার সাক্ষ্য দেয়ার অর্থ এই যে, অন্তরে বিশ্বাস এবং মুখে এই কথার স্বীকৃতি প্রদান করা যে, মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ সমস্ত জিন ও মানুষের জন্য রাসূল হিসাবে প্রেরিত হয়েছেন। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)قُلْ يَاأَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِ وَيُمِيتُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَكَلِمَاتِهِ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ(
“হে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনি বলে দিন যে, হে মানব মন্ডলী তোমাদের সবার প্রতি আমি আল্লাহ প্রেরিত রাসূল, সমগ্র আসমান ও জমিনের রাজত তাঁর। একমাত্র তাঁকে ছাড়া আর কারো উপাসনা নয়। তিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন। সুতরাং তোমরা সবাই বিশ্বাস স্থাপন কর আল্লাহর উপর, তার প্রেরিত উম্মী নবীর উপর, যিনি বিশ্বাস রাখেন আল্লাহর উপর এবং তাঁর সমস্ত কালামের উপর। তাঁর অনুসরণ কর, যাতে তোমরা সরল পথ পেতে পার।” (সূরা আরাফঃ ১৫৮) আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا(                             
“পরম কল্যাণময় তিনি যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফায়সালার গ্রন' অবতীর্ণ করেছেন যাতে তিনি বিশ্ব জগতের জন্যে সতর্ককারী হতে পারেন।” (সূরা ফুরকানঃ ১) মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে রাসূল হিসাবে সাক্ষ্য দেয়ার অর্থ হলঃ

(১) তিনি যে বিষয়ের সংবাদ দিয়েছেন, তা বিশ্বাস করা,
(২) তাঁর আদেশ মান্য করা,
(৩) তিনি যে বিষয় নিষেধ করেছেন, তা থেকে দূরে থাকা
(৪) তাঁর নির্দেশিত শরীয়ত অনুযায়ী আল্লাহর এবাদত করা।
(৫) তাঁর শরীয়তে নতুন কোন বিদ্‌আত সৃষ্টি না করা।

    এই বিষয়ের সাক্ষ্য দেয়ার অন্যতম দাবী হল সৃষ্টি বা পরিচালনায় এবং প্রভুত্বে কিংবা এবাদতে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর কোন অধিকার নাই। বরং তিনি আবদ্‌ বা আল্লাহর দাস ও বান্দা। মা’বূদ নন। তিনি সত্য রাসূল। তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা যাবে না। তিনি নিজের জন্য কিংবা অপরের জন্য কল্যাণ-অকল্যাণের কোন ক্ষমতা রাখেন না। মানুষের কল্যাণ-অকল্যাণের একমাত্র মালিক আল্লাহ। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
 )قُلْ لَا أَقُولُ لَكُمْ عِندِي خَزَائِنُ اللَّهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ لَكُمْ إِنِّي مَلَكٌ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ(                                                                       
“আপনি বলুনঃ আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডার রয়েছে। তাছাড়া আমি অদৃশ্য বিষয় অবগতও নই। আমি এমনও বলি না যে, আমি ফেরেশতা। আমি তো শুধু ঐ ওহীর অনুসরণ করি, যা আমার কাছে আসে।” (সূরা আনআ’মঃ ৫০) সুতরাং তিনি একজন আদেশ প্রাপ্ত বান্দা মাত্র। তাঁর প্রতি যা আদেশ করা হয় তিনি কেবল মাত্র তারই অনুসরণ করে থাকেন। আল্লাহ বলেনঃ
)قُلْ إِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا رَشَدًا قُلْ إِنِّي لَنْ يُجِيرَنِي مِنْ اللَّهِ أَحَدٌ وَلَنْ أَجِدَ مِنْ دُونِهِ مُلْتَحَدًا(
“বলুনঃ আমি তোমাদের ক্ষতি সাধন করার ও সুপথে আনয়ন করার মালিক নই। বলুনঃ আল্লাহ তাআ’লার কবল থেকে আমাকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। এবং তিনি ব্যতীত আমি আশ্‌্রয় স্থল পাবনা।” (সূরা জিনঃ ২১-২২) আল্লাহ তাআ’লা আরো বলেনঃ
)قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنْ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِي السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ(                             
“আপনি বলে দিন, আমি আমার নিজের কল্যাণ সাধনের এবং অকল্যাণ সাধনের মালিক নই। কিন্তু আল্লাহ যা চান। আর আমি যদি গায়েবের খবর জেনে নিতে পারতাম, তাহলে বহু মঙ্গল অর্জন করে নিতে পারতাম। ফলে আমার কখনো কোন অমঙ্গল হতনা। আমি তো শুধুমাত্র একজন ভীতি প্রদর্শক এবং সুসংবাদদাতা ঈমানদারদের জন্য।” (সূরা আরা‘ফঃ ১৮৮) এটাই হল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদূর রাসূলুল্লাহ এর প্রকৃত অর্থ।

   হে পাঠক! এই অর্থের মাধ্যমেই আপনি জানতে পারলেন যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বা অন্য কোন মাখলুক এবাদতের অধিকারী নয়। এবাদতের মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআ’লা। তিনি বলেনঃ
)قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَاي وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ(                                                                     
“আপনি বলুনঃ আমার নামায, আমার কোরবানী এবং আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহর জন্যে। তাঁর কোন শরীক নেই। আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি প্রথম আনুগত্যশীল মুসলিম।” (সূরা আন্‌আমঃ ১৬২-১৬৩) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে আল্লাহ তাআ’লা যে সম্মান দান করেছেন, তাতে অধিষ্ঠিত করাই নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর জন্য যথেষ্ট। তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। মর্যাদাবান হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। তাঁর উপর আল্লাহর পক্ষ হতে সীমাহীন শান্তির ধারা বর্ষিত হোক।

প্রশ্নঃ (১৮) লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ কিভাবে তাওহীদের সকল প্রকারকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে? (১৯) মানুষ এবং জিন সৃষ্টির উদেশ্য কি?
উত্তরঃ “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এই পবিত্র বাক্যটি তাওহীদের সকল প্রকারকে অন্তর্ভুক্ত করে। কখনো প্রকাশ্যভাবে আবার কখনো অপ্রকাশ্যভাবে। লা-ইলাহ ইল্লাল্লাহ বলার সাথে সাথে বাহ্যিকভাবে তাওহীদে উলুহিয়্যাতকেই বুঝায়। তবে তা তাওহীদে রুবুবিয়্যাতকেও শামীল করে। কেননা যারা আল্লাহর এবাদত করে তারা আল্লাহর রুবুবিয়াতকে স্বীকার করে বলেই তা করে থাকে। এমনিভাবে তাওহীদে আসমা ওয়াস্‌সিফাতকেও অন্তর্ভুক্ত করে। কারণ যার কোন ভাল নাম ও গুণাবলী নাই মানুষ কখনই তার এবাদত করতে রাজি হবে না। এই জন্যই ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পিতাকে বলেছেনঃ
)يَاأَبَتِ لِمَ تَعْبُدُ مَا لَا يَسْمَعُ وَلَا يُبْصِرُ وَلَا يُغْنِي عَنْكَ شَيْئًا(                               
“হে আমার পিতা! যে শুনে না, দেখে না এবং তোমার কোন উপকারে আসেনা, তার এবাদত কেন কর?” (সূরা মারইয়ামঃ ৪২) সুতরাং তাওহীদে উলুহিয়াতের স্বীকৃতি তাওহীদে রুবুবিয়াত ও তাওহীদে আসমা ওয়াস্‌ সিফাতকেও অন্তর্ভুক্ত করে।

প্রশ্নঃ (১৯) মানুষ এবং জিন সৃষ্টির উদেশ্য কি?
উত্তরঃ উক্ত প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পূর্বে আল্লাহর সৃষ্টির সাধারণ নিয়ম এবং আল্লাহর শরীয়ত সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই। আল্লাহর সৃষ্টির নিয়মটি বিধৃত হয়েছে আল্লাহর নিম্মোক্ত বাণীসমূহে
)وَهُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ(                                                                            
“তিনি সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।” (সূরা তাহরীমঃ ২) আল্লাহর বাণী,
)إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا(                                                             
“নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ এবং প্রজ্ঞাময়।” (সূরা নিসাঃ ২৪) এছাড়া আরো অসংখ্য দলীল-প্রমাণ রয়েছে। এগুলো প্রমাণ করে যে, আল্লাহ যা সৃষ্টি করেন এবং যার আদেশ প্রদান করেন তাতে তিনি মহা কৌশলী। তিনি যাই সৃষ্টি করেন না কেন, তার পিছনে রয়েছে এক বিরাট উদ্দেশ্য। তিনি আমাদের জন্য যে শরীয়ত দিয়েছেন, তার ভিতরেও রয়েছে এক বিরাট হিকমত। চাই কোন বস্ত ওয়াজিব করার ভিতরে হোক কিংবা হারাম করার ভিতরে হোক। অথবা বৈধ করার মাঝেই হোক না কেন। এই হিকমত আমরা কখনো জানতে পারি আবার কখনো জানতে পারিনা। আল্লাহ প্রদত্ব জ্ঞানের মাধ্যমে কখনো কিছু লোকে জানে আবার অনেকে জানেই না। তাই আমরা বলব যে, আল্লাহ তাআ’লা জিন এবং মানুষকে এক বিরাট উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। তা হল একমাত্র আল্লাহর এবাদত করা। আল্লাহ বলেনঃ
) وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ(                                                    
“আমি জিন এবং মানুষকে আমার এবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।” (সূরা যারিয়াতঃ ৫৬) আল্লাহ আরো বলেনঃ
)أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ(                                  
“তোমরা কি ধারণা করেছ যে, আমি তোমাদেরকে এমনিই সৃষ্টি করেছি? আর তোমরা আমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে না?” (সূরা মুমিনূনঃ ১১৫) আল্লাহ আরো বলেনঃ
)أَيَحْسَبُ الْإِنسَانُ أَنْ يُتْرَكَ سُدًى(                                                         
“মানুষ কি ধারণা করে যে, তাদেরকে এমনিতেই ছেড়ে দেয়া হবে?” (সূরা কিয়ামাহঃ ৩৬) এছাড়া আরো অনেক আয়াত প্রমাণ করে যে, জিন্তইনসানের সৃষ্টিতে আল্লাহ তাআ’লার এক মহান উদ্দেশ্য রয়েছে। তা হল আল্লাহর এবাদত করা। ভালবাসা ও সম্মানের সাথে আল্লাহর আদেশ সমূহ বাস্তবায়ন করা এবং নিষেধ সমূহ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহর জন্য নিবেদিত হওয়ার নাম এবাদত। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
]وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ[
“তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে আল্লাহর এবাদত করবে।” (সূরা বাইয়িনাহঃ ৫) এই হল মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর এবাদত করতে অহংকার করবে, সে ব্যক্তি এই হিকমত প্রত্যাখ্যানকারী হিসাবে গণ্য হবে। যার জন্য আল্লাহ তাআ’লা মানুষ সৃষ্টি করেছেন। সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা না করলে কি হবে তাদের কর্মসমূহ প্রমাণ বহন করে যে, আল্লাহ যেন তাদেরকে অযথা সৃষ্টি করেছেন।

প্রশ্নঃ (২০) কিছু কিছু মানুষ আল্লাহর কাছে দু’আ করে থাকে। কিন্তু দু’আ কবূল হওয়ার কোন লক্ষণ দেখা যায় না। অথচ আল্লাহ তাআ’লা বলেছেন, “তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব”। তাহলে মানুষ কিভাবে আল্লাহর কাছে দু’আ করলে তা কবূল হবে?
উত্তরঃ বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর জন্য সমস্ত প্রশংসা। দরূদ ও সালাম পেশ করছি আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর পরিবার এবং সকল সাহাবীর উপর। মুসলমান ভাইদের জন্য আল্লাহর কাছে আকীদাহ ও আমলের ক্ষেত্রে সঠিক পথের তাওফীক প্রার্থনা করছি। আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
)وَقَالَ رَبُّكُمْ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ(         
তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব। যারা আমার এবাদতে অহংকার করে তারা সত্বরই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে। (সূরা গাফেরঃ ৬০) প্রশ্নকারী বলেছেন যে, তিনি আল্লাহর কাছে দু’আ করে থাকেন। অথচ আল্লাহ তার দু’আ কবূল করেন না। ফলে তার কাছে এই অবস্থা কঠিন বলে মনে হয়। বিশেষ করে আল্লাহ তো ওয়াদা করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দু’আ করে, আল্লাহ তার দু’আ কবূল করেন। আল্লাহ কখনই ওয়াদা খেলাফ করেন না। উক্ত প্রশ্নের জবাবে আমরা বলব যে, দু’আ কবূলের জন্য কতিপয় শর্ত রয়েছে। তা সর্ববস্থায় দু’আর ক্ষেত্রে বর্তমান থাকতে হবে।

প্রথম শর্তঃ একাগ্রচিত্তে আল্লাহর কাছে দু’আ করা। অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে, এই বিশ্বাসের সাথে আল্লাহর কাছে দু’আ করা যে, আল্লাহ কবূল করতে সক্ষম। দু’আ করার সময় এই আশা রাখবে যে, আল্লাহ তা কবূল করবেন।

দ্বিতীয় শর্তঃ দু’আ করার সময় এই কথা অনুভব করবে যে, দু’আ কবূলের দিকে সে খুবই মুখাপেক্ষী। শুধু তাই নয় বরং এ কথাও অনুভব করবে যে, একমাত্র আল্লাহই বিপদগ্রস্ত ফরিয়াদকারীর ফরিয়াদ শ্রবণ করেন এবং তিনিই বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। যদি এ কথা অনুভব করে যে, সে আল্লাহর দিকে মুখাপেক্ষী নয় এবং আল্লাহর কাছে তার কোন প্রয়োজনও নেই; বরং দু’আ করাটা যেন একটা অভ্যাসমাত্র তাহলে এ ধরণের দু’আ কবূল না হওয়ারই উপযোগী।

তৃতীয় শর্তঃ হারাম খাওয়া থেকে দূরে থাকবে। কারণ বান্দা এবং তার দু’আ কবূল হওয়ার মধ্যে হারাম রুযী প্রতিবন্ধক হয়ে থাকে। ছহীহ হাদীছে প্রমাণিত আছে যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا وَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَ الْمُؤْمِنِينَ بِمَا أَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِينَ فَقَالَ ( يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ ) وَقَالَ  (يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ ) ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُلَ يُطِيلُ السَّفَرَ أَشْعَثَ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ يَا رَبِّ يَا رَبِّ وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ وَغُذِيَ بِالْحَرَامِ فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ
“নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহ পবিত্র তিনি পবিত্র ব্যতীত অন্য কিছু গ্রহণ করেন না। আল্লাহ তাআ’লা রাসূলদের (আঃ) প্রতি যা নির্দেশ দিয়েছেন, মুমিনদের প্রতিও তাই নির্দেশ দিয়েছেন।” তিনি বলেনঃ
)ياَ أيُّهاَ الرُّسُلُ كُلُوْا مِنْ الطَّيِّباَتِ واعْمَلُوْا صاَلِحا(ً
“হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্ত থেকে আহার্য গ্রহণ কর এবং সৎ কর্ম কর।” (সুরা মুমিনুনঃ ৫১) আল্লাহ বলেনঃ
)ياَ أيُّهاَ الَّذِيْنَ آمَنُوْا كُلُوْا مِنْ طَيِّباَتِ ماَ رَزَقْناَكُمْ (
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা পবিত্র বস্ত সামগ্রী থেকে আহার গ্রহণ কর, যেগুলো আমি তোমাদেরকে রুযী হিসেবে দান করেছি।” (সূরা বাকারাঃ ১৭২) অতঃপর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেই ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দীর্ঘ সফর করে এলায়িত কেশ ও ধুলামিশ্রিত পোশাক নিয়ে অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে আকাশের দিকে দু’হাত তুলে ডাকতে থাকে হে, প্রতিপালক! হে রব!! অথচ সে ব্যক্তির পানাহার সামগ্রী হারাম উপার্জনের, পোশাক-পরিচ্ছদ হারাম পয়সায় সংগৃহীত, এমতাবস্থায় কি করে তার দু’আ কবূল হতে পারে ?”

দু’আ কবূলের সকল মাধ্যম অবলম্বন করা সত্বেও নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ লোকের দু’আ কবূল হওয়াকে অসম্ভব মনে করলেন। দু’আ কবূলের কারণগুলো নিম্নরূপঃ

১) আকাশের দিকে হাত উত্তোলন করা। কেননা আল্লাহ তাআ’লা আকাশে আরশের উপরে। আল্লাহর দিকে হাত উঠানো দু’আ কবূলের অন্যতম কারণ। হাদীছে এসেছে,
)إِنَّ اللَّهَ حَيِيٌّ كَرِيمٌ يَسْتَحْيِي إِذَا رَفَعَ الرَّجُلُ إِلَيْهِ يَدَيْهِ أَنْ يَرُدَّهُمَا صِفْرًا(                
“নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যন্ত লজ্জাশীল ও সম্মানী। বান্দা যখন তাঁর দিকে দু’হাত উঠিয়ে দু’আ করে, তখন তিনি হাত দু’টিকে খালি অবস্থায় ফেরত দিতে লজ্জা বোধ করেন।”

২) এই লোকটি আল্লাহর একটি নাম رب)) ‘পালনকর্তা’ উচ্চারণ করে করে দু’আ করেছে। এই নামের উসীলা গ্রহণ করা দু’আ কবূলের অন্যতম কারণ। কেননা রব্ব অর্থ পালনকর্তা, সমস্ত মাখলুকাতের সৃষ্টিকারী ও পরিচালনাকারী। তাঁর হাতেই আকাশ-জমিনের চাবি-কাঠি। এ জন্যই আপনি কুরআন মজীদের অধিকাংশ দু’আতেই দেখতে পাবেন, ‘রব্ব’ বা পালনকর্তা শব্দটি উল্লেখিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
)رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلْإِيمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ رَبَّنَا وَآتِنَا مَا وَعَدْتَنَا عَلَى رُسُلِكَ وَلَا تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ فَاسْتَجَابَ لَهُمْ رَبُّهُمْ أَنِّي لَا أُضِيعُ عَمَلَ عَامِلٍ مِنْكُمْ مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى بَعْضُكُمْ مِنْ بَعْضٍ(             
“হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা নিশ্চিতরূপে শুনেছি একজন আহবানকারীকে ঈমানের প্রতি আহবান করতে যে, তোমাদের পালনকর্তার প্রতি ঈমান আন। তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের পালনকর্তা! অতঃপর আমাদের সকল গুনাহ মাফ কর এবং আমাদের সকল দোষত্রুটি দূর করে দাও, আর আমাদের মৃত্যু দাও নেক লোকদের সাথে। হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে দাও, যা তুমি ওয়াদা করেছ তোমার রাসূলগণের মাধ্যমে এবং কিয়ামতের দিন তুমি আমাদিগকে অপমানিত করো না। নিশ্চয় তুমি ওয়াদা খেলাফ করো না। অতঃপর তাদের পালনকর্তা তাদের দু’আ এই বলে কবূল করে নিলেন যে, আমি তোমাদের কোন পরিশ্রমকারীর পরিশ্রমই বিনষ্ট করি না, সে পুরুষ হোক বা নারী লোক হোক। তোমরা সকল নারী-পুরুষই সমান।” (সূরা আল-ইমরানঃ ১৯৩-১৯৫) সুতরাং আল্লাহর এই নামের (রব্ব) মাধ্যমে উসীলা দেয়া দু’আ কবূলের অন্যতম কারণ।

৩) এই লোকটি মুসাফির ছিল। সফর করাকে অধিকাংশ সময় দু’আ কবূলের কারণ হিসাবে গণ্য করা হয়। কেননা সফর অবস্থায় মানুষ আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। স্বদেশে অবস্থানকারীর চেয়ে মুসাফির আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি অধিক মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। মুসাফির এলোমেলো কেশ বিশিষ্ট ও ময়লাযুক্ত কাপড় পরিধানকারী হয়। মনে হয় সে নিজের নফসের প্রতি কোন গুরুত্বই দিচ্ছে না। আল্লাহর কাছে দু’আ করা ব্যতীত তার অন্য কোন উপায় নেই। সফরে থেকে এলোকেশ বিশিষ্ট হয়ে ও ময়লাযুক্ত পোশাক পরিহিত অবস্থায় দু’আ করা দু’আ কবূলের পক্ষে খুবই সহায়ক। হাদীছে আছে, আল্লাহ তাআ’লা আরাফার দিন বিকাল বেলা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং আরাফাতে অবস্থানকারীদেরকে নিয়ে ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করে বলেন, “প্রতিটি অঞ্চল হতে তারা আমার কাছে এসেছে, ধুলা-মলিন পোষাক নিয়ে এবং এলোকেশ বিশিষ্ট অবস্থায়। 

যাই হোক দু’আ কবূলের উপরোক্ত কারণগুলো থাকা সত্বেও কোন কাজ হলো না। কারণ একটাই তার খাদ্য-পানীয় ছিল হারাম, পোষাক ছিল হারাম এবং হারাম খেয়ে তার দেহ গঠিত হয়েছে। এ জন্যই নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, কি ভাবে তার দু’আ কবূল করা হবে? দু’আ কবূলের এই শর্তগুলো পাওয়া না গেলে দু’আ কবূলের কোনই সম্ভাবনা নেই। শর্তগুলো বর্তমান থাকার পরও যদি দু’আ কবূল না হয়, তাহলে বুঝতে হবে কি কারণে দু’আ কবূল হয়নি, তা আল্লাহই ভাল জানেন। দু’আকারী এ বিষয়ে জানার কোন সুযোগ নাই। দুু’আ কবূলের সকল শর্ত বর্তমান থাকার পরও দু’আ কবূল না হলে হতে পারে আল্লাহ তার উপর থেকে দু’আ কবূলের চেয়ে বড় কোন মুসিবত দূর করবেন। অথবা এও হতে পারে যে, কিয়ামতের দিনের জন্য তার দু’আকে সঞ্চয় করে রাখবেন এবং সেদিন তাকে অধিক পরিমাণে বিনিময় দান করবেন। কেননা ব্যক্তি দু’আ কবূলের সকল শর্ত বাস্তবায়ন করে আল্লাহর কাছে দু’আ করার পরও দু’আ কবূল করা হয়নি এবং তার উপর থেকে বড় কোন মুসিবতও দূর করা হয়নি। হয়ত বান্দা দু’আ কবূলের সকল শর্ত পূরণ করে দু’আ করেছে। কিন্তু দ্বিগুণ পুরস্কার দেয়ার জন্য তার দু’আ কবূল করা হয়নি। একটি পুরস্কার দু’আ করার কারণে এবং অন্য একটি পুরস্কার মুসীবত দূর না করার কারণে। সুতরাং তার জন্য দু’আ কবূলের চেয়ে মহান জিনিষ তার জন্য ক্বিয়ামতের দিন সঞ্চয় করে রাখা হবে।

মানুষের উচিৎ হল দু’আর ফলাফলের জন্য তাড়াহুড়া না করা। কেননা তাড়াহুড়া করা দু’আ কবূল না হওয়ার অন্যতম কারণ। হাদীছে এসেছে,
يُسْتَجَابُ لِأَحَدِكُمْ مَا لَمْ يَعْجَلْ قَالُوْا كَيْفَ يَعْجَلُ يَا رَسُولُ اللَّهِ؟ قَالَ يَقُولُ دَعَوْتُ و دَعَوْتُ وَ دَعَوْتُ فَلَمْ يُسْتَجَبْ لِى                                                      
“তোমাদের কেউ দু’আয় তাড়াহুড়া না করলে তার দু’আ কবূল হয়ে থাকে। ছাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, কিভাবে তাড়াহুড়া করা হয়ে থাকে? রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, বান্দা বলে থাকে কত দু’আ করলাম, কত দু’আ করলাম, কত দু’আ করলাম, কিন্তু কবূল তো হচ্ছে না।” তাই কারও জন্য দু’আতে তাড়াহুড়া এবং দু’আ করতে করতে ক্লান্তি বোধ করে দু’আ করা ছেড়ে দেয়া ঠিক নয়; বরং বেশী বেশী দু’আ করা উচিৎ। কারণ দু’আ একটি এবাদত। যা মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিবে এবং প্রতিদান বৃদ্ধি করবে। কাজেই হে দ্বীনী ভাই! ছোট-বড় এবং কঠিন্তসহজ সকল বিষয়ে আপনাকে বেশী বেশী দু’আ করার উপদেশ দিচ্ছি। আল্লাহ সবাইকে তাওফীক দিন।

প্রশ্নঃ (২১) ইখলাছ অর্থ কি? কোন মানুষ যদি এবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন'ষ্টি ছাড়া অন্য কিছুর নিয়ত করে, তবে তার বিধান কি?
উত্তরঃ বান্দা তার আমলের মাধ্যমে একমাত্র আল্লাহ তাআ’লার নৈকট্য কামনা করবে এবং বেহেশতে পৌঁছার চেষ্টা করবে।

আর যদি বান্দা তার আমলে অন্য কিছুর নিয়ত করে, তবে তাতে নিম্ন লিখিত ব্যাখ্যা রয়েছে।

১) যদি আল্লাহর সন'ষ্টি ছাড়া অন্যের নৈকট্য লাভের নিয়ত করে এবং এবাদতের মাধ্যমে মানুষের প্রশংসা অর্জনের নিয়ত করে, তাহলে তার আমল বাতিল হয়ে যাবে। এটা শির্কের অন্তর্ভুক্ত। হাদীছে কুদছীতে বর্ণিত আছে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহ বলেন,
أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ مَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ                                                                  
“আমি সমস্ত শরীকদের চেয়ে শির্ক থেকে অধিক মুক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করল, যাতে সে আমার সাথে অন্য কোন কাউকে শরীক করল, আমি তাকে এবং সে যা শরীক করল, তাকে প্রত্যাখ্যান করব।”

২) যদি আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্য ব্যতীত দুনিয়ার কোন স্বার্থ হাসিলের নিয়ত করে যেমন, নেতৃত্ব লাভ, সম্মান লাভ ইত্যাদি তাহলে তার আমল বাতিল হয়ে যাবে। এ ধরণের আমল তাকে আল্লাহর নৈকট্য দান করবে না। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَا كَانُوا يَعْمَلُون(                 
“যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা করে, হয় আমি তাদের দুনিয়াতেই তাদের আমলের প্রতিফল ভোগ করিয়ে দেব এবং তাতে তাদের প্রতি কিছুমাত্র কমতি করা হবে না। এরাই হল সেসব লোক যাদের জন্য আখেরাতে আগুন ছাড়া অন্য কিছু নেই। তারা দুনিয়াতে যা কিছু করেছিল, সবই বরবাদ করেছে, আর যা কিছু উপার্জন করেছিল, সবই বিনষ্ট।” (সূরা হুদঃ ১৫-১৬)

প্রথম প্রকার শির্ক এবং এই প্রকার শির্কের মাঝে পার্থক্য এই যে, প্রথম লোকটি আল্লাহর এবাদতকারী হিসেবে মানুষের প্রশংসা অর্জনের নিয়ত করেছে। আর দ্বিতীয় লোকটি আল্লাহর ইবাদতকারী হিসেবে মানুষের প্রশংসা অর্জনের নিয়ত করেনি। মানুষের প্রশংসার প্রতি তার কোন ভ্রুক্ষেপও নেই।

৩) আমল শুরু করার সময় আল্লাহর নৈকট্য লাভের নিয়ত করেছে। কিন্তু পার্থিব স্বার্থ এমনিতেই চলে আসার সম্ভাবনা থাকে। যেমন পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে এবাদতের নিয়তের সাথে সাথে শারীরিক পরিচ্ছন্নতা অর্জনের নিয়ত করা, নামাযের মাধ্যমে শরীর চর্চার নিয়ত করা, রোজার মাধ্যমে শরীরের ওজন কমানো ও চর্বি দূর করা এবং হজ্জের মাধ্যমে পবিত্র স্থান এবং হাজীদেরকে দেখার নিয়ত করা। এ রকম করাতে এবাদতে ইখলাছের ছাওয়াব কমে যাবে। আর যদি এবাদতের নিয়তটাই প্রবল হয়, তা হলে পরিপূর্ণ প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হবে। আর ঐ পরিমাণ মিশ্রিত নিয়ত তার কোন ক্ষতি করবে না- মিথ্যা ও গুনাহ করার দ্বারা যেমন হয়। হজ্জের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআ’লা বলেছেনঃ
)لَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَبْتَغُوا فَضْلًا مِنْ رَبِّكُمْ(
“তোমাদের উপর তোমাদের পালন কর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করায় কোন পাপ নেই।” (সূরা বাকারাঃ ১৯৮) আর যদি এবাদতের নিয়ত ছাড়া অন্য কোন নিয়ত প্রবল থাকে তাহলে দুনিয়াতে যা অর্জন করল ছওয়াব হিসেবে কেবল তাই পাবে, পরকালে ছাওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে। এ রকম করার কারণে সে ব্যক্তি পাপী হওয়ার আশংকা রয়েছে। কেননা সে আল্লাহর এবাদতের মাধ্যমে দুনিয়ার নগণ্য স্বার্থের নিয়ত করেছে। এ রকম ব্যক্তির ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)وَمِنْهُمْ مَنْ يَلْمِزُكَ فِي الصَّدَقَاتِ فَإِنْ أُعْطُوا مِنْهَا رَضُوا وَإِنْ لَمْ يُعْطَوْا مِنْهَا إِذَا هُمْ يَسْخَطُون(                                                                              
“তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে, যারা সাদ্‌কা বন্টনে আপনাকে দোষারোপ করে। সাদ্‌কা থেকে কিছু পেলে তারা সন্তুষ্ট হয় এবং না পেলে অসন্তুষ্ট হয়।” (সূরা তাওবাঃ ৫৮) আবু দাউদ শরীফে আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একজন লোক রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর কাছে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! কোন লোক যদি দুনিয়ার কোন সম্পদ লাভের আশায় জিহাদে যায় তবে তার ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি? নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, সে প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হবে। লোকটি কয়েকবার প্রশ্ন করল। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতিবারই বললেন, সে ব্যক্তি ছাওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে। সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
فَمَنْ كَانَتْ هِجْرَتُهُ إِلَى دُنْيَا يُصِيبُهَا أَوْ إِلَى امْرَأَةٍ يَنْكِحُهَا فَهِجْرَتُهُ إِلَى مَا هَاجَرَ إِلَيْهِ
“যে ব্যক্তি দুনিয়ার কোন স্বার্থ হাসিলের জন্য হিজরত করবে অথবা কোন মহিলাকে বিবাহ করার জন্য হিজরত করবে, তার হিজরত তার নিয়ত অনুযায়ীই হবে।”

আর যদি তার কাছে উভয়টি সমান হয় অর্থাৎ এবাদতের নিয়ত কিংবা অন্য কোন নিয়তের কোনটিই প্রবল না হয়, তাহলেও বিশুদ্ধ কথা হলো সে ছাওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে। যেমনিভাবে কোন ব্যক্তি আল্লাহর জন্য এবং অন্যের জন্য এবাদত করলে ছাওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে।

মোট কথা অন্তরের নিয়তের ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমেই বান্দা কখনো সিদ্দীকীনের স্তরে পৌঁছে যায় আবার কখনো নিকৃষ্টতম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এই জন্যই কোন কোন সালাফে সালেহীন বলেছেন, এখলাছের ব্যাপারে আমি যতটুকু নাফসের সাথে জিহাদ করেছি, অন্য কোন ব্যাপারে আমার নাফসের সাথে ততটুকু জেহাদ করিনি।

প্রশ্নঃ (২২) আশা এবং ভয়ের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মতামত কি?
উত্তরঃ মানুষ আশাকে ভয়ের উপর প্রাধান্য দিবে? না ভয়কে আশার উপর? এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে।

ইমাম আহমাদ বিন হান্বাল (রাঃ) বলেছেন, মানুষের নিকট আশা এবং ভয় সমান সমান হওয়া উচিৎ। একটিকে অন্যটির উপর প্রাধান্য দেয়া উচিৎ নয়। তিনি আরো বলেন, একটি অন্যটির উপর প্রাধান্য দিলে বিপথগামী হবে। কেননা আশাকে প্রাধান্য দিলে মানুষ আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করবে। আর ভয়কে প্রাধান্য দিলে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে পড়বে।

কোন কোন আলেম বলেন, সৎ আমলের ক্ষেত্রে আল্লাহর রহমত পাওয়ার আশাকে প্রাধান্য দিবে এবং পাপ কাজের প্রতি ধাবিত হওয়ার সময় আল্লাহর ভয়কে সামনে রাখবে। কেননা বান্দা আনুগত্যের কাজের দ্বারা আল্লাহর প্রতি ভাল ধারণা আবশ্যক হওয়ার কাজ করে থাকে। তাই আশার দিককে অর্থাৎ আমলটি কবূল হওয়ার আশাকে প্রাধান্য দেয়া উচিৎ। আর মনের ভিতরে যদি পাপ কাজের ইচ্ছা জাগ্রত হয়, তখন আল্লাহর ভয়কে প্রাধান্য দেয়া উচিৎ। যাতে পাপ কাজে লিপ্ত না হয়।

কিছু কিছু আলেম বলেছেন, সুস্থ ব্যক্তির ভয়কে প্রাধান্য দেয়া উচিৎ। আর অসুস্থ ব্যক্তির জন্য আশার আলো থাকা দরকার। কেননা সুস্থ ব্যক্তির নিকটে ভয় বেশী থাকলে পাপের কাজে অগ্রসর হওয়া থেকে বিরত থাকবে। আর রোগী ব্যক্তি আশাকে প্রাধান্য দিবে। কারণ সে যদি আশাকে প্রাধান্য দেয়, তা হলে আল্লাহর সাথে ভাল ধারণা রাখা অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে।

এই মাসআলাতে আমার কাছে গ্রহণ যোগ্য কথা হল মানুষের অবস্থাভেদে হুকুম বিভিন্ন হবে। ভয়ের দিককে প্রাধান্য দিতে গেলে যদি আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হওয়ার আশঙ্ককা থাকে, তা হলে মন থেকে এ ধরণের ভয় দূর করে দিয়ে আশার দিককে স্থান দিবে। আর যদি আশঙ্ককা থাকে যে, আশার দিককে প্রাধান্য দিতে গেলে আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিজেকে মুক্ত ভাবার ভয় রয়েছে, তা হলে ভয়কেই প্রাধান্য দিবে। মানুষ তার অন্তরের ডাক্তার। যদি তার অন্তর জীবিত থাকে। আর যদি অন্তর মৃত হয়ে থাকে, তা হলে তার কোন চিকিৎসা নেই।

প্রশ্নঃ (২৩) উপায় গ্রহণ করা কি আল্লাহর উপর ভরসা করার পরিপন্থী উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় কেউ কেউ উপায় অবলম্বন করেছে। আবার কতক লোক এই বলে উপায় অবলম্বন করা বাদ দিয়েছে যে, আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করলাম। এই ব্যাপারে আপনার মতামত কি?
উত্তরঃ মুমিনের উপর কর্তব্য হল অন্তরকে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত রাখা এবং কল্যাণ অর্জন এবং অকল্যাণ দূর করণে আল্লাহর উপর ভরসা করা। কেননা আকাশ-জমিনের চাবি কাঠি আল্লাহর হাতে। তাঁর হাতেই মানুষের সকল বিষয়। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)وَلِلَّهِ غَيْبُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَإِلَيْهِ يُرْجَعُ الْأَمْرُ كُلُّهُ فَاعْبُدْهُ وَتَوَكَّلْ عَلَيْهِ وَمَا رَبُّكَ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ(
“আল্লাহর নিকটেই আছে আকাশ ও জমিনের গোপন তথ্য, আর প্রত্যেকটি বিষয় প্রত্যাবর্তন করবে তাঁরই দিকে; অতএব তাঁরই বন্দেগী কর এবং তাঁরই উপর ভরসা রাখ, আর তোমাদের কার্যকলাপ সম্বন্ধে তোমার পালনকর্তা বে-খবর নন।” (সূরা হুদঃ ১২৩) মূসা (আঃ) স্বজাতিকে লক্ষ্য করে বলেনঃ
)وَقَالَ مُوسَى يَاقَوْمِ إِنْ كُنْتُمْ آمَنْتُمْ بِاللَّهِ فَعَلَيْهِ تَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُسْلِمِينَ فَقَالُوا عَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْنَا رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ وَنَجِّنَا بِرَحْمَتِكَ مِنْ الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ(         
অর্থঃ আর মূসা বললেন, হে আমার সমপ্রদায়! তোমরা যদি আল্লাহর উপর ঈমান এনে থাক, তবে তারই উপর ভরসা কর যদি তোমরা মুসলমান হয়ে থাক। তখন তারা বলল, আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করলাম। হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে এই জালেম সমপ্রদায়ের ফিতনার বিষয়ে পরিণত করোনা। আর আমাদেরকে অনুগ্রহ করে এই কাফেরদের কবল হতে উদ্ধার করুন। (সূরা ইউনুসঃ ৮৪-৮৬) আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلْ الْمُؤْمِنُونَ(                                                          

মুমিনদের উপর আবশ্যক হচ্ছে আল্লাহর প্রতি ভরসা করা। (সূরা আল-ইমরানঃ ১৬০) আল্লাহ তাআ’লা আরো বলেনঃ
)وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا(
যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ পূর্ণ করবেন। আল্লাহ সবকিছুর জন্য একটি পরিমাণ স্থির করে রেখেছেন। (সূরা তালাকঃ ৩) সুতরাং বান্দার উপর আবশ্যক হল তার মালিক এবং আকাশ-জমিনের মালিকের উপর ভরসা করবে এবং তাঁর প্রতি ভাল ধারণা রাখবে। সাথে সাথে বাহ্যিক উপায়-উপকরণ গ্রহণ করবে এবং আত্মরক্ষামূলক সতর্কতা অবলম্বন করবে। কেননা কল্যাণ সংগ্রহের উপকরণ গ্রহণ করা এবং অকল্যাণ থেকে বেঁচে থাকার উপায় অবলম্ভন করা আল্লাহর উপর ঈমান আনা এবং তাঁর উপর ভরসা করার পরিপন্থী নয়। দেখুন সর্বশ্রেষ্ঠ ভরসাকারী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উপায় ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। নিদ্রায় যাওয়ার পূর্বে তিনি সূরা ইখলাস, ফালাক এবং নাস পাঠ করার মাধ্যমে রোগ-ব্যাধি থেকে বাঁচার জন্য শরীরে ফুঁক দিতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুদের আঘাত থেকে শরীর হেফাজত করার জন্য লোহার পোষাক পরিধান করতেন। যখন মুশরেক সমপ্রদায় মদীনা আক্রমণ করার জন্য তার চারপাশে একত্রিত হল, তখন মদীনাকে সংরক্ষণ করার জন্য তার চতুর্পার্শ্বে খন্দক খনন করেছেন। যুদ্ধের সময় আত্মরক্ষার জন্য আল্লাহ যে সমস্ত হাতিয়ার সৃষ্টি করেছেন, তার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিৎ। আল্লাহ তাআ’লা তাঁর নবী দাউদ (আঃ) এর সম্পর্কে বলেনঃ
)وَعَلَّمْنَاهُ صَنْعَةَ لَبُوسٍ لَكُمْ لِتُحْصِنَكُمْ مِنْ بَأْسِكُمْ فَهَلْ أَنْتُمْ شَاكِرُونَ(
“আমি তাঁকে তোমাদের জন্যে বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে তা যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে। অতএব তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে? (সূরা আম্বিয়াঃ ৮০) আল্লাহ তাআ’লা দাউদ (আঃ) কে ভালভাবে যুদ্ধের বর্ম তৈরী করার আদেশ দিয়েছেন এবং তা লম্বা করে তৈরী করতে বলেছেন। কারণ আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে অধিক শক্তিশালী।

উপরের আলোচনার উপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, যুদ্ধের স্থানের কাছাকাছি অঞ্চলের লোকদের জন্য ক্ষতিকারক গ্যাস শরীরে প্রবেশের ভয় থাকলে তারা যদি উপযুক্ত পোষাক পরিধান করে, তা হলে কোন অসুবিধা নেই। কেননা এই সমস্ত উপকরণ শরীরকে হেফাজত করবে। এমনিভাবে খাদ্য দ্রব্য সংগ্রহ করে রাখাতেও কোন অসুবিধা নেই। বিশেষ করে যদি প্রয়োজনের সময় এগুলো না পাওয়ার ভয় থাকে। সর্বোপুরি ভরসা থাকবে আল্লাহর উপর। আল্লাহ তাআ’লা এ সমস্ত আসবাব গ্রহণ করার অনুমতি দিয়েছেন তাই এই সমস্ত আসবাব-উপকরণ গ্রহণ করা বৈধ। এই জন্য নয় যে, এগুলোর ভিতরে কল্যাণ-অকল্যাণ বয়ে আনার ক্ষমতা আছে।

পৃথিবীতে মানুষের চলার জন্য আল্লাহ তাআ’লা যে সমস্ত নেয়ামত সৃষ্টি করেছেন, তার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিৎ। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা এই যে, তিনি যেন আমাদের সকলকে ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা করেন এবং আমাদের ও আমাদের মুমিন ভাইদেরকে তাঁর প্রতি জন্য ঈমান এবং তাঁর উপর ভরসার বলে বলিয়ান করেন এবং এমন সব উপায় উপকরণ গ্রহণ সহজ করেন যা তাঁর পক্ষ থেকে অনুমদিত ও মনোনিত।

প্রশ্নঃ (২৪) ইসলামে উপায়-উপকরণ অবলম্বন করার হুকুম কি?
উত্তরঃ উপায়-উপকরণ গ্রহণ করা কয়েক প্রকার হতে পারেঃ

১) যা মূলতই তাওহীদের পরিপন্থী। তা এই যে, কোন ব্যক্তি আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন জিনিষের উপর পরিপূর্ণভাবে ভরসা করল, বাস্তবে যার কোন প্রভাবই নাই। মুসিবতে পড়ে কবর পূজারীরা এমনটি করে থাকে। এটি বড় শির্ক। যারা এ ধরণের শির্কে লিপ্ত হবে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
)إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ(
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শির্ক করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। তার ঠিকানা জাহান্নাম। আর জালেমদের জন্য কোন সাহায্যকারী থাকবে না।” (সূরা মায়িদাঃ ৭২)
২) শরীয়ত সম্মত উপায়-উপকরণের উপর ভরসা করা এবং আল্লাহ তাআ’লাই যে এগুলোর সৃষ্টিকারী, তা একেবারে ভুলে যাওয়া। এটাও এক প্রকার শির্ক। তাবে এটা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না।
(৩) মানুষ উপায়-উপকরণ অবলম্বন করার সাথে সাথে আল্লাহর উপর পরিপূর্ণভাবে ভরসা করবে এবং বিশ্বাস করবে যে, এই উপকরণ আল্লাহর পক্ষ থেকেই। তিনি ইচ্ছা করলে এটি ছিন্ন করে দিতে পারেন এবং ইচ্ছা করলে অবশিষ্ট রাখতে পারেন। এই ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা কোনভাবেই তাওহীদের পরিপন্থী নয়।

মোট কথা এই যে, শরীয়ত সম্মত উপায়-উপকরণ বর্তমান থাকা সত্বেও এগুলোর উপর পরিপূর্ণরূপে ভরসা করা ঠিক নয়। বরং সম্পূর্ণরূপে ভরসা একমাত্র আল্লাহর উপরই করতে হবে। সুতরাং কোন চাকরীজীবি যদি তার বেতনের উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে এবং সকল বস্তর সৃষ্টিকারী আল্লাহর উপর ভরসা করতে ভুলে যায়, তাহলে সে এক প্রকার শির্কে লিপ্ত হবে। আর যে কর্মচারী এই বিশ্বাস রাখে যে, বেতন কেবল একটি মাধ্যম মাত্র তাহলে এটা আল্লাহর উপর ভরসার বিরোধী হবে না। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আল্লাহর উপর ভরসা করার সাথে সাথে আসবাব গ্রহণ করতেন

প্রশ্নঃ (২৫) ঝাড়-ফুঁকের হুকুম কি? কুরআনের আয়াত লিখে গলায় ঝুলিয়ে রাখার হুকুম কি?
উত্তরঃ যাদু বা অন্য কোন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ঝাড়-ফুঁক করাতে কোন অসুবিধা নেই। যদি তা কুরআনের আয়াত বা অন্য কোন বৈধ দু’আর মাধ্যমে হয়ে থাকে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে প্রমাণিত আছে যে, তিনি সাহাবীদেরকে ঝাড়-ফুঁক করেছেন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে ঝাড়-ফুঁকের বিভিন্ন দু’আও প্রমাণিত আছে। তম্মধ্যে কয়েকটি দু’আ নিম্নে উল্লেখ করা হলঃ
رَبَّنَا اللَّهُ الَّذِي فِي السَّمَاءِ تَقَدَّسَ اسْمُكَ أَمْرُكَ فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ كَمَا رَحْمَتُكَ فِي السَّمَاءِ فَاجْعَلْ رَحْمَتَكَ فِي الْأَرْضِ اغْفِرْ لَنَا حُوبَنَا وَخَطَايَانَا أَنْتَ رَبُّ الطَّيِّبِينَ أَنْزِلْ رَحْمَةً مِنْ رَحْمَتِكَ وَشِفَاءً مِنْ شِفَائِكَ عَلَى هَذَا الْوَجَعِ فَيَبْرَأَ
“হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার নাম অতি পবিত্র। আকাশ এবং যমিনে আপনার আদেশ বাস্তবায়িত হয়। আকাশে যেমন আপনার রহমত বিস্তৃত রয়েছে, জমিনেও অনুরূপভাবে আপনার রহমত বিস্তার করুন। আপনি আমাদের গুনাহ ও অপরাধসমূহ ক্ষমা করুন। আপনি পবিত্রদের প্রভু, এই রোগীর উপর আপনার রহমত ও শিফা অবতীর্ণ করুন। এই ভাবে ঝাড়-ফুঁক করলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠত।”
بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ اللَّهُ يَشْفِيكَ بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ
“আল্লাহর নামে তোমাকে ঝাড়-ফুঁক করছি। প্রতিটি এমন রোগ আরোগ্যের জন্যে, যা তোমাকে কষ্ট দেয়। প্রতিটি মানুষের অকল্যাণ থেকে এবং হিংসুকের বদ নজর থেকে আল্লাহ তোমাকে শিফা দান করুন। আল্লাহর নামে তোমাকে ঝাড়-ফুঁক করছি।”
أَعُوذُ بِاللَّهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِدُ وَأُحَاذِرُ
আমি আল্লাহ এবং তাঁর কুদরতের উসীলায় আমার কাছে উপস্থিত ও আশংকিতকারী অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। রোগী ব্যক্তি শরীরের যেখানে ব্যথা অনুভব করবে, সেখানে হাত রেখে উপরোক্ত দু’আটি পাঠ করবে। উপরের দু’আগুলো ছাড়াও হাদীছে আরো অনেক দু’আ বর্ণিত হয়েছে।

কুরআনের আয়াত অথবা হাদীছে বর্ণিত দু’আ বা যিক্‌র লিখে গলায় ঝুলিয়ে রাখার ব্যাপারে আলোমেগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ বলেছেন বৈধ। আবার কেউ বলেছেন অবৈধ। তবে অবৈধ হওয়াটাই সত্যের অধিক নিকটবর্তী। কারণ এসব ঝুলিয়ে রাখার পক্ষে কোন প্রমাণ পাওয়া যায়না। এটাই সর্বাধিক সঠিক কথা; বরং একাজটি একটি শিরকী কাজ বলে গণ্য হবে। কারণ এখানে এমন জিনিষকে মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে আল্লাহ যাকে শরীয়ত সম্মত মাধ্যম হিসাবে স্বীকৃতি দেন নি। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে কোন দলীল পাওয়া যায়না। কুরআন বা অন্য দু’আ পড়ে রোগীর শরীরে ফুঁক দেয়ার কথা হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু রোগীর গলায় বা হাতে কুরআনের আয়াত লিখে ঝুলিয়ে রাখা কিংবা কুরআনের আয়াত লিখে বালিশের নীচে রেখে দেয়া সম্পূর্ণ নিষেধ।

প্রশ্নঃ (২৬) ঝাড়-ফুঁক করা কি আল্লাহর উপর (তাওয়াক্কুল) ভরসা করার পরিপন্থী?
উত্তরঃ তাওয়াক্কুল অর্থ হল কল্যাণ অর্জন এবং অকল্যাণ প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার সাথে সাথে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখা এবং তাঁর উপর নির্ভর করা। চেষ্টা করা বাদ দিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করে বসে থাকার নাম তাওয়াক্কুল নয়।

যদি প্রশ্ন করা হয়, মানুষের মাঝে সব চেয়ে বেশী আল্লাহর উপর ভরসাকারী কে? তবে উত্তর হবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তিনি কি ক্ষতি ও অকল্যাণ দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতেন না? উত্তর হল হ্যাঁ অবশ্যই করতেন। তিনি যখন যুদ্ধে বের হতেন, তখন তীর-তরবারীর আঘাত হতে আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধের পোষাক পরিধান করতেন। উহুদ যুদ্ধের দিন তিনি দু’টি লোহার বর্ম পরে বের হয়েছেন। সম্ভাব্য বিপদাপদ হতে বাঁচার জন্য প্রস্ততি স্বরূপ এই ব্যবস্থা অবলম্বন করেছেন। সুতরাং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা আল্লাহর উপর ভরসা করার পরিপন্থী নয়। অসুস্থ মানুষ নিজের উপর ঝাড়-ফুঁক করা বা অন্যান্য অসুস্থ ভাইদের ঝাড়-ফুঁক করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়। হাদীছে প্রমাণিত আছে যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সূরা ফালাক ও নাস পড়ে নিজের উপর এবং সাহাবীদের উপর ফুঁক দিতেন।

প্রশ্নঃ (২৭) তাবীজ ব্যবহার করার হুকুম কি?
উত্তরঃ
প্রথমতঃ কুরআনের আয়াত লিখে তাবীজে ভর্তি করে ব্যবহার করা। কুরআনের আয়াত লিখে তাবীজ ব্যবহার নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে প্রমাণিত নয়। কুরআন পড়ে রোগীকে ঝাড়-ফুঁক করা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে প্রমাণিত আছে।

দ্বিতীয়তঃ কুরআন ছাড়া এমন কিছু লিখে গলায় ঝুলিয়ে রাখা, যার অর্থ বোধগম্য নয়। এধরণের কিছু ব্যবহার করা কোন ক্রমেই বৈধ নয়। কেননা সে লিখিত বস্তর অর্থ অবগত নয়। কিছু কবিরাজ রয়েছে, যারা অস্পষ্ট এবং দূর্বোধ্য ভাষায় লিখে থাকে। যা আপনার পক্ষে বুঝা বা পাঠ করা সম্ভব নয়। এধরণের তাবীজ লিখা ও ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম এবং শির্ক।

প্রশ্নঃ (২৮) পানাহারের পাত্রে চিকিৎসা স্বরূপ আয়াতুল কুরসী বা কুরআনের অন্য কোন আয়াত লিখে রাখা জায়েয আছে কি?
উত্তরঃ জানা আবশ্যক যে, আল্লাহর কিতাবকে এত নিম্নস্তরে নামিয়ে আনা কোন ক্রমেই জায়েয নয়। একজন মুমিন ব্যক্তি কুরআনের সব চেয়ে মহান আয়াতটি কিভাবে পানাহারের পাত্রে লিখে রাখতে পারে? যা ঘরের ভিতরে ফেলে রাখা হয়, শিশুরা তা নিয়ে খেলা-ধুলা করে থাকে। সুতরাং এই কাজটি বৈধ নয়। যার ঘরে পানাহারের পাত্রে এরকম কিছু লেখা আছে, তার উচিৎ এই আয়াতগুলো মুছে ফেলা। কারণ এইভাবে কুরআনের আয়াত লিখে চিকিৎসা করার কথা সালাফে সালেহীন থেকে প্রমাণিত নয়।

প্রশ্নঃ (২৯) কোন কোন ইসলামী দেশে মাদরাসার ছাত্ররা শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মাযহাব হল কোন প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্দ্ধন, অস্বীকার কিংবা দৃষ্টান্ত পেশ করা ছাড়াই আল্লাহর নাম ও গুণাবলীতে বিশ্বাস স্থাপন করা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের লোকেরা জ্ঞানার্জনের মাদরাসাকে ইবনে তাইমিয়া ও তার ছাত্রদের মাদরাসা এবং আশআরীদের মাদরাসা, এই দুই ভাগে বিভক্ত করে থাকে। এই ভাবে বিভক্ত করা কি সঠিক? যে সমস্ত আলেমরা আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর অপব্যাখ্যা করে থাকে, তাদের ব্যাপারে একজন মুসলিমের অবস্থান কি রকম হওয়া দরকার?
উত্তরঃ যে ছাত্ররা এই শিক্ষা গ্রহণ করে যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মাযহাব হল কোন প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্দ্ধন, অস্বীকার কিংবা দৃষ্টান্ত পেশ করা ছাড়াই আল্লাহর নাম ও গুণাবলীতে বিশ্বাস স্থাপন করা। প্রকৃত পক্ষে এটিই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মূলনীতি। এই মাযহাব তাদের কিতাবগুলোতে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নাত অনুযায়ী এই মাযহাবই সত্য। সালাফে সালেহীনের বক্তব্যও তাই। সুস্থ বিবেক এই মাযহাবকেই সমর্থন করে।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের লোকেরা জ্ঞানার্জনের মাদরাসাকে দু’ভাগে ভাগ করে থাকেন। একটি আল্লামা ইবনে তাইমিয়া ও তাঁর ছাত্রদের মাদরাসা এবং অন্যটি আশআরী ও মাতুরিদীয়াদের মাদরাসা। ইবনে তাইমিয়ার মাদরাসার ছাত্রগণ কুরআন ও সুন্নাহর বক্তব্যকে তার বাহ্যিক অর্থ বাদ দিয়ে অন্য অর্থ গ্রহণ করার বিরোধীতা করেন। আর আশআরী ও মাতুরিদীয়া ফির্কার লোকেরা আল্লাহর নাম ও গুণাবলীকে অপব্যাখ্যা করে থাকে।

সুতরাং আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে উভয় মাদরাসার মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের লোকেরা আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে যত আয়াত ও হাদীছ এসেছে, কোন প্রকার পরিবর্তন করা ছাড়াই সেগুলোর ক্ষেত্রে ঈমান আনয়ন করে থাকেন। আর দ্বিতীয় মাদরাসার লোকেরা আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পন্ন আয়াতগুলোকে তার আসল অর্থে ব্যবহার না করে অন্য অর্থে ব্যবহার করে থাকে। নিম্নের উদাহরণটির মাধ্যমে উভয় মাযহাবের মাঝে পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ

)بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ يُنفِقُ كَيْفَ يَشَاءُ(
“বরং তাঁর হাত দু’টি সদা প্রসারিত। তিনি যেভাবে ইচ্ছা খরচ করেন।” (সূরা মায়িদাঃ ৬৪) ইবলীস যখন আল্লাহর আদেশ অমান্য করে আদমকে সেজদা করতে অস্বীকার করল তখন আল্লাহ তাকে ভর্ৎসনা করতে গিয়ে বলেনঃ   
)قَالَ يَاإِبْلِيسُ مَا مَنَعَكَ أَنْ تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ(
“আল্লাহ বললেন, হে ইবলীস! আমি যাকে আমার দু’টি হাত দিয়ে সৃষ্টি করেছি, তাকে সেজদা করতে কিসে তোকে বারণ করল?” (সূরা সুয়াদঃ ৭৫) উপরে বর্ণিত দুই মাদরাসার শিক্ষকরা আল্লাহর দুই হাত দ্বারা কি উদ্দেশ্য, তা নিয়ে মতবিরোধ করেছেন। প্রথম মাদরাসার লোকেরা বলেনঃ আয়াতের প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করতে হবে এবং আল্লাহর ক্ষেত্রে যেরকম হাত প্রযোজ্য, আল্লাহর জন্য সেরকম হাতই সাব্যস্ত করতে হবে। আর দ্বিতীয় মাদরাসার ছাত্ররা বলে থাকে, হাতকে তার আসল অর্থে ব্যবহার করা যাবেনা। তাদের মতে আল্লাহর জন্য প্রকৃত হাত সাব্যস্ত করা হারাম। তাদের মতে হাতের উদ্দেশ্য হল কুদরাত (শক্তি) অথবা নেয়ামত।

সুতরাং উভয় মাযহাবের ভিতরে এতো পার্থক্য থাকা সত্বেও মাযহাব দু’টিকে একই কাতারে শামিল করা যায়না। উক্ত দু’মতের কোন একটিকে বলতে হবে যে, তারা আহলে সুন্নাত বা সুন্নাতে উপর প্রতিষ্ঠিত। অন্যটিকে তা বলা যাবেনা। এতদুভয়ের মধ্যে অবশ্যই ইনসাফের ভিত্তিতে সিদ্ধানে- পৌঁছতে হবে। অতএব, তাদের মতামতগুলোকে ন্যায়ের মানদন্ডে মেপে দেখা কর্তব্য। আর সে ন্যায়ের মানদন্ডটি হল আল্লাহর কিতাব, রাসূলের সুন্নাত এবং সাহাবী, তাবেঈ ও তাদের পূণ্যবান অনুসারী এবং মুসলমানদের ইমামগণের বক্তব্য। আতএব, উক্ত মানদন্ডের পরিমাপ অনুযায়ী এ কথা সুস্পষ্ট যে, আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে ইবনে তাইমিয়া এবং তাঁর ছাত্রদের মাযহাবটি হকের উপর প্রতিষ্ঠিত। তা আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাত এবং সালাফে সালেহীনদের মাযহাবের অনুরূপ। পক্ষান্তরে আশআরী সমপ্রদায়ের মাযহাব কুরআন্তসুন্নাহ এবং সালাফে সালেহীনদের মাযহাবের পরিপন্থী। তারা বলে থাকেন আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পন্ন আয়াতগুলোকে যদি এমন অর্থের মাধ্যমে তা’বীল (অপব্যাখ্যা) করা হয়, যাতে অন্য কোন দলীলের বিরোধীতা হবে না, তাহলে কোন অসুবিধা নেই।

আমরা তাদের উত্তরে বলব যে, কুরআনের কোন শব্দকে বিনা দলীলে প্রকাশ্য অর্থ থেকে সরিয়ে অন্য অর্থে ব্যবহার করাই কুরআন্তসুন্নাহর বিরোধীতা করার নামান্তর এবং আল্লাহ সম্পর্কে বিনা দলীলে কথা বলা ছাড়া অন্য কিছু নয়। আল্লাহর ব্যাপারে বিনা ইলমে কথা বলা হারাম। আল্লাহ তায়া,লা বলেনঃ
)قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّي الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ(
“আপনি বলে দিন, আমার পালনকর্তা কেবলমাত্র অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন্ত যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য এবং হারাম করেছেন গুনাহ, অন্যায়, অত্যাচার, আল্লাহর সাথে এমন বস্তকে অংশীদার করা, তিনি যার পক্ষে কোন দলীল-প্রমাণ অবতীর্ণ করেন নি এবং আল্লাহ সম্পর্কে এমন কথা বলাও হারাম, যে সম্পর্কে তোমাদের কোন জ্ঞান নেই”। (সূরা আরাফঃ ৩৩) আল্লাহ আরো বলেনঃ
)وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُوْلَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا(
যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই তার পিছনে পড়ো না। নিশ্চয় কান, চক্ষু ও অন্তর এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে। (সূরা বানী ইসরাঈলঃ ৩৬) যারা আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর অপব্যাখ্যা করে, তাদের কাছে শরীয়তের কোন জ্ঞান নেই। এমন কি তারা সুস্থ বিবেক সম্পন্নও নয়।

বলা হয় যে, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল (রঃ) নিম্ন লিখিত তিনটি স্থানে তা’বীল করেছেনঃ (১) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাদীছ “বনী আদমের অন্তর আল্লাহর দুই আঙ্গুলের মাঝখানে”, (২) হাজরে আসওয়াদ পৃথিবীতে আল্লাহর ডান হাত এবং (৩) আল্লাহর বাণী, ( وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ) তোমরা যেখানেই থাক না কেন, আল্লাহ তোমাদের সাথে আছেন। (সূরা হাদীদঃ ৪)

উত্তরে আমরা বলব যে, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল থেকে এধরণের কথা সহীহ সূত্রে প্রমাণিত নয়। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রঃ) বলেন, আবু হামেদ ইমাম গাজ্জালী আহমাদ বিন হাম্বালের নামে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি মাত্র তিনটি স্থানে তা’বীল করেছেন। স্থান তিনটি হল, “হাজরে আসওয়াদ পৃথিবীতে আল্লাহর ডান হাত”, “বনী আদমের অন্তর আল্লাহর দুই আঙ্গুলের মাঝখানে” এবং “আমি যেন ইয়ামানের দিক থেকে আল্লাহর নিঃশ্বাস পাচ্ছি”। এধরণের কথা সম্পূর্ণ বানোয়াট।

আর আল্লাহর বাণী, ( وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ) তোমরা যেখানেই থাক না কেন, আল্লাহ তোমাদের সাথে আছেন। (সূরা হাদীদঃ ৪) আহমাদ বিন হাম্বাল (রঃ) এই আয়াতটির তা’বীল করেন নি। বরং তিনি আয়াত থেকে সাব্যস্ত কতিপয় অত্যাবশ্যকীয় বিষয় বর্ণনা করেছেন। তিনি জা‏হ্‌মীয়া ফির্কার প্রতিবাদে আল্লাহর ইলমকে সাব্যস্ত করেছেন। জা‏হ্‌মীয়া ফির্কার লোকেরা বলে আল্লাহ যদি সর্বত্র থাকেন, তাহলে আল্লাহ স্বশরীরে থাকা আবশ্যক হয়। এই জন্যই তারা উক্ত আয়াতের উল্টা ব্যাখ্যা করেছেন। আমরা বলি যে, আল্লাহ সাথে আছেন এই কথার অর্থ হল জ্ঞানের মাধ্যমে সমস্ত মাখলুকাতকে বেষ্টন করে আছেন। এটা নয় যে, সৃষ্টিকুলের সাথে মিশে আছেন। সাথে থাকার অর্থ স্থানভেদে বিভিন্ন হয়ে থাকে। এই জন্যই বলা হয়ে থাকে, সে আমাকে দুধের সাথে পানি পান করিয়েছে, আমি জামাতের সাথেই নামায আদায় করেছি, তার স্ত্রী তার সাথে আছে।

উপরের উদাহরণ গুলোর প্রথম উদাহরণে দুধের সাথে পানির সংমিশ্রন বুঝায়। দ্বিতীয় উদাহরণে একে অপরের সাথে মিশে যাওয়া ব্যতীত একই স্থানে এক সাথে কাজ করা বুঝায় এবং তৃতীয় উদাহরণে সাথে থাকার অর্থ একই স্থানে বা একই কাজে থাকাকে আবশ্যক করে না। সুতরাং আল্লাহ বান্দার সাথে আছেন্ত একথার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ বান্দার সাথে মিশে আছেন অথবা একই স্থানে আছেন। এটা আল্লাহর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কারণ আল্লাহ রয়েছেন সমস্ত মাখলুকাতের উপরে। আল্লাহ আমাদের সাথে থাকার অর্থ এই যে, তিনি সাত আকাশের উপরে আরশে আযীমে থেকেও শক্তি, ক্ষমতা, জ্ঞান, রাজত্ব, শ্রবণ, দেখা এবং পরিচালনার মাধ্যমে সমস্ত সৃষ্টিজীবকে বেষ্টন করে আছেন। সুতরাং সাথে থাকাকে কোন ব্যাখ্যাকারী যদি জ্ঞানের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে, তাহলে আয়াতের দাবী থেকে বের হয়ে আসবে না এবং সে অপব্যাখ্যাকারীও হবে না। তবে যে ব্যক্তি সাথে থাকাকে একসাথে সর্বস্থানে, সবসময় বিরাজমান থাকা বুঝবে সে অপব্যাখ্যাকারী হিসাবে গণ্য হবে। 

সমস্ত বানী আদমের অন্তর আল্লাহর দুই আঙ্গুলের মাঝখানে, যেভাবে ইচ্ছা তিনি তা ঘুরান্ত হাদীছটি মুসলিম শরীফে রয়েছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের লোকেরা এই হাদীছের অপ ব্যাখ্যা করেন নি। তারা আল্লাহর শানে যে ধরণের আঙ্গুল প্রযোজ্য তা সাব্যস্ত করেন। এ কথার অর্থ এই নয় যে, আমাদের অন্তরগুলো আল্লাহর আঙ্গুলের সাথে লেগে আছে। মেঘমালা আকাশ এবং যমিনের মাঝখানে থাকে কিন্তু তা আকাশের সাথে মিশে থাকেনা, যমিনের সাথেও নয়। তাই বানী আদমের অন্তর আল্লাহর আঙ্গুলের সাথে মিশে থাকা জরুরী নয়।

হাজরে আসওয়াদ পৃথিবীতে আল্লাহর ডান হাত, যে তাতে স্পর্শ করল অথবা চুম্বন করল, সে যেন আল্লাহর হাতে স্পর্শ করল বা চুম্বন করল, এই হাদীছটি সম্পর্কে ইমাম ইবনে তাইমীয়া (রঃ) মাজমূ ইবনে কাসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেনঃ এ হাদীছটি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে প্রমাণিত নয়; বরং এ সম্পর্কে প্রসিদ্ধ কথা হল এটি ইবনে আব্বাসের নিজস্ব উক্তি। উপরোক্ত গ্রন্থে (৪৪/৩) সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, হাজরে আসওয়াদ আল্লাহর কোন গুণ নয় বা তাঁর ডান হাতও নয়। যেহেতু বলা হয়েছে “পৃথিবীতে তাঁর ডান হাত”  শুধু ডান হাত বলা হয়নি। সুতরাং পৃথিবীর সাতে সম্পৃক্ত করার কারনে তার অর্থ সাধারণ অর্থ থেকে আলাদা হবে। তাই হাজরে আসওয়াদকে আল্লাহর ডান হাত বলা যাবেনা। সুতরাং তাকে তা’বীল বা ব্যাখ্যা করার প্রশ্নই আসে না।

সহীহ আকীদাহ ও ইলম শিক্ষার মাদরাসাকে ইবনে তাইমিয়ার মাদরাসা হিসাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। কারণ তিনি নতুন কোন মাদরাসা তৈরী করেন নি। তিনি সালাফে সালেহীনের পথই অনুসরণ করেছেন।

যারা আল্লাহর গুণাবলী সম্বলিত আয়াতসমূকে ব্যাখ্যা করে, তাদের ব্যাপারে আমরা বলব যে, তাদের নিয়ত যদি ভাল হয় এবং দ্বীনের প্রতি আনুগত্যশীল বলে জানা যায়, তবে তাদের অপরাধ ক্ষমা করা হবে। কিন্তু তার কথা যে সালাফে সালেহীনের মাযহাব বিরোধী তাতে কোন সন্দেহ নেই। কেননা তাঁরা সর্বক্ষেত্রে আয়াতের প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করেছেন এবং তার উপর ঈমান এনেছেন। নিয়ত ভাল থাকা সত্বেও কোন মানুষ যদি ইজতেহাদ করতে গিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, তবে তাকে তিরস্কার করা যাবে না। বরং এতে সে ইজতিহাদের ছাওয়াব প্রাপ্ত হবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ
“বিচারক যদি ইজতিহাদ করে সঠিক ফায়সালা দেয়, তার জন্য দ্বিগুণ পুরস্কার রয়েছে, আর যদি ইজতিহাদ করে ফায়সালা দিতে গিয়ে ভুল করে, তাহলে তার জন্য একটি পুরস্কার রয়েছে।

কাজেই আকীদার ক্ষেত্রে ইজতিহাদ করে যারা ভুল করেছেন, তাদেরকে গোমরাহ বলা যাবে না। বিশেষ করে যখন জানা যাবে যে, তার নিয়ত ভাল ছিল, সে দ্বীনের প্রতি আনুগত্যশীল ছিল এবং সে সুন্নাহর অনুসরণকারী ছিল। অবশ্য তার মতামতকে গোমরাহী মতামত বলতে কোন অসুবিধা নেই।  

প্রশ্নঃ (৩০) আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদাহ কি? নাম ও গুণের মধ্যে পার্থক্য কি? আল্লাহর প্রতিটি নাম কি একটি করে গুণকে আবশ্যক করে? অনুরূপভাবে ছিফাতও কি নামকে আবশ্যক করে?
উত্তরঃ আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদাহ হল আল্লাহ তাআ’লা নিজের জন্য যে সমস্ত নাম ও গুণাবলী সাব্যস্ত করেছেন, কোন প্রকার পরিবর্তন, অস্বীকার, ধরণ বর্ণনা এবং উপমা পেশ করা ছাড়াই তার উপর বিশ্বাস করা। নাম ও গুণাবলীর মধ্যে পার্থক্য এই যে, নাম হল আল্লাহ নিজেকে যে নামে নামকরণ করেছেন, এবং গুণ হল আল্লাহ নিজেকে যে সমস্ত গুণাবলীতে ভূষিত করেছেন। সুতরাং উভয়ের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট।

আল্লাহর প্রতিটি নাম একটি করে গুণকে আবশ্যক করে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে,
)إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ(
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াময়”। এখানে (গাফুর) আল্লাহর একটি নাম। অর্থঃ ক্ষমাশীল। এই নামটির মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমা করা গুণ প্রমাণিত হয়। অনুরূপ ভাবে (রাহীম) নামটি রাহমত গুণটিকে আবশ্যক করে।

কিন্তু আল্লাহ তাআ’লা কুরআন মজীদে যেসমস্ত গুণাবলীর উল্লেখ করেছেন, তা থেকে নাম নির্বাচন করা আবশ্যক নয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, কথা বলা আল্লাহর একটি গুণ। এ থেকে মুতাকাল্লিম (বক্তা) নাম বের করা বৈধ নয়। সুতরাং নামের তুলনায় গুণ অধিক প্রশস্ত। কারণ প্রতিটি নামই একটি করে সিফাতকে সাব্যস্ত করে। কিন্তু প্রতিটি ছিফাতের ক্ষেত্রে এমনটি নয়।

প্রশ্নঃ (৩১) আল্লাহর নাম কি নির্দিষ্ট সংখ্যায় সীমিত?
উত্তরঃ আল্লাহর নামগুলো নির্দিষ্ট সংখ্যায় সীমিত নয়। সহীহ হাদীছে এর দলীল হল,
اللَّهُمَّ إِنِّي عَبْدُكَ وَابْنُ عَبْدِكَ وَابْنُ أَمَتِكَ نَاصِيَتِي بِيَدِكَ مَاضٍ فِيَّ حُكْمُكَ عَدْلٌ فِيَّ قَضَاؤُكَ أَسْأَلُكَ بِكُلِّ اسْمٍ هُوَ لَكَ سَمَّيْتَ بِهِ نَفْسَكَ أَوْ عَلَّمْتَهُ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ أَوْ أَنْزَلْتَهُ فِي كِتَابِكَ أَوِ اسْتَأْثَرْتَ بِهِ فِي عِلْمِ الْغَيْبِ عِنْدَكَ
হে আল্লাহ! আমি আপনার বান্দা এবং আপনার এক বান্দা ও বান্দীর সন্তান। আমার কপাল আপনার হাতে। আমার ব্যাপারে আপনার হুকুম বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। আপনার ফায়সালাই ন্যায় সম্মত। আপনার প্রতিটি নামের উসীলা দিয়ে আপনার কাছে দু’আ করছি। যে নামের মাধ্যমে আপনি নিজের নাম কারণ করেছেন বা আপনার কোন সৃষ্টিকে (বান্দাকে) শিক্ষা দিয়েছেন অথবা আপনার কিতাবে অবতীর্ণ করেছেন অথবা যে নামগুলোকে আপনি নিজের জ্ঞান ভান্ডারে সংরক্ষিত করে রেখেছেন।

   আর এ কথা শতসিদ্ধ যে, আল্লাহর জ্ঞান ভান্ডারে যে সমস্ত নাম সংরক্ষিত রেখেছেন, তা একমাত্র আল্লহ ছাড়া কেউ জানে না। আর যা অজ্ঞাত তা সীমিত হতে পারে না।
إِنَّ لِلَّهِ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ اسْمًا مِائَةً إِلَّا وَاحِدًا مَنْ أَحْصَاهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ
“আল্লাহর এমন নিরানব্বইটি নাম রয়েছে যে ব্যক্তি এগুলো মুখস্ত করবে, সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে।” হাদীছে এটা বুঝা যাচ্ছেনা যে, আল্লাহর নাম মাত্র নিরানব্বইটি। বরং হাদীছের অর্থ এই যে, আল্লাহর নাম সমূহের মধ্যে এমন নিরানব্বইটি নাম রয়েছে, যা মুখস্ত করলে জান্নাতে যাওয়া যাবে। এতে বুঝা যায় যে, এই নিরানব্বইটি ব্যতীত আল্লাহর আরো নাম রয়েছে। এখানে (من أحصاها) বাক্যটি পূর্বের বাক্যের পরিপূরক। নতুন বাক্য নয়। যেমন আরবরা বলে থাকে আমার এমন একশটি ঘোড়া রয়েছে, যা আমি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য প্রস্তত করে রেখেছি। বাক্যটির অর্থ এই নয় যে, তার কাছে ঘোড়ার সংখ্যা মাত্র একশটি। বরং তার কাছে এমন একশটি ঘোড়া আছে, যা আল্লাহর রাস্তায় জেহাদের জন্য প্রস্তত রয়েছে। অন্য কাজের জন্য আরো ঘোড়া থাকতে পারে।

   শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এই মর্মে হাদীছ বিশারদগণের ঐক্যমত বর্ণনা করেছেন যে, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে আল্লাহর নামসমূহের নির্দিষ্ট সংখ্যার বর্ণনা সহীহ সূত্রে সাব্যস্ত হয়নি। তিনি সত্যই বলেছেন। এর প্রমাণ উলামাদের এতে বিরাট ধরণের এখতেলাফ বিদ্যমান রয়েছে। কারণ যারা তিরমিযীতে ৯৯টি নাম সম্বলিত হাদীছটিকে সহীহ বলার চেষ্টা করেছেন, তারা বলেন, এ বিষয়টি অত্যন্ত বিরাট। কারণ তা জান্নাতে পৌঁছিয়ে দিবে বলা হয়েছে। সাহাবীগণ এ বিষয়টি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে নির্ধারণ করতে বলবেন না- এটা হতে পারে না। সুতরাং বুঝা গেল যে, আল্লাহর নিরানব্বইটি নাম নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকেই নির্ধারিত।

   এর উত্তরে বলা যেতে পারে যে, এটি আবশ্যক নয়। কারণ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে যদি নির্ধারিত হত, তাহলে পরিস্কারভাবে নামগুলো জানা থাকত এবং বুখারী-মুসলিম এবং অন্যান্য হাদীছের কিতাবে উল্লেখ থাকত। কারণ এটি এমন বিষয়, যা বর্ণনা এবং হেফাজত করার প্রয়োজন। সুতরাং কিভাবে তা সহীহ সূত্রে বর্ণিত না হয়ে দূর্বল এবং পরস্পর বিরোধী সূত্রে বর্ণিত হতে পারে? নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নামগুলো বিশেষ এক উদ্দেশ্যে বর্ণনা করেন নি। তাহলো মানুষ যেন আল্লাহর কিতাব এবং রাসূলের সুন্নাত হতে খোঁজে বের করে। এতে করেই সৎকাজের প্রতি কে প্রকৃত আগ্রহী এবং কে আগ্রহী নয়, তা প্রকাশিত হয়ে যাবে।

   আল্লাহর নামগুলো শুধু কাগজে লিখে মুখস্ত করা উদ্দেশ্য নয়। বরং উদ্দেশ্য হলঃ

১)      ভালভাবে নামগুলো মুখস্ত করা।
২)      নামগুলোর অর্থ অনুধাবন করা।
৩)      নামগুলোর দাবী অনুযায়ী আল্লাহর এবাদত করা। আর তা দু’ভাবে হতে পারেঃ

(ক) আল্লাহর নাম সমূহের উসীলা দিয়ে তাঁর নিকট দু’আ করা। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا(
“আল্লাহর অনেক সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে, সেই নামগুলোর উসীলায় তাঁর কাছে দু’আ কর।” (সূরা আরাফঃ ১৮০) আপনি যা কামনা করেন তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ একটি নাম নির্বাচন করে সেই নামটি উল্লেখ করে দু’আ করবেন। যেমন ক্ষমা চাওয়ার সময় আপনি বলবেনঃ
يا غفور اغفر لى                                                                      
ইয়া গাফুর! ইগফিরলী। অর্থঃ হে ক্ষমাশীল! আমাকে ক্ষমা করুন। ক্ষমা চাওয়ার সময় এটা বলা কখনই উপযোগী নয় যে,
يا شديد العقاب اغفرلى
হে কঠোর শাস্তি দাতা! আমাকে ক্ষমা করুন। এটা এক ধরণের ঠাট্টা করার শামিল। বরং বলতে হবে, হে কঠোর শাস্তি দাতা! আমাকে আপনার শাস্তি হতে রেহাই দিন।

২) আপনার এবাদতের মধ্যে এমন কিছু থাকা চাই, যা আল্লাহর নামগুলোর দাবীকে আবশ্যক করে। রাহীম নামের দাবী হল রহমত করা। সুতরাং আপনি এমন আমল করবেন, যা আল্লাহর রহমত নাযিল হওয়ার কারণ হয়। এটাই আল্লাহর নাম সমূহ মুখস্ত করার অর্থ। আল্লাহর নামসমূহের দাবীকে আবশ্যক করার মত আমলই জান্নাতে প্রবেশের মূল্য হতে পারে।

প্রশ্নঃ (৩২) আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে উপরে আছেন, সে ব্যাপারে সালাফদের মাযহাব কি? যে ব্যক্তি বলে যে, আল্লাহ ছয়টি দিক থেকে মুক্ত এবং যে ব্যক্তি বলে যে, তিনি প্রত্যেক মুমিনের অন্তরে আছেন, তার হুকুম কি?
উত্তরঃ সালফদের মাযহাব এই যে, আল্লাহ স্বীয় সত্বায় মাখলুকাতের উপরে আছেন। আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
)فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا(
“তোমরা যদি কোন বিষয়ে মতবিরোধ করে থাক, তাহলে বিতর্কিত বিষয়টি আল্লাহ এবং রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি এবং পরকালের প্রতি ঈমান এনে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম।” (সূরা নিসাঃ ৫৯) আল্লাহ বলেনঃ
)وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِنْ شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ(
“তোমরা যে বিষয়ে মতবিরোধ কর, তার ফায়সালা আল্লাহর নিকটে।” (সূরা শুরাঃ ১০) আল্লাহ আরো বলেনঃ
)إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُوْلَئِكَ هُمْ الْمُفْلِحُونَ وَمَنْ يُطِعْ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّهَ وَيَتَّقِيهِ فَأُوْلَئِكَ هُمْ الْفَائِزُونَ(
“মুমিনদের বক্তব্য কেবল এ কথাই যখন তাদের মধ্যে ফায়সালা করার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে তাদেরকে আহবান করা হয়, তখন তারা বলেঃ আমরা শুনলাম ও আদেশ মান্য করলাম। মূলতঃ তারাই সফলকাম। এবং যারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর শাস্তি থেকে বেঁচে থাকে, তারাই কৃতকার্য।” (সূরা নূরঃ ৫১-৫২) আল্লাহ আরো বলেন,
)وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمْ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا(
“আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল কোন কাজের আদেশ করলে কোন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করার অধিকার নেই। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের বিরোধীতা করবে, সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে পতিত হবে।” (সূরা আহযাবঃ ৩৬) আল্লাহ তাআ’লা আরো বলেন,
)فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا(
“অতএব তোমার পালকর্তার কসম, তারা ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে আপনাকে ন্যায়বিচারক বলে মেনে নেয়। অতঃপর আপনার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা বোধ না করে এবং তা সন্তুষ্ট চিত্তে কবূল করে নেবে।” (সূরা নিসাঃ ৬৫) সুতরাং জানা গেল যে, মতভেদের সময় ঈমানদারের পথ হল আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহর দিকে ফেরত যাওয়া এবং তাদের কথা শ্রবণ করা ও আনুগত্য করা। সাথে সাথে আল্লাহ এবং রাসূলের কথার বাইরে অন্য কারও কথা গ্রহণ করার ব্যাপারে নিজের কাছে কোনরূপ স্বাধীনতা না রাখা। এ ছাড়া কেউ ঈমানদার হতে পারবে না। পরিপূর্ণরূপে নিজেকে কুরআন ও সুন্নাহর কাছে সোপর্দ করতে হবে এবং অন্তর থেকে সংকীর্ণতা অবশ্যই দূর হতে হবে। এর বিপরীত করলে আল্লাহর আযাবের সম্মুখীন হতে হবে। আল্লাহ বলেন,
)وَمَنْ يُشَاقِقْ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا(
“হেদায়েতের পথ সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে কেউ রাসূলের বিরোধীতা করবে এবং ঈমানদারদের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলবে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা কতই না নিকৃষ্ট গন্তব্যস্থান।” (সূরা নিসাঃ ১১৫)

   আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় সত্বায় মাখলুকের উপরে থাকার মাসআলাটি আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহর দিকে ফেরানোর পর তা নিয়ে গবেষণাকারী অবশ্যই জানতে পারবে যে, আল্লাহ তাআ’লা স্বসত্বায় সমস্ত মাখলুকাতের উপরে আছেন। বিভিন্ন বাক্যের মাধ্যমে কুরআন ও সুন্নায় এই বিষয়টি অতি সুন্দর ও সুস্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে।

১) সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ আকাশের উপরে আছেন। আল্লাহ বলেন,
)أَمْ أَمِنتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِيرِ(
“তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছ যে, যিনি আকাশে আছেন তিনি তোমাদের উপর প্রস্তর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন না, অতঃপর তোমরা জানতে পারবে কেমন ছিল আমার সতর্কবাণী।” (সূরা মুলকঃ ১৭)

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রোগীকে ঝাড়-ফুঁক করার হাদীছে বলেনঃ
رَبُّنَا اللَّهُ الَّذِي فِي السَّمَاءِ
“আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। যিনি আকাশে আছেন।” তিনি আরো বলেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا مِنْ رَجُلٍ يَدْعُو امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهَا فَتَأْبَى عَلَيْهِ إِلَّا كَانَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ سَاخِطًا عَلَيْهَا حَتَّى يَرْضَى عَنْهَا
“ঐ সত্বার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, কোন পুরুষ তার স্ত্রীকে বিছানায় আসার জন্য ডাক দিলে স্ত্রী যদি বিছানায় যেতে অস্বীকার করে তাহলে যিনি আকাশে আছেন, স্বামী সন্তুষ্ট হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি অসন্তুষ্ট থাকেন।”

২) আল্লাহ উপরে আছেন, এ কথা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেনঃ
)وَهُوَ الْقَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ(
“তিনিই মহা প্রতাপশালী স্বীয় বান্দাদের উপরে আছেন।” (সূরা আনআ’মঃ ১৮) আল্লাহ আরো বলেনঃ
)يَخَافُونَ رَبَّهُمْ مِنْ فَوْقِهِمْ(
“তারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে চলে। যিনি তাদের উপরে আছেন।” (সূরা নাহলঃ ৫০) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বাণী,
لَمَّا قَضَى اللَّهُ الْخَلْقَ كَتَبَ فِي كِتَابِهِ فَهُوَ عِنْدَهُ فَوْقَ الْعَرْشِ إِنَّ رَحْمَتِي غَلَبَتْ غَضَبِي
“আল্লাহ তাআ’লা যখন সৃষ্টি সমাপ্ত করলেন, তখন তিনি একটি কিতাবে লিখে রাখলেন, নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার ক্রোধের উপর জয়লাভ করেছে। কিতাবটি তাঁর নিকটে আরশের উপরে রয়েছে।”

৩) আল্লাহর দিকে বিভিন্ন বিষয় উঠা এবং তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন জিনিষ অবতীর্ণ হওয়ার কথা উল্লেখিত হয়েছে। উপরের দিকে উঠা সব সময় নীচের দিক থেকেই হয়ে থাকে। এমনিভাবে অবতরণ করা সাধারণত উপরের দিক থেকে নীচের দিকেই হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ(
“তাঁরই দিকে পবিত্র বাক্যসমূহ উঠে থাকে এবং সৎ আমল তাকে উপরের দিকে তুলে নেয়।” (সূরা ফাতিরঃ ১০) আল্লাহ বলেনঃ
)تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ(
“ফেরেশতাগণ এবং রূহ আল্লাহ তাআ’লার দিকে উর্ধ্বগামী হয়।” (সূরা মা’আরিজঃ ৪) আল্লাহ বলেনঃ
)يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مِنْ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ ثُمَّ يَعْرُجُ إِلَيْهِ(
“তিনি আকাশে থেকেই জমিনে সকল কর্ম পরিচালনা করেন।” (সূরা সেজদাঃ ৫) আল্লাহর বাণী,
)لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ تَنزِيلٌ مِنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ(
“এতে মিথ্যার প্রভাব নেই, সামনের দিক থেকেও নেই এবং পেছন দিক থেকেও নেই। এটা প্রজ্ঞাময় প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।” (সূরা ফুচ্ছিলাতঃ ৪২) আল্লাহ বলেনঃ
)وَإِنْ أَحَدٌ مِنْ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ(
“আর মুশরেকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় চায়, তবে তাকে আশ্রয় দেবে যাতে সে যাতে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়।” (সূরা তাওবাঃ ৬) কুরআন) যেহেতু আল্লাহর কালাম এবং তা আল্লাহর পক্ষ হতে অবতীর্ণ হয়েছে তাই এর দ্বারা আমরা জানতে পারলাম যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বীয় সত্বায় উপরে রয়েছেন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ
يَتَنَزَّلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الْآخِرُ يَقُولُ مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ
“আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তাআ’লা প্রতিদিন রাত্রের একতৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকতে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলতে থাকেন কে আছে আমার কাছে দু’আ করবে? আমি তার দু’আ কবূল করব। কে আছে আমার কাছে চাইবে? আমি তাকে প্রদান করবো। কে আছে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে? আমি তাকে ক্ষমা করার জন্য প্রস্তত আছি।” বারা বিন আযিব (রাঃ) এর হাদীছে আছে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বিছানায় শয়নকালে পাঠ করার দু’আ শিক্ষা দিয়েছেন। সেই দু’আর মধ্যে এটাও আছে,
آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ وَبِنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ فَإِنْ مُتَّ مُتَّ عَلَى الْفِطْرَةِ
“আমি আপনার অবতারিত কিতাবের প্রতি ঈমান আনয়ন করেছি। এবং আপনার প্রেরিত নবীর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি। এই দু’আ পাঠ করার পর যদি তুমি মৃত্যু বরণ কর, তাহলে তুমি ফিতরাতের (ইসলামের) উপর মৃত্যু বরণ করবে।”

৪) আল্লাহ তাআ’লা উপরে হওয়ার গুণে নিজেকে গুণাম্বিত করা। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)سَبِّحْ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى(
“আপনি আপনার সর্বোচ্চ ও সর্বমহান পালনকর্তার নামের পবিত্রতা বর্ণনা করুন।” (সূরা আল-আলাঃ ১) আল্লাহ বলেনঃ
)وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ(
“সেগুলোকে (ভূমন্ডল ও নভমন্ডলকে) সংরক্ষণ করা তাঁকে পরিশ্রান্ত করেনা। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।” (সূরা বাকারাঃ ২৫৫) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বাণী,
سبحان ربي الأعلى                                                                    
“আমি পবিত্রতা বর্ণনা করছি আমার সুমহান প্রভুর।”

৪) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরাফার মাঠে ভাষণ দেয়ার সময় আল্লাহকে স্বাক্ষী রেখে আকাশের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি উপস্থিত সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বলেছেন, ((ألا هل بلغت؟ আমি কি তোমাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছিয়ে দিয়েছি? উপস্থিত জনতা এক বাক্যে স্বীকার করল, হ্যাঁ আপনি আপনার দায়িত্ব যথাযথভাবে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, (أللهم اشهد) হে আল্লাহ! আপনি স্বাক্ষী থাকুন। এ কথা বলতে বলতে তিনি উপরের দিকে আঙ্গুল উঠিয়ে ইশারা করতে লাগলেন এবং মানুষের দিকে তা নামাতে লাগলেন। এ হাদীছটি মুসলিম শরীফে যাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীছটিতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ আকাশে। তা নাহলে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপরের দিকে হাত উঠিয়ে ইশারা করা অনর্থক বলে সাব্যস্ত হবে।

৬) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জনৈক দাসীকে প্রশ্ন করেছেন, আল্লাহ কোথায়? দাসী বলল, আকাশে। এ কথা শুনে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
أَعْتِقْهَا فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ
“তাকে মুক্ত করে দাও। কেননা সে ঈমানদার।” হাদীছটি মুসলিম শরীফে বর্ণিত মুআবীয়া বিন হাকাম আস্‌ সুলামী (রাঃ) এর দীর্ঘ হাদীছের অংশ বিশেষ। এটি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বীয় সত্বায় উপরে হওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট দলীল। কেননা (أين) শব্দটি দিয়ে কোন বস্তর অবস্থান সম্পর্কেই জিজ্ঞাসা করা হয়ে থাকে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মহিলাটিকে আল্লাহ কোথায়- এ কথা জিজ্ঞাসা করলেন, তখন মহিলাটি বললঃ তিনি আকাশে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার এ কথাকে মেনে নিলেন এবং বললেনঃ এটাই ঈমানের পরিচয়। তাকে মুক্ত করে দাও। কারণ সে ঈমানদার। সুতরাং যতক্ষণ কোন মানুষ আল্লাহ উপরে হওয়ার বিশ্বাস না করবে এবং এ কথার ঘোষণা না দিবে ততক্ষণ সে ঈমানদার হতে পারবে না।

   আল্লাহ তাআ’লা স্বীয় সত্বায় মাখলুকের উপরে হওয়ার ব্যাপারে কুরআন এবং সুন্নাহ থেকে উপরোক্ত দলীলগুলো উল্লেখ করা হল। এ ব্যাপারে আরো দলীল রয়েছে। যা এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। এ সমস্ত দলীলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে সালাফে সালেহীন এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, আল্লাহ স্বীয় সত্বায় মাখলুকের উপরে রয়েছেন। এমনিভাবে তারা আল্লাহর গুণাবলী সুউচ্চ হওয়ার উপরও একমত হয়েছেন।
)وَلَهُ الْمَثَلُ الْأَعْلَى فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ(
“আকাশ ও জমিনে সর্বোচ্চ মর্যদা তাঁরই এবং তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা রুমঃ ২৭)
)وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا(
“আল্লাহর রয়েছে উত্তম নামসমূহ। কাজেই সেই নামসমূহ ধরেই (অসীলায়) তাঁকে ডাক।” (সূরা আ’রাফঃ ১৮০)
)فَلَا تَضْرِبُوا لِلَّهِ الْأَمْثَالَ إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ(
“তোমরা আল্লাহর জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অবগত আছেন আর তোমরা অবগত নও।” (সূরা নাহলঃ ৭৪)
)فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَندَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ(
“তোমরা জেনে বুঝে আল্লাহর জন্য অংশীদার সাব্যস্ত করোনা।” (সূরা বাকারাঃ ২২) এমনিভাবে আরো অনেক আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর সত্বা, গুণাগুণ এবং কর্মসমূহ পরিপূর্ণ এবং সর্বোচ্চ হওয়ার কথা প্রমাণিত হয়।

   অনুরূপভাবে কুরআন, সুন্নাহ এবং পূর্ববর্তী সালাফে সালেহীনের সর্ব সম্মত ঐকমত্য, সুস্থ বিবেক এবং ফিতরাতও আল্লাহ উপরে হওয়ার কথা স্বীকার করে নেয়।

    বিবেক এ কথা স্বীকার করে নেয় যে, উচ্চে হওয়া একটি পরিপূর্ণ ও উত্তম গুণ। অপর পক্ষে উপরে হওয়ার বিপরীতে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ গুণ। আল্লাহর জন্য সকল পরিপূর্ণ বৈশিষ্ট সাব্যস্ত। তাই আল্লাহর জন্য সুউচ্চে হওয়া বিবেক সম্মত। তাই উপরে হওয়াতে ত্রুটিপূর্ণ কোন গুণ সাব্যস্ত হওয়ার সুযোগ নেই। আমরা বলব যে, উপরে হওয়া সৃষ্টিজীব দ্বারা বেষ্টিত হওয়াকে আবশ্যক করে না। আর যে ব্যক্তি এরূপ ধারণা করবে, সে নিছক ধারণা করল এবং বিবেকভ্রষ্ট হিসাবে পরিগণিত হল।

   মানুষের স্বভাব জাত ধর্মের মাধ্যমে আল্লাহ মাখলুকের উপরে প্রমাণিত হয়। মানুষ যখন আল্লাহর কাছে দু’আ করে, তখন অন্তরকে আকাশের দিকে ধাবিত করে। এই জন্যই মানুষ যখন আল্লাহর কাছে দু’আ করে তখন ফিতরাতের দাবী অনুযায়ী আকাশের দিকে হাত উত্তোলন করে। একদা হামদানী নামক জনৈক ব্যক্তি ইমাম আবুল মা‘আলী আল-জুওয়াইনীকে বলল, আপনি তো আল্লাহ উপরে হওয়াকে অস্বীকার করেন। আপনি আমাকে বলুন, আল্লাহ যদি উপরে না থাকেন, তা হলে আল্লাহ ভক্ত কোন মানুষ যখনই আল্লাহর কাছে দু’আ করে, তখন তার অন্তরকে উপরের দিকে ফেরানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে কেন? এ কথা শুনে জুওয়াইনী মাথায় হাত মারতে মারতে বলতে থাকল হামদানী আমাকে দিশেহারা করে দিয়েছে! আমাকে হামদানী দিশেহারা করে দিয়েছে!

     ঘটনাটি এভাবেই বর্ণিত হয়েছে। ঘটনার সূত্র সঠিক হোক কিংবা ভুল হোক, তাতে কিছু আসে যায়না। প্রতিটি ব্যক্তির অনুভূতিও হামদানীর মতই। দু’আ করার সময় সবাই উপরের দিকে অন্তর ও হাত উঠানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে থাকে। এ কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।

     সহীহ মুসলিম শরীফে আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, অতঃপর রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যে দীর্ঘ সফর করে এলোমেলো কেশ ও ধুলামলিন পোষাক নিয়ে অন্তত্য ব্যকুলভাবে আকাশের দিকে দু’হাত তুলে ডাকতে থাকে হে আমার প্রতিপালক! হে রব!! অথচ সে ব্যক্তির পানাহার সামগ্রী হারাম উপার্জনের, পোষাক পরিচ্ছদ হারাম পয়সায় সংগৃহীত, এমতাবস্থায় কি করে তার দু’আ কবূল হতে পারে ? এমনিভাবে নামাযে বান্দা তার অন্তরকে আকাশের দিকে ফেরায়। বিশেষ করে সে যখন সেজদায় যায় তখন বলে, سبحان ربي الأعلى অর্থঃ আমি পবিত্রতা বর্ণনা করছি আমার সুউচ্চ প্রভুর। যেহেতু সে জানে যে তার মা’বূদ আকাশে তাই সে এভাবে বলে থাকে।

   যারা আল্লাহ আরশের উপরে হওয়াকে অস্বীকার করে তারা বলে থাকে, আল্লাহ তাআ’লা ছয়টি দিক থেকে মুক্ত অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা কোন নির্দিষ্ট দিকে অবস্থান করেন না; বরং তিনি সর্বদিকে সর্বত্র সদা বিরাজিত। আমরা বলব এ কথাটি একটি বাতিল কথা। কেননা এটা এমন কথা যা আল্লাহ নিজের জন্য সাব্যস্তকৃত বিষয়কে অস্বীকার করার নামান্তর। আর সৃষ্টিকুলের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর জন্য যে সমস্ত গুণাবলী সাব্যস্ত করেছেন, তাও বাতিল করার আহবান জানায়। তা এই যে, মহান আল্লাহ তাআ’লা উপরের দিকে রয়েছেন। আল্লাহ উপরে আছেন এ কথা অস্বীকার করা হলে আল্লাহকে অসি-ত্বহীন বস্তর সাথে তুলনা করা হয়ে যায়। কেননা দিক হল ছয়টি। উপর, নীচ, ডান, বাম, পশ্চাৎ এবং সম্মুখ। অসি-ত্ব সম্পন্ন যে কোন বস্তকে এই ছয়টি জিনিষের সাথে সম্পর্কিত রাখতে হবে। এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে বিবেক সম্মত ও গ্রহণযোগ্য। আল্লাহ তাআ’লার ক্ষেত্রে যদি ছয়টি দিককে সমানভাবে অস্বীকার করা হয়, তা হলে আল্লাহ নাই এ কথাই আবশ্যক হয়ে যায়। (নাউযুবিল্লাহ) কোন মানুষের সুস্থ মস্তিষ্ক এই ছয়টি দিকের বাইরে কোন জিনিষের অসি-ত্বকে সম্ভব মনে করতে পারে কি? কেননা বাস্তবে আমরা এ ধরণের কোন জিনিষের অসি-ত্ব খোঁজে পাইনি। আমরা দেখতে পাই যে, প্রতিটি মু’মিন ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ উপরে। আল্লাহর কিতাব, রাসূলের সুন্নাত, সালাফে সালেহীনের ইজমা, সুস্থ বিবেক এবং ফিতরাতও তা সমর্থন করে। যেমন আমরা ইতোপূর্বে বর্ণনা করেছি। আমরা এও বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তাআ’লা সকল বস্তকে বেষ্টন করে আছেন, কিন্তু আল্লাহকে কোন বস্তই পরিবেষ্টন করতে পারে না। কোন মু’মিনের জন্যই এটা বৈধ নয় যে, সে মানুষের কথাকে গ্রহণ করতে গিয়ে কুরআন্তসুন্নাহকে প্রত্যাখ্যান করবে। সে মানুষটি যত বড়ই হোক না কেন। আমরা ইতি পূর্বে দলীলগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি।

    যারা বলে আল্লাহ মু’মিন ব্যক্তির অন্তরে আছেন, তাদের কথার পক্ষে আমাদের জানামতে কুরআন, সুন্নাহ কিংবা সালাফে সালেহীনের কোন উক্তি পাওয়া যায় না। কথাটির অর্থ যদি এই হয় যে, আল্লাহ বান্দার অন্তরে অবতীর্ণ হয়ে আছেন, তাহলে কথাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোওয়াট । আল্লাহ তাআ’লা এ থেকে অনেক পবিত্র। বড় আশ্চর্যের কথা এই যে, কিভাবে একজন মানুষ কুরআন্তসুন্নাহর ভাষ্য মতে আল্লাহ তাআ’লা আকাশে হওয়াকে প্রত্যাখ্যান করে এবং আল্লাহ তাআ’লা মু’মিনের অন্তরে থাকেন একথা মেনে নিতে পারে?! অথচ এর পক্ষে কুরআন্তসুন্নাহর একটি দলীলও মিলে না।

   আল্লাহ মু’মিন বান্দার অন্তরে আছেন্ত এ কথার অর্থ যদি এই হয় যে, মু’মিন ব্যক্তি সদা-সর্বদা অন্তরে আল্লাহকে স্মরণ করে, তাহলে এ কথা সত্য। তবে বাক্যটি পরিবর্তন করা দরকার, যাতে বাতিল অর্থের সম্ভাবনা দূর হয়ে যায়। এভাবে বলা উচিৎ যে, মু’মিন বান্দার অন্তরে সবসময় আল্লাহর যিক্‌র বিদ্যমান রয়েছে। তবে যারা এ কথা বলে তাদের কথা থেকে পরিস্কার বুঝা যায় যে, তাদের উদ্দেশ্য হল আল্লাহ আকাশে আছেন একথাকে অস্বীকার করা এবং মু’মিনের অন্তরে আল্লাহর অবস্থানকে সাব্যস্ত করা। অথচ এটা বাতিল।

    সুতরাং আল্লাহর কিতাব, রাসূলের সুন্নাত এবং সালাফে সালেহীনের ইজমা বাদ দিয়ে এমন বাক্য ব্যবহার থেকে সাবধান থাকা উচিৎ, যা সত্য-মিথ্যা উভয়েরই সম্ভাবনা রাখে। মুমিনদের উচিৎ প্রথম যুগের আনসার-মুহাজির সাহাবীদের পথ অনুসরণ করা। তবেই তারা আল্লাহর সন'ষ্টি অর্জনে সক্ষম হবেন। আল্লাহ বলেন,
)وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنْ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ(
“আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনসারদের মাঝে অগ্রগামী এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তাদের জন্য প্রস্তত রেখেছেন এমন জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত রয়েছে। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এটাই হল মহান সফলতা।” (সূরা তাওবাঃ ১০০)

    আল্লাহ আমাদেরকে এবং আপনাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাঁর রহমত দান করুন। তিনিই মহান দাতা।

আল্লাহ তাআ’লা সুউচ্চ আরশের উপরে আছেন

প্রশ্নঃ (৩৩) আল্লাহ তাআ’লার শানে যেভাবে প্রযোজ্য, তিনি সেভাবেই আরশের উপরে আছেন এটাই কি সালাফে সালেহীনের ব্যাখ্যা?
উত্তরঃ আল্লাহর ক্ষমতা ও মর্যাদা অনুযায়ী যেভাবে আরশের উপরে সমুন্নত হওয়া শোভা পায়, তিনি সেভাবেই আরশের উপর প্রতিষ্ঠিত।

মুফাস্‌সিরগণের ইমাম আল্লামা ইবনে জারীর বলেন, ইসতিওয়া অর্থ হল সমুন্নত হওয়া, উপরে হওয়া। আল্লাহর বাণী,
)الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى(
এর অর্থ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন যে, “আল্লাহ আরশের উপরে সমুন্নত।” এই অর্থ ব্যতীত সালাফে সালেহীন হতে অন্য কোন অর্থ বর্ণিত হয়নি। তদুপরি ইসতিওয়া শব্দটি ভাষাগত দিক থেকে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার হয়ে থাকে।

১) অন্য কোন শব্দের সাথে যুক্ত না হয়ে এককভাবে ব্যবহার হলে অর্থ হবে, পরিপূর্ণ হওয়া। আল্লাহ বলেনঃ
)وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَاسْتَوَى(
“যখন তিনি প্রাপ্ত বয়স্ক হলেন এবং পরিপূর্ণতায় পৌঁছলেন।” (সূরা ক্বাছাছঃ ১৪)

২) ইসতিওয়া শব্দটি আরবী অক্ষর (واو) এর সাথে মিলিত হয়ে ব্যবহার হলে অর্থ হবে সমান সমান হওয়া, একটি জিনিষ অন্যটির বরাবর হওয়া। যেমন বলা হয় (استوى الماء والعتبة) পানি কাষ্ঠের সমান হয়ে গেছে।

৩) আরবী অব্যয় (إلى) এর সাথে মিলিত হয়ে আসলে অর্থ হবে, ইচ্ছা করা, মনোনিবেশ করা। যেমন আল্লাহ বলেনঃ
)ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ(
“অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করলেন।” (সূরা বাকারাঃ ২৯)

৪) আরবী অব্যয় (على) এর সাথে মিলিত হয়ে আসলে অর্থ হবে, সমুন্নত হওয়া, উপরে হওয়া। যেমন আল্লাহ বলেন,
)الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى(
“আল্লাহ আরশের উপরে সমুন্নত।”

আবার কোন কোন সালাফ বলেন ইসতিওয়া শব্দটি إلى এবং على এর মধ্যে থেকে যে কোন একটির সাথেই মিলিত হয়ে আসুক না কেন, অর্থের দিক থেকে কোন পার্থক্য নেই। একটি অন্যটির অর্থে ব্যবহার হয়। তাই উভয় ক্ষেত্রে অর্থ হবে আল্লাহ আরশের উপর সমুন্নত।

প্রশ্নঃ (৩৪) সম্মানিত শায়খ! আল্লাহ আপনাকে হেফাযত করুন! আপনি বলেছেন, আরশের উপরে আল্লাহর সমুন্নত হওয়া বিশেষ এক ধরণের সমুন্নত হওয়া, যা কেবলমাত্র আল্লাহর বড়ত্ব ও মর্যাদার শানে প্রযোজ্য। আমরা কথাটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানতে চাই।
উত্তরঃ আমরা বলি যে, আরশের উপরে আল্লাহর সমুন্নত হওয়া একটি বিশেষ ধরণের সমুন্নত হওয়া। যা আল্লাহর বড়ত্ব ও সম্মানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আল্লাহ সমস্ত মাখলুকের উপরে হওয়ার সাথে আরশের উপরে সমুন্নত হওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। এই জন্যই এ রকম বলা ঠিক হবে না যে, আল্লাহ মাখলুকাতের উপর সমুন্নত হলেন অথবা আকাশের উপরে কিংবা জমিনের উপরে। অথচ তিনি সকল বস্তর উপরে। অন্যান্য মাখলুকাতের ক্ষেত্রে আমরা বলি আল্লাহ তাআ’লা আকাশ-জমিনসহ সকল মাখলুকের উপরে আছেন। আর আরশের ক্ষেত্রে বলব যে, আল্লাহ আরশের উপরে সমুন্নত (مستوي)। সুতরাং ইসতিওয়া (সমুন্নত হওয়া) গুণটি সাধারণভাবে উপরে হওয়া থেকে ভিন্ন প্রকৃতির। এই জন্যই আরশের উপরে আল্লাহর সমুন্নত হওয়া গুণটি আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সমপৃক্ত এবং তা আল্লাহর কর্মগত গুণাবলীর অন্তর্ভুক্ত। আর মাখলুকের উপরে হওয়া আল্লাহর সত্বার সাথে সম্পর্কিত গুণ, যা আল্লাহর সত্বা হতে কখনো বিচ্ছিন্ন হওয়ার নয়। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া দুনিয়ার আকাশে আল্লাহর অবতরণ সংক্রান্ত হাদীছে এরূপ ব্যাখ্যাই প্রদান করেছেন।

   যদি বলা হয় আল্লাহ ছয়দিনে আকাশ-জমিন সৃষ্টি করার পর আরশের উপরে সমুন্নত হয়েছেন। তার পূর্বে তিনি আরশের উপরে ছিলেন না। ইসতিওয়া অর্থ বিশেষ এক ধরণের উপরে হওয়া। তাই কোন বস্ত অন্য বস্তর উপরে সমুন্নত হওয়ার অর্থ বস্তটি তার উপরে আছে। কিন্তু উপরে থাকলেই সমুন্নত হওয়া জরুরী নয়। এই জন্যই প্রতিটি উপরের বস্তকে সমুন্নত বলা যায়না। তার বিপরীতে প্রতিটি সমুন্নত বস্তই অপর বস্তর উপরে বিরাজমান।

   আমাদের কথা, আল্লাহর শানে যে ধরণের সমুন্নত হওয়া প্রযোজ্য তিনি সে রকমভাবেই আরশে আযীমে সমুন্নত- এর অর্থ এই যে, আরশের উপরে আল্লাহর সমুন্নত হওয়া আল্লাহর অন্যান্য সিফাতের মতই। আল্লাহর যাবতীয় গুণাবলী আল্লাহর ক্ষমতা ও বড়ত্ব অনুযায়ী তাঁর সাথে প্রতিষ্ঠিত। আরশের উপরে তাঁর সমুন্নত অন্য কোন মাখলুকাতের সমুন্নত হওয়ার মত নয়। আল্লাহর সত্বা যেহেতু অন্য কোন সত্বার মত নয়, তাই তাঁর সিফাতও অন্য কোন সিফাতের মত নয়। আল্লাহ বলেনঃ
)لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ(
“তাঁর অনুরূপ কোন কিছু নেই। তিনি সব কিছু দেখেন এবং শুনেন।” (সূরা শুরাঃ ১১) আল্লাহর সত্বার মত কোন সত্বা নেই এবং আল্লাহর গুণাবলীর মত কোন গুণাবলীও নেই। একজন বিদ্‌আতী লোক ইমাম মালেক (রঃ)কে জিজ্ঞাসা করল যে, আল্লাহ আরশের উপরে কি অবস্থায় সমুন্নত আছেন? উত্তরে মহামান্য ইমাম বললেন, ‘আরশের উপরে আল্লাহর সমুন্নত হওয়া একটি জানা বিষয়। এর পদ্ধতি কেউ অবগত নয়। তার উপরে ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব। তবে এব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা বিদ্‌আত।’ পরবর্তী বিদ্যানগণ সকল সিফাতের ক্ষেত্রে ইমাম মালেক (রঃ) এর এ উক্তিটিকে একটি মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করেছেন।

প্রশ্নঃ (৩৫) কোন ক্ষেত্রে ইন্‌শাআল্লাহ বলতে হবে? এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বলতে হবে না?
উত্তরঃ ভবিষ্যতের সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি বিষয়ের ক্ষেত্রে ইন্‌শাআল্লাহ বলা উত্তম। আল্লাহ বলেনঃ
)وَلا تَقُولَنَّ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَلِكَ غَدًا إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ      (
“কখনই তুমি কোন বিষয়ে বলোনা, আমি ওটা আগামীকাল করবো। তবে এভাবে বলবে যে, যদি আল্লাহ চান।” (সূরা কাহাফঃ ২৩-২৪) অতীত হয়ে গেছে এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে ইনশাআল্লাহ বলার দরকার নেই। যেমন কোন লোক যদি বলে গত রবিবারে রামাযান মাস এসেছে ইনশাআল্লাহ। এখানে ইনশাআল্লাহ বলার প্রয়োজন নেই। কারণ তা অতীত হয়ে গেছে। অনুরূপভাবে ইনশাআল্লাহ আমি কাপড় পরিধান করেছি। এখানেও ইনশাআল্লাহ বলার দরকার নেই। কারণ কাপড় পরিধান করা শেষ হয়ে গেছে। নামায আদায় করার পর ইনশাআল্লাহ নামায পড়েছি বলার দরকার নেই। কিন্তু যদি বলে ইনশাআল্লাহ মাকবূল নামায পড়েছি তাহলে কোন অসুবিধা নেই। কারণ নামায কবূল হল কি না তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেনা।

প্রশ্নঃ (৩৬) ইরাদাহ বা আল্লাহর ইচ্ছা কত প্রকার?
উত্তরঃ ইরাদাহ (ইচ্ছা) দু’প্রকার

১)      ইরাদাহ কাওনীয়া (সৃষ্টি গত ইচ্ছা)
২)      ইরাদা শারঈয়া (শরীয়ত গত ইচ্ছা)

আল্লাহর যে ইচ্ছা সৃষ্টি করার সাথে সম্পৃক্ত তাই ইরাদাহ কাওনীয়া। আর যে ইচ্ছা ভালবাসার সাথে সম্পৃক্ত তাকে ইরাদাহ শরঈয়া বলা হয়। অর্থাৎ আল্লাহ তাআ’লা কোন জিনিষকে ভালবেসে যে ইচ্ছা পোষাণ করেন তাকে ইরাদাহ শরঈয়া বলা হয়। ইরাদাহ শরঈয়ার উদাহরণ হল, আল্লাহর বাণী
)وَاللَّهُ يُرِيدُ أَنْ يَتُوبَ عَلَيْكُمْ(
“আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করতে ইচ্ছা করেন।” (সূরা নিসাঃ ২৭) এখানে ইচ্ছা করেন অর্থ ভালবাসেন। এখানে সৃষ্টিগত ইচ্ছা অর্থে ব্যবহার হয়নি; বরং ব্যবহৃত হয়েছে শরীয়তগত ইচ্ছায়। যদি সৃষ্টিগত অর্থে হত তাহলে সকল মানুষকে ক্ষমা করে দিতেন। কিন্তু তা তো করেন নি। কেননা অধিকাংশ বনী আদমই কাফির। সুতরাং আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করতে ইচ্ছা করেন অর্থ আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করা পছন্দ করেন। আল্লাহ কোন জিনিষকে ভালবাসার অর্থ এই নয় যে, তা অবশ্যই কার্যকরী হবে। তা কার্যকরী না হওয়ার পিছনে নিশ্চয়ই কোন রহস্য রয়েছে।

ইরাদাহ কাওনীয়া তথা সৃষ্টির সাথে সংলিষ্ট ইচ্ছার দৃষ্টান্ত হল,
)إِنْ كَانَ اللَّهُ يُرِيْدُ أَنْ يُغْوِيَكُمْ(
“যদি আল্লাহই তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট করার ইচ্ছা করেন।” (সূরা হুদঃ ৩৪) এখানে যে ইচ্ছার কথা বলা হয়েছে, তাতে আল্লাহর ভালবাসা থাকা জরুরী নয়।

যদি বলা হয় কার্যকরী হওয়া বা না হওয়ার দিক থেকে ইরাদাহ কাওনীয়া এবং ইরাদাহ শরঈয়ার মধ্যে পার্থক্য কি? উত্তরে আমরা বলব যে, ইরাদাহ কাওনীয়াতে উদ্দিষ্ট বস্ত অবশ্যই কার্যকরী হবে। আল্লাহ কোন বস্ত সৃষ্টি করতে চাইলে তা অবশ্যই করবেন। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئاً أَنْ يَقُوْلَ لَهُ كُنْ فَيَكُوْنُ(
“আল্লাহর আদেশ তো এমনই যে, তিনি যখন কোন কিছু সৃষ্টি করতে চান, তখন তিনি বলেন, হয়ে যাও। আর সাথে সাথে তা হয়ে যায়।” (সূরা ইউনুছঃ ৮২) আর ইরাদা শরঈয়া বাস্তবায়িত হওয়া আবশ্যক নয়। কখনো তা কার্যকরী হয় আবার কখনো কার্যকরী হয়না। অথচ আল্লাহ তাআ’লা শরীয়তগতভাবে জিনিষটি বাস্তবায়িত হওয়াকে পছন্দ করেন।

   যদি কোন লোক জিজ্ঞাসা করে যে, আল্লাহ কি পাপ কাজের ইচ্ছা পোষণ করেন? উত্তর হল সংঘটিত হওয়ার দিক থেকে পাপ কাজও আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়। কিন্তু আল্লাহ তা পছন্দ করেন না এবং ভালবাসেন না। তবে আকাশ-জমিনে যা কিছু হয়, তা আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয়।

প্রশ্নঃ (৩৭) আল্লাহর নামের ক্ষেত্রে ইলহাদ (إلحاد) কাকে বলে? উহা কত প্রকার ও কি কি?
উত্তরঃ ইলহাদের আভিধানিক অর্থ বাঁকা হয়ে যাওয়া বা এক দিকে ঝুকে পড়া। আল্লাহর বাণীঃ
)لِسَانُ الَّذِي يُلْحِدُونَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ وَهَذَا لِسَانٌ عَرَبِيٌّ مُبِينٌ(
“যার দিকে তারা ইঙ্গিত করে, তার ভাষা তো আরবী নয় এবং এ কুরআন পরিস্কার আরবী ভাষায়।” (সূরা নাহলঃ ১০৩) লাহাদ কবর যেহেতু এক পাশ দিয়ে বাঁকা করে ভিতরের দিকে প্রবেশ করানো থাকে, তাই তাকে লাহাদ বলা হয়। সঠিক বিষয় জানা না থাকলে ইলহাদ জানা সম্ভব নয়। আল্লাহর নাম এবং গুণাবলীর ক্ষেত্রে সঠিক কথা হল এগুলোকে আমরা আহলে সুন্নাতদের মূলনীতি অনুযায়ী কোন প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন, বিকৃতি, বাতিল এবং উপমা-দৃষ্টান্ত বর্ণনা ছাড়াই আল্লাহর শানে প্রযোজ্য অর্থে ব্যবহার করব। সুতরাং আমরা যখন সঠিক পথ জানতে পারলাম, তখন তার বিপরীত পথে যাওয়ার নামই ইলহাদ বা আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে বক্রপথ অবলম্বন। আলেমগণ ইলহাদকে কয়েক ভাগে বিভক্ত করেছেনঃ

১) আল্লাহর কোন নাম বা কোন গুণকে সরাসরি অস্বীকার করাঃ যেমন জাহেলী যুগের লোকেরা আল্লাহর ‘রাহমান’ নামটি অস্বীকার করত। কিংবা নামটির প্রতি ঈমান আনয়ন করল কিন্তু নামটি যে গুণের প্রতি প্রমাণ বহণ করে, তা অস্বীকার করল। যেমন কোন কোন বিদ্‌আতী বলে থাকে, আল্লাহ দয়াবিহীন দয়ালু, শ্রবণশক্তিহীন শ্রবণকারী।

২) আল্লাহ নিজেকে যে নামে নামকরণ করেন নি, সে নামে তাঁকে নামকরণ করাঃ এভাবে নাম রাখা ইলহাদ হওয়ার কারণ হল আল্লাহর নাম সমূহ কুরআন এবং সুন্নাহতে যেভাবে এসেছে সেভাবেই মানতে হবে। কারও পক্ষে জায়েয নেই যে, নিজ থেকে আল্লাহর নাম রাখবে। কারণ এটি আল্লাহর ব্যাপারে অজ্ঞতা বশতঃ কথা বলার শামিল। যেমন খৃষ্টানেরা আল্লাহকে পিতা বলে এবং দার্শনিকরা ক্রিয়াশীল কারণ বলে থাকে।

৩) আল্লাহর নামসমূহকে সৃষ্টিকুলের গুণাবলীর প্রতি নির্দেশ দানকারী মনে করে উপমা স্বরূপ বিশ্বাস করাও ইলহাদের অন্তর্ভুক্ত। ইলহাদ হওয়ার কারণ হল, যে ব্যক্তি বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহর নাম ও গুণাবলী মানুষের নামের মতই, সে তাকে তার আপন অর্থ হতে সরিয়ে ফেলল এবং সঠিক অর্থ বর্জন করে অন্য অর্থ গ্রহণ করল। এ রকম করা কুফরী। আল্লাহ বলেনঃ
)لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ(
“তাঁর অনুরূপ আর কেউ নেই। তিনি সব কিছু জানেন এবং শুনেন।” (সূরা শুরাঃ ১১) আল্লাহ আরো বলেন,
)هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا(
“তাঁর সমকক্ষ কেউ আছে কি?” (সূরা মারইয়ামঃ ৬৫) ইমাম বুখারীর (রঃ) উস্তাদ নাঈম ইবনে হাম্মাদ বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে মাখলুকের সাথে তুলনা করল, সে কুফরী করল। যে ব্যক্তি আল্লাহর কোন গুণকে অস্বীকার করল, সেও কুফরী করল। আল্লাহ নিজেকে যে সমস্ত গুণে গুণাম্বিত করেছেন, তাতে মাখলুকের সাথে কোন তুলনা নেই।

৪) আল্লাহর নাম থেকে মূর্তির নাম বের করাঃ যেমন ইলাহ থেকে লাত নাম বের করা, আজীজ থেকে উজ্জা এবং মান্নান থেকে মানাত ইত্যাদি। এখানে ইলহাদ হওয়ার কারণ এই যে, আল্লাহর নামগুলো শুধু তার জন্যই নির্দিষ্ট। অন্য কোন মাখলুককে আল্লাহর জন্য নির্ধারিত এবাদতের অংশ প্রদান করার উদ্দেশ্যে এগুলোর অর্থ স্থানান্তর করা জায়েয নেই।

আল্লাহর ‘চেহারা’, আল্লাহর ‘হাত’ ইত্যাদি সম্পর্কে

প্রশ্নঃ (৩৮) আল্লাহর ‘চেহারা’, আল্লাহর ‘হাত’ এজাতীয় যে সমস্ত বিষয় আল্লাহ নিজের দিকে সম্বন্ধ করেছেন তা কত প্রকার?

উত্তরঃ আল্লাহ তা’আলা নিজের দিকে যেসমস্ত বিষয় সম্বন্ধ করেছেন তা তিন প্রকার। যথাঃ 

(১) স্বয়ং সম্পূর্ণ কোন বস্তকে আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা। এটি হল সৃষ্টিকে তার স্রষ্টার দিকে সম্পৃক্ত করার শ্রেণীভুক্ত। এটি কখনো সাধারণ ভঙ্গিতে হয় যেমন আল্লাহ বলেনঃ
)إِنَّ أَرْضِي وَاسِعَةٌ(
“আমার জমিন অতি প্রশস্ত।” (সূরা আনকাবূতঃ ৫৬) 
কখনো কোন জিনিষের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য আল্লাহর দিকে সম্বন্ধ করা হয়। যেমন বলা হয়, بيت الله)) আল্লাহর ঘর, (ناقة الله)  আল্লাহর উটনী ইত্যাদি। আল্লাহ বলেনঃ
]وَطَهِّرْ بَيْتِي لِلطَّائِفِينَ وَالْقَائِمِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ[
“এবং আমার ঘরকে পবিত্র রেখো তাদের জন্যে যারা তাওয়াফ করে এবং যারা দাঁড়ায়, রুকূ করে ও সিজদা করে।” (সূরা হাজ্জ- ২৬) আল্লাহ আরো বলেন,
]نَاقَةَ اللَّهِ وَسُقْيَاهَا[
“আল্লাহর উষ্ট্রী ও তাকে পানি পান করাবার বিষয়ে সাবধান হও।” (সূরা শামস্ত ১৩)

(২) অন্যের উপর নির্ভরশীল কোন বস্তকে আল্লাহর প্রতি সম্বন্ধ করা। সাধারণত সম্বানের জন্যই তাকে আল্লাহর দিকে সম্বন্ধ করা হয়। আল্লাহ ঈসা (আঃ) এর ব্যাপারে বলেনঃ
)وَرُوحٌ مِنْهُ(
“তিনি আল্লাহর রূহ।” (সূরা নিসাঃ ১৭১) 
এখানে ঈসা (আঃ)এর সম্মান বৃদ্ধির জন্য তাঁকে আল্লাহর দিকে সম্বন্ধিত করা হয়েছে। তিনি আল্লাহর রূহ এর অর্থ হল, আল্লাহ যে সমস্ত রূহ সৃষ্টি করেছেন, তাঁর রূহও সে সমস্ত রূহের অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু এরূহ অন্যান্য রূহের তুলনায় অধিক মর্যাদা সম্পন্ন। এ নয় যে, আল্লাহর রূহ ঈসা (আঃ) এর রূহের ভিতরে প্রবেশ করে আছে।

৩) আল্লাহর সিফাতকে আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করাঃ কুরআনে ব্যাপকভাবে এ ভঙ্গিতে আল্লাহর সিফাতের বিবরণ এসেছে। আল্লাহর কোন সিফাতই তাঁর সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত নয়। যেমনঃ وجه الله আল্লাহর চেহারা, يد الله আল্লাহর হাত, قدرة الله আল্লাহর শক্তি বা ক্ষমতা, عزة الله আল্লাহর ইয্‌যত বা সম্মান।

প্রশ্নঃ (৩৯) আল্লাহর কোন নাম বা গুণ অস্বীকার করার হুকুম কি?
উত্তরঃ আল্লাহর নাম ও গুণ অস্বীকার করা দু‘ধরণের হতে পারেঃ (১) মিথ্যা প্রতিপন্ন করার মাধ্যমে অস্বীকার করা। এটা নিঃসন্দেহে কুফরী। সুতরাং যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহর কোন নামকে অস্বীকার করে অথবা কুরআন ও সুন্নায় বর্ণিত আল্লাহর কোন গুণকে অস্বীকার করে, যেমন বলল, আল্লাহর কোন হাত নাই, এধরণের কথা মুসলমানের ঐক্যমতে সম্পূর্ণ কুফরী। কেননা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সংবাদকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা কুফরী এবং তা ইসলাম থেকে মানুষকে বের করে দেয়। (২) ব্যাখ্যার মাধ্যমে অস্বীকার করা। তা হল সরাসরি অস্বীকার না করে ব্যাখ্যা করে অস্বীকার করা। এটি আবার দু‘প্রকার। (ক) ব্যাখ্যাটি আরবী ভাষা অনুপাতে হওয়া। এটি কুফরী নয়। (খ) আরবী ভাষাতে ব্যাখ্যাটির পক্ষে কোন প্রকার যুক্তি না থাকা। এটি কুফরীকে আবশ্যক করে। ব্যাখ্যার কোন সুযোগ না থাকলে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী হিসাবে সাব্যস্ত হবে। যেমন কেউ বলল, প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর কোন ‘হাত’ নেই। এমনকি ‘নিয়ামত’ কিংবা ‘শক্তি’ অর্থেও নেই। এ রকম বিশ্বাস পোষণকারী কাফের। কেননা সে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর নাম ও গুণাবলীকে অস্বীকার করল। আর যদি আল্লাহর বাণী, بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوْطَتَانِ “বরং তাঁর দু’হাত প্রসারিত।” (সূরা মায়িদাঃ ৬৪) এর ব্যাখ্যায় কেউ বলে এখানে আল্লাহর দু’হাত দ্বারা আকাশ-জমিন উদ্দেশ্য, সে কাফের হিসাবে গণ্য হবে। কারণ আরবী ভাষাতে এধরণের ব্যাখ্যা ঠিক নয় এবং শরঈ বাস্তবতারও পরিপন্থী। কিন্তু হাতকে যদি নেয়ামতের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে কিংবা শক্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে, তাহলে কাফের হবে না। কারণ ‘হাত’ কখনো কখনো ‘নেয়ামত’ অর্থে ব্যবহার হয়। কিন্তু হাতের প্রকৃত অর্থ পরিত্যাগ করলে অবশ্যই বিদআতীদের দলভুক্ত হবে।

প্রশ্নঃ (৪০) আল্লাহর গুণাবলী কি মানুষের গুণাবলীর মতই?
উত্তরঃ যে ব্যক্তি এই বিশ্বাস পোষণ করবে যে, আল্লাহর সিফাত তথা গুণাবলী মানুষের গুণাবলীর মতই সে পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। কেননা কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী আল্লাহর গুণাবলী মানুষের গুণাবলীর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ(
“তাঁর অনুরূপ আর কেউ নেই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা শুরাঃ ১১) দু’টি জিনিষের নাম ও গুণ এক হলেই জিনিষ দু’টি সকল দিক থেকে এক হওয়া জরুরী নয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি। মানুষের মুখমন্ডল আছে। উটেরও মুখমন্ডল আছে। মুখ দু’টি কি একই রকম? কখনই নয়। অনুরূপভাবে উটের হাত আছে পিপিলিকারও হাত আছে। হাত দু‘টি কি সমান? তাহলে কেন আমরা বলব না যে, আল্লাহর চেহারা আছে। তা মাখলুকাতের চেহারার অনুরূপ নয়। আল্লাহর হাত আছে। কিন্তু তা মানুষের হাতের মত নয়। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّماوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِينِهِ(
“তারা যথার্থভাবে আল্লাহর ক্ষমতা ও সম্মান বুঝতে পারেনি। কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোতে এবং আসমানসমূহ ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে তাঁর ডান হাতে।” (সূরা যমারঃ ৬৭) আল্লাহ আরো বলেনঃ
)يَوْمَ نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَيِّ السِّجِلِّ لِلْكُتُبِ(
“সেদিন আমি আকাশকে গুটিয়ে নেব, যেভাবে গুটানো হয় লিখিত কাগজপত্র।” (সূরা আম্বিয়াঃ ১০৪) কোন মাখলুকের কি এধরণের হাত রয়েছে? কখনই নয়। সুতরাং আমাদের জেনে রাখা উচিৎ যে, যিনি সৃষ্টিকর্তা তিনি সৃষ্টিজীবের মত নন। না সত্বায় না গুণাবলীতে। لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ অর্থঃ “তাঁর মত আর কেউ নেই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা শুরাঃ ১১) এই জন্যই আল্লাহর কোন সিফাতের ধরণ গঠন বা প্রকৃতি অনুসন্ধান করা ঠিক নয়। কিংবা এরকম ধারণা করা ঠিক নয় যে, আল্লাহর গুণসমূহ মানুষের গুণাবলীর মতই।

প্রশ্নঃ (৪১) আমরা জানি যে, রাত ভূপৃষ্ঠের উপরে ঘুর্ণায়মান। আর আল্লাহ রাতের তিন ভাগের এক ভাগ অবশিষ্ট থাকতে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন। এ হিসাবে আল্লাহ তাআ’লা রাতভর দুনিয়ার আকাশেই থাকেন। এর উত্তর কি?
উত্তরঃ আল্লাহ কুরআন মজীদে নিজেকে যেসমস্ত গুণে গুণাম্বিত করেছেন এবং যেসমস্ত নামে নিজেকে নামকরণ করেছেন তাঁর উপর ঈমান আনয়ন করা আমাদের উপর ওয়াজিব। এমনিভাবে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর যে সমস্ত নাম ও গুণাবলী বর্ণনা করেছেন কোন প্রকার পরিবর্তন, পরিবর্ধন অস্বীকৃতি, পরিচয়ের জন্য ধরণ নির্ধারণ করা বা উপমা পেশ করা ব্যতীত তার উপর ঈমান আনা আবশ্যক। পরিবর্তন সাধারণতঃ হয়ে থাকে আয়াত ও হাদীছ সমূহে। আর অস্বীকার হয়ে থাকে আকীদার ভিতরে। ধরণ, পদ্ধতি ও উপমা বর্ণনা করা হয় সিফাত তথা গুণের ভিতরে। সুতরাং উপরোক্ত চারটি দোষ হতে আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস পরিস্কার করতে হবে। আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে কেন, কেমন? এ ধরণের প্রশ্ন করা যাবে না। এমনিভাবে আল্লাহর গুণাবলীর ব্যাপারে ধরণ বর্ণনার চিন্তা করা থেকে মানুষ সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে অনেক বিষয় সহজ হয়ে যাবে। এটাই ছিল সালাফে সালেহীনের আদর্শ। 

ইমাম মালেকের (রঃ) কাছে এক লোক এসে বলল, হে আবু আবদুর রহমান! আল্লাহ তো আরশের উপরে আছেন, তবে কিভাবে? উত্তরে ইমাম মালেক (রঃ) বললেন, আরশের উপরে থাকার বিষয়টি জ্ঞাত আছে। কিভাবে আছেন তা আমাদের জানার বাইরে। এ বিষয়ে ঈমান রাখা ওয়াজিব। আর এ বিষয়ে প্রশ্ন করা বিদ্‌আত। আমার মনে হচ্ছে তুমি একজন বিদ্‌আতী লোক।

   যে ব্যক্তি বলে যেহেতু রাত সারা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করে আর আল্লাহ তাআ’লা রাতের এক তৃতীয়াংশ বাকী থাকতে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন, তাই আল্লাহ সারা রাতই এ আকাশে থাকেন। কারণ শেষ তৃতীয়াংশ তো এক স্থান হতে অন্য স্থানে প্রতিনিয়ত স্থানান্তরিত হয়ে থাকে।

উত্তরে আমরা বলব যে, এই প্রশ্নটি কোন ছাহাবী করেন নি। যদি প্রশ্নটি কোন মুসলিমের অন্তরে হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো, তাহলে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল অবশ্যই তা বর্ণনা করতেন। আমরা বলব পৃথিবীর কোন অংশে যতক্ষণ রাতের এক তৃতীয়াংশ থাকবে, ততক্ষণ সেখানে আল্লাহর অবতরণের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বাস্তবায়িত হবে। রাত শেষ হয়ে গেলে তা শেষ হয়ে যাবে। তবে আল্লাহর অবতরণের ধরণ আমরা জানিনা। তার সঠিক জ্ঞানও আমাদের কাছে নেই। আর আমরা জানি আল্লাহর মত আর কেউ নেই। আমাদের উচিৎ হবে আল্লাহর কিতাবের সামনে আত্মসমর্পণ করা এবং এ কথা বলা যে, আমরা শুনলাম এবং ঈমান আনয়ন করলাম ও অনুসরণ করলাম। এটাই আমাদের করণীয়।

প্রশ্নঃ (৪২) আল্লাহকে দেখার ব্যাপারে সালাফে সালেহীনের অভিমত কি? যারা বলে যে, চর্মচক্ষু দিয়ে আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয় বরং আল্লাহকে দেখার অর্থ পরিপূর্ণ ঈমানের নামান্তর, তাদের হুকুম কি?
উত্তরঃ আল্লাহ তাআ’লা কুরআন মজীদে কিয়ামতের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন,
)وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ(
“সেদিন অনেক মুখমন্ডল উজ্জল হবে। তারা তাদের পালনকর্তার দিকে তাকিয়ে থাকবে।” (সূরা কিয়ামাহঃ ২২-২৩) আয়াতের মধ্যে সুস্পষ্ট দলীল পাওয়া যায় যে, কিয়ামত দিবসে জান্নাতের মধ্যে আল্লাহকে চর্মচক্ষু দিয়ে দেখা যাবে। এর অর্থ এ নয় যে, আল্লাহর সমগ্র সত্বাকে দর্শন করা সম্ভব হবে। 
)وَلَا يُحِيطُونَ بِهِ عِلْمًا(
“তারা তাঁকে জ্ঞান দ্বারা আয়ত্ব করতে পারে না।” (সূরা ত্বোহাঃ ১১০) জ্ঞানের মাধ্যমে কোন জিনিষকে আয়ত্ব করার বিষয়টি চোখের মাধ্যমে দেখে আত্ত্ব করার চেয়ে অধিকতর ব্যাপক। যখন জ্ঞানের মাধ্যমে আল্লাহকে পরিপূর্ণভাবে জানা সম্ভব নয় তাহলে প্রমাণিত হচ্ছে যে চর্মচক্ষু দ্বারা পরিপূর্ণভাবে দর্শন করা সম্ভব নয়। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)لَا تُدْرِكُهُ الْأَبْصَارُ وَهُوَ يُدْرِكُ الْأَبْصَارَ (
“দৃষ্টিসমূহ তাঁকে পারে না, অবশ্য তিনি দৃষ্টিসমূহকে পেতে পারেন।” (সূরা আনআ’মঃ ১০৩) প্রকৃত পক্ষেই মানুষ আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখবে। কিন্তু পরিপূর্ণভাবে তাঁকে বেষ্টন করতে পারবে না। কারণ আল্লাহ তাআ’লা এর অনেক উর্দ্ধে। এটাই সালাফে সালেহীনের মাযহাব। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহর দিকে তাকিয়ে থাকা বেহেশ্‌তবাসীর জন্য হবে সবচেয়ে বড় নেয়ামত। এই জন্যই নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’আয় বলতেনঃ
)وَأَسْأَلُكَ لَذَّةَ النَّظَرِ إِلَى وَجْهِكَ(
উচ্চারণঃ- আস্‌-আলুকা লায্‌যাতান্‌ নাযরি ইলা ওয়াজ্‌হিকা। অর্থঃ “হে আল্লাহ আমি আপনার চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকার পরিতৃপ্তি প্রার্থনা করছি।” আল্লাহর চেহারার দিকে তাকানোর স্বাদ খুবই বিরাট। যে ব্যক্তি আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহ লাভ করেছে, সেই কেবলমাত্র তা অনুভব করতে সক্ষম হবে। আল্লাহর কাছে দু’আ করি তিনি যেন আমাকে এবং আপনাদেরকে তাঁর দিদার লাভে ধন্য করেন।

   যারা ধারণা করে যে, আল্লাহকে চর্মচক্ষু দ্বারা দেখা সম্ভব নয়; বরং আল্লাহকে দেখার অর্থ পরিপূর্ণভাবে অন্তর দিয়ে আল্লাহকে বিশ্বাস করার নামান্তর, তাদের কথা বাতিল এবং দলীল বিরোধী। প্রকৃত অবস্থা এই ধারণাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। কারণ অন্তরের পরিপূর্ণ বিশ্বাস দুনিয়াতেই বর্তমান রয়েছে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইহসানের ব্যাখ্যায় বলেনঃ
أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ
“ইহসান হল তুমি এমনভাবে আল্লাহর এবাদত করবে যে, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ। তা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।” তুমি এমন ঈমান নিয়ে আল্লাহর এবাদত করবে, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ। এটিই পরিপূর্ণ ঈমানের পরিচয়। যে সমস্ত আয়াত ও হাদীছে আল্লাহকে দেখার কথা আছে, সেগুলোকে অন্তরের বিশ্বাসের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্পূর্ণ ভুল এবং কুরআনের আয়াতকে তার আসল অর্থ হতে পরিবর্তন করার শামিল। যে ব্যক্তি এ ধরণের ব্যাখ্যা করবে তার প্রতিবাদ করা ওয়াজিব।

প্রশ্নঃ (৪৩) জিনের আক্রমণ থেকে বাঁচার উপায় কি?
উত্তরঃ সন্দেহ নেই যে, জিনেরা মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করে এবং কষ্ট দিতে পারে। কখনো জিনেরা মানুষকে মেরে ফেলে। কখনো বা পাথর নিক্ষেপ করে এবং বিভিন্নভাবে ভয় দেখায়। জিনদের এ সকল কর্ম হাদীছ এবং বিভিন্ন বাস্তব ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে প্রমাণিত আছে যে, তিনি খন্দকের যুদ্ধের দিন জনৈক ছাহাবীকে তার স্ত্রীর কাছে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিলেন। কারণ তিনি নতুন বিবাহিত যুবক ছিলেন। ঘরে ফিরে যুবক দেখলেন, স্ত্রী ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। এ দেখে তিনি তার প্রতি মনক্ষুন্ন হলেন। স্ত্রী বললেন, ঘরে প্রবেশ করুন। ঘরে প্রবেশ করে দেখলেন বিছানার উপরে একটি সাপ ব্যাড় দিয়ে বসে রয়েছে। হাতেই ছিল বর্শা। বর্শা দিয়ে সাপকে আঘাত করার সাথে সাথে সাপটি মারা গেল এবং উক্ত ছাহাবীও মৃত্যু বরণ করলেন। সাপ এবং ছাহাবীর মধ্যে কে আগে মারা গেল, তা জানা যায়নি। এই সংবাদ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কাছে পৌঁছার পর তিনি ঘরের মধ্যে বসবাসকারী সাপগুলো মারতে নিষেধ করলেন। তবে পিঠের উপরে রেখা বিশিষ্ট এবং লেজহীন ছোট ছোট সাপগুলো ব্যতীত। এই ঘটনা থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, জিনেরা মানুষের উপরে আক্রমণ করে এবং কষ্ট দেয়। মুতাওয়াতের এবং মাশহুর সনদে বর্ণিত হাদীছে আছে যে, মানুষ কখনো কখনো পুরাতন এবং ধ্বংস প্রাপ্ত বাড়ী-ঘরে প্রবেশ করলে পাথর নিক্ষিপ্ত হয়। অথচ সেখানে কোন মানুষ দেখতে পায়না। কখনো কখনো আওয়াজ এবং গাছের পাতার নাড়াচাড়া শুনতে পায়। এতে মানুষ ভয় পায়। এমনিভাবে আসক্ত হয়ে কিংবা কষ্ট দেয়ার জন্য অথবা অন্য কোন কারণে জিন মানুষের শরীরেও প্রবেশ করে। এ দিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ বলেনঃ
)الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنْ الْمَسِّ(
“যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে দন্ডায়মান হবে যেভাবে দন্ডায়মান হয় ঐ ব্যক্তি, যাকে শয়তান (জিন) আছর করে ভারসাম্যহীন পাগলের মত করে দেয়।” (সূরা বাকারাঃ ২৭৫) কখনো জিনেরা মানুষের শরীরে মিশে গিয়ে তার মুখ দিয়ে কথা বলে। জিনে ধরা রোগীর কাছে কবিরাজ যখন কুরআনের আয়াত পাঠ করে, তখন জিন তার সাথে কথা বলে। কবিরাজ জিনের কাছ থেকে পুনরায় না আসার অঙ্গীকার গ্রহণ করে। এ ধরণের আরো কথা হাদীছে বর্ণিত আছে এবং জনসমাজে প্রচলিত রয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে আমরা বলতে পারি যে, জিনের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য সুন্নাহতে বর্ণিত দু’আগুলো পাঠ করতে হবে। তার মধ্যে আয়াতুল কুরসী অন্যতম। কোন লোক রাত্রিতে আয়াতুল কুরসী পাঠ করলে সারা রাত আল্লাহর পক্ষ হতে একজন হেফাজতকারী থাকে। সকাল পর্যন্ত শয়তান তার নিকটেও আসতে পারে না।

প্রশ্নঃ (৪৪) জিনেরা কি গায়েব জানে?
উত্তরঃ জিনেরা গায়েব জানে না। আল্লাহ ব্যতীত আকাশ-জমিনের কোন মাখলুকই গায়েবের খবর রাখে না। আল্লাহ বলেনঃ
)فَلَمَّا قَضَيْنَا عَلَيْهِ الْمَوْتَ مَا دَلَّهُمْ عَلَى مَوْتِهِ إِلَّا دَابَّةُ الْأَرْضِ تَأْكُلُ مِنسَأَتَهُ فَلَمَّا خَرَّ تَبَيَّنَتْ الْجِنُّ أَنْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ الْغَيْبَ مَا لَبِثُوا فِي الْعَذَابِ الْمُهِينِ(
“যখন আমি তাঁর (সোলায়মানের) মৃত্যু ঘটালাম, তখন ঘুণ পোকাই জিনদেরকে তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করল। সোলায়মানের লাঠি খেয়ে যাচ্ছিল। যখন তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন, তখন জিনেরা বুঝতে পারল যে, অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান থাকলে তারা এই লাঞ্চনাপূর্ণ শাস্তিতে আবদ্ধ থাকতো না।” (সূরা সাবাঃ ১৪) সুতরাং যে ব্যক্তি ইলমে গায়েবের দাবী করবে সে কাফের হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি কাউকে ইলমে গায়েব জানে বলে বিশ্বাস করবে, সেও কাফের। কারণ আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ গায়েবের খবর জানে না। আল্লাহ বলেন,
)قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ(
“বলুন আসমান যমিনে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ গায়েবের খবর জানে না।” (সূরা নামলঃ ৬৫) যারা ভবিষ্যতের সংবাদ জানে বলে দাবী করে, তাদেরকে গণক বলা হয়। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً
যে ব্যক্তি কোন গণকের কাছে এসে কোন কিছু জিজ্ঞাসা করল, চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামায কবূল হবে না। গণকের কথা বিশ্বাস করলে কাফেরে পরিণত হবে। কারণ গণকের কথা বিশ্বাসের মাধ্যমে সে আল্লাহর নিম্নলিখিত বাণীকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করল। আল্লাহ বলেনঃ
)قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ(
“আসমান যমিনে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ গায়েবের খবর জানে না।” (সূরা নামলঃ ৬৫)

প্রশ্নঃ (৪৫) যারা আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে হাবীবুল্লাহ (আল্লাহর হাবীব) বলে তাদের হুকুম কি?
উত্তরঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর বন্ধু। এতে কোন সন্দেহ নেই। আল্লাহকে তিনি খুব ভাল বাসতেন আল্লাহও তাকে খুব ভালবাসেন। কিন্তু এর চেয়ে উত্তম শব্দ দ্বারা তাঁর প্রশংসা করা যায়। তা হল খালীলুল্লাহ বা আল্লাহর নিকটতম বন্ধু। সুতরাং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর বন্ধু। তিনি বলেন,
) اِنَّ اللَّهَ اتَّخَذَنِي خَلِيلًا كَمَا اتَّخَذَ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا(
“আল্লাহ তাআ’লা আমাকে নিকটতম বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন। যেমনভাবে আল্লাহ তাআ’লা ইবরাহীম (আঃ)কে নিকটতম বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন।” যে ব্যক্তি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে হাবীবুল্লাহ গুণে গুণাম্বিত করল, সে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর মর্যাদা কমিয়ে দিল। হাবীবুল্লাহর চেয়ে খলীলুল্লাহর মর্যাদা বেশী। প্রতিটি মুমিনই আল্লাহর হাবীব। কিন্তু রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর মর্যাদা এর চেয়ে বেশী। আল্লাহ তাআ’লা ইবরাহীম (আঃ) ও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে খলীল বা বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেছেন। এই জন্যই আমরা বলি যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খলীলুল্লাহ। কারণ হাবীবুল্লাহর চেয়ে খলীলুল্লাহর ভিতরে বন্ধুত্বের অর্থ বেশী পরিমাণে বর্তমান রয়েছে।

প্রশ্নঃ (৪৬) দুনিয়ার স্বার্থ হাসিলের জন্য নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর প্রশংসা করার হুকুম কি?
উত্তরঃ দুনিয়ার সম্পদ অর্জনের জন্য নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর প্রশংসা করা হারাম। এখানে জানা দরকার যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর প্রশংসাকারীগণ দু’ভাগে বিভক্ত।

১) বাড়াবাড়ি ব্যতীত নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর প্রশংসা করাতে অসুবিধা নেই। অর্থাৎ তাঁর চরিত্রে যে সমস্ত সৎ গুণাবলী রয়েছে, তা বর্ণনা করাতে কোন দোষ নেই।

২) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করা। তিনি এটা নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন,
لَا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ
নাসারা সম্প্রদায় যেমনভাবে ঈসা ইবনে মারঈয়ামের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছিল, তোমরা সেভাবে আমার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করো না। আমি একজন আল্লাহর বান্দা। সুতরাং তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা এবং রাসূল বল। অতএব যে ব্যক্তি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর প্রশংসা এভাবে করবে যে, তিনি আশ্রয় প্রার্থীদের আশ্রয় দাতা, বিপদ গ্রসে'র আহবানে সাড়া দানকারী, তিনি দুনিয়া ও আখেরাতের মালিক, তিনি গায়েবের খবর জানেন ইত্যাদি বাক্য দ্বারা প্রশংসা করা হারাম। বরং কখনো ইসলাম থেকে বহিস্কারকারী শির্ক পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সুতরাং বেশী বাড়াবাড়ি করে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর প্রশংসা করা ঠিক নয়।

   রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর প্রশংসাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করে দুনিয়ার স্বার্থ অর্জন করা হারাম। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে সমস্ত উন্নত চারিত্রিক গুণাবলী ও প্রশংসিত বৈশিষ্টের অধিকারী ছিলেন, তা বর্ণনা করা এবাদতের অন্তর্ভুক্ত। আর যে জিনিষ এবাদতের অন্তর্ভুক্ত তাকে দুনিয়া অর্জনের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করা জায়েয নয়।
)مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لا يُبْخَسُونَ أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ(
“যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা করে আমি তাদেরকে দুনিয়াতেই তাদের আমলের প্রতিফল ভোগ করিয়ে দেব এবং তাতে তাদের প্রতি কিছুমাত্র কমতি করা হবেনা। এরাই হল সেসব লোক, আখেরাতে যাদের জন্য আগুন ছাড়া অন্য কিছু নেই। তারা দুনিয়াতে যা কিছু করেছিল সবই বরবাদ করেছে আর যা কিছু উপার্জন করেছিল, সবই বিনষ্ট হয়েছে।” (সূরা হূদঃ ১৫-১৬) আল্লাহই সঠিক পথের সন্ধান দাতা।

প্রশ্নঃ (৪৭) যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষ নন; বরং তিনি আল্লাহর নূর। অতঃপর সে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে এই বিশ্বাসে যে, তিনি কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক, তার হুকুম কি? এ ধরণের লোকের পিছনে নামায আদায় করা জায়েয আছে কি?
উত্তরঃ যে ব্যক্তি এই বিশ্বাস করবে যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর নূর-  (বা আল্লাহর যাতী নূর) মানুষ নন, তিনি গায়েবের খবর জানেন, সে আল্লাহ এবং রাসূলের সাথে কুফরী করল। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দুশমন, বন্ধু নয়। কেননা তার কথা আল্লাহ ও রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল, সে কাফের। আল্লাহ বলেনঃ
)قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ(
“আপনি বলুন, আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ।” (সূরা কাহফঃ ১১০) আল্লাহ বলেনঃ
)قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ(
আসমানযমিনে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ গায়েবের খবর জানে না। (সূরা নামলঃ ৬৫) আল্লাহ আরো বলেনঃ
)قُلْ لَا أَقُولُ لَكُمْ عِندِي خَزَائِنُ اللَّهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ لَكُمْ إِنِّي مَلَكٌ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ(
অর্থঃ “আপনি বলুন, আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডার রয়েছে। তাছাড়া আমি অদৃশ্য বিষয় অবগতও নই। আমি এমনও বলি না যে আমি ফেরেশতা। আমি তো শুধু ঐ অহীর অনুসরণ করি, যা আমার কাছে আসে।” (সূরা আন্‌আ’মঃ ৫০) আল্লাহ আরো বলেনঃ
)قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنْ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِي السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ(
“আপনি বলে দিন, আমি আমার নিজের কল্যাণ এবং অকল্যাণ সাধনের মালিক নই, কিন্তু যা আল্লাহ চান। আর আমি যদি গায়েবের কথা জেনে নিতে পারতাম, তাহলে বহু কল্যাণ অর্জন করে নিতে পারতাম। ফলে আমার কোন অমঙ্গল কখনো হতে পারত না। আমি তো শুধুমাত্র একজন ভীতি প্রদর্শক ও ঈমানদারদের জন্য সুসংবাদদাতা।” (সূরা আ’রাফঃ ১৮৮) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ
)إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ أَنْسَى كَمَا تَنْسَوْنَ فَإِذَا نَسِيتُ فَذَكِّرُونِي(
“আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। তোমরা যেমন ভুলে যাও আমিও তেমনি ভুলে যাই। আমি ভুল করলে তোমরা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিও।” যে ব্যক্তি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করল এই বিশ্বাসে যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভাল-মন্দের মালিক, সে কাফের হিসাবে গণ্য হবে। আল্লাহ বলেনঃ
)وَقَالَ رَبُّكُمْ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ(
অর্থঃ “তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব। যারা আমার এবাদতে অহংকার করে তারা সত্বরই জাহান্নামে প্রবেশ করবে অপমানিত অবস্থায়।” (সূরা গাফেরঃ ৬০) আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)قُلْ إِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا رَشَدًا قُلْ إِنِّي لَنْ يُجِيرَنِي مِنْ اللَّهِ أَحَدٌ وَلَنْ أَجِدَ مِنْ دُونِهِ مُلْتَحَدًا(
“বলুন, আমি তোমাদের ক্ষতি সাধন করার ও সুপথে আনয়ন করার মালিক নই। বলুন, আল্লাহর কবল থেকে আমাকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না এবং তিনি ব্যতীত আমি কোন আশ্রয়স্থল পাবনা।” (সূরা জ্বিনঃ ২১-২২) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর নিকটাত্মীয়দেরকে বলেছেনঃ
لَا أُغْنِي عَنْكُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا
“আমি তোমাদেরকে আল্লাহর পাকড়াও থেকে রক্ষা করতে পারব না।” নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (তাঁর বংশধর) তাঁর কন্যা ফাতেমা ও ফুফু সাফিয়াকে একই কথা বলেছেন।

যে ব্যক্তি তাকে নূরের তৈরী বলে বিশ্বাস করে, তাকে ইমাম নিয়োগ করা এবং তার পিছনে নামায আদায় করা বৈধ নয়।

প্রশ্নঃ (৪৮) ইমাম মাহদীর আগমণ সংক্রান্ত হাদীছগুলো কি ছহীহ?
উত্তরঃ মাহদী সম্পর্কে বর্ণিত হাদীছগুলো চারভাগে বিভক্ত।

১) মিথ্যা ও বানোয়াট হাদীছ
২) যঈফ হাদীছ
৩) হাসান হাদীছ,
৪) সহীহ হাদীছেও ইমাম মাহদীর আগমণের কথা বর্ণিত হয়েছে। তবে ইরাকের সিরদাব নামক স্থানে লুকায়িত রাফেজীদের কল্পিত মাহদীর সাথে হাদীছে বর্ণিত মাহদীর কোন সম্পর্ক নেই। এটি রাফেজীদের পক্ষ থেকে একটি বানোয়াট কাহিনী। ছহীহ হাদীছে যে মাহদীর কথা বলা হয়েছে, তিনি অন্যান্য বনী আদমের মতই একজন লোক হবেন। তিনি যথা সময়ে জম্ম গ্রহণ করবেন এবং মানব সমাজে আত্ম প্রকাশ করবেন। এটিই ইমাম মাহদীর প্রকৃত ঘটনা। সুতরাং ইরাকের সিরদাব অঞ্চলে লুকায়িত মাহদীর আগমণে বিশ্বাস করা মারাত্মক ভুল এবং বিবেক বহির্ভূত ও ভিত্তিহীন ব্যাপার। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর হাদীছে বর্ণিত ইমাম মাহদীর আগমণ সত্য।

প্রশ্নঃ (৪৯) ইয়াজুজ-মাজুজ কারা?
উত্তরঃ ইয়াজুজ মা’জুজ বনী আদমের অন্তর্ভুক্ত দু’টি জাতি। তারা বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহ তাআ’লা যুল-কারনাইনের ঘটনায় বলেনঃ
)حَتَّى إِذَا بَلَغَ بَيْنَ السَّدَّيْنِ وَجَدَ مِنْ دُونِهِمَا قَوْمًا لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ قَوْلًا قَالُوا يَاذَا الْقَرْنَيْنِ إِنَّ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ فَهَلْ نَجْعَلُ لَكَ خَرْجًا عَلَى أَنْ تَجْعَلَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ سَدًّا قَالَ مَا مَكَّنَنِي فِيهِ رَبِّي خَيْرٌ فَأَعِينُونِي بِقُوَّةٍ أَجْعَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا آتُونِي زُبَرَ الْحَدِيدِ حَتَّى إِذَا سَاوَى بَيْنَ الصَّدَفَيْنِ قَالَ انفُخُوا حَتَّى إِذَا جَعَلَهُ نَارًا قَالَ آتُونِي أُفْرِغْ عَلَيْهِ قِطْرًا  فَمَا اسْتَطَاعُوا أَنْ يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقْبًا قَالَ هَذَا رَحْمَةٌ مِنْ رَبِّي فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ وَكَانَ وَعْدُ رَبِّي حَقًّا(
“অবশেষে যখন তিনি দুই পর্বত প্রাচীরের মধ্যস্তলে পৌঁছলেন, তখন তিনি সেখানে এক জাতিকে পেলেন, যারা তাঁর কথা একেবারেই বুঝতে পারছিল না। তারা বলল, হে যুল-কারনাইন, ইয়াজুজ ও মা’জুজ দেশে অশান্তি সৃষ্টি করছে। আপনি বললে আমরা আপনার জন্য কিছু কর ধার্য করব এই শর্তে যে, আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রচীর নির্মাণ করে দিবেন। তিনি বললেন, আমার পালনকর্তা আমাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, তাই যথেষ্ট। অতএব, তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য কর। আমি তোমাদের ও তাদের মাঝে একটি সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করে দিব। তোমরা আমাকে লোহার পাত এনে দাও। অবশেষে যখন পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পূর্ণ হয়ে গেল, তখন তিনি বললেন, তোমরা হাঁপরে ফুঁক দিতে থাক। অবশেষে যখন তা আগুনে পরিণত হল , তখন তিনি বললেন, তোমরা গলিত তামা নিয়ে আস। আমি তা এর উপর ঢেলে দেই। অতঃপর ইয়াজুজ ও মাজুজের দল তার উপরে আরোহণ করতে পারলনা এবং তা ভেদ করতেও সক্ষম হলনা। যুল-কারনাইন বললেন, এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ। যখন আমার পালনকর্তার প্রতিশ্রুত সময় আসবে, তখন তিনি একে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন এবং আমার পালনকর্তার প্রতিশ্রুতি সত্য।” (সূরা কাহাফঃ ৯৩-৯৮) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ
يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى يَا آدَمُ فَيَقُولُ لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ وَالْخَيْرُ فِي يَدَيْكَ فَيَقُولُ أَخْرِجْ بَعْثَ النَّارِ قَالَ وَمَا بَعْثُ النَّارِ قَالَ مِنْ كُلِّ أَلْفٍ تِسْعَ مِائَةٍ وَتِسْعَةً وَتِسْعِينَ فَعِنْدَهُ يَشِيبُ الصَّغِيرُ ( وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدٌ ) قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَأَيُّنَا ذَلِكَ الْوَاحِدُ قَالَ أَبْشِرُوا فَإِنَّ مِنْكُمْ رَجُلًا وَمِنْ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ أَلْفًا
“আল্লাহ তাআ’লা কিয়ামতের দিন আদম (আঃ)কে ডাক দিবেন। আদম (আঃ) বলবেন হে আল্লাহ আমি আপনার দরবারে হাজির আছি। তখন আল্লাহ বলবেন, তোমার বংশধর থেকে জাহান্নামী দলকে পৃথক কর। আদম (আঃ) বলবেন, জাহান্নামের দল কারা? আল্লাহ বলবেন, প্রত্যেক এক হাজারের মধ্যে থেকে নয়শত নিরানব্বই জন। তখন কোলের শিশু বৃদ্ধ হয়ে যাবে। গর্ভবতী মহিলারা সন্তান প্রসব করে দেবে। মানুষদেরকে আপনি মাতাল অবস্থায় দেখবেন। অথচ তারা মাতাল নয়। আল্লাহর আযাব খুবই কঠিন। ছাহাবীগণ বললেন, আমাদের মধ্যে থেকে কে হবে সেই এক ব্যক্তি? নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, সুসংবাদ গ্রহণ কর, তোমাদের মধ্যে থেকে হবে সেই এক ব্যক্তি। আর বাকীরা হবে ইয়াজুজ-মাজুজের দল।”

   ইয়াজুজ-মাজুজের দল বের হয়ে আসা কিয়ামতের অন্যতম আলামত। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর যুগেই ইয়াজুজ-মাজুজ বের হওয়ার লক্ষণ প্রকাশিত হয়েছে। উম্মে হাবীবা (রাঃ) এর হাদীছে আছে, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা পেরেশান ও রক্তিম চেহারা নিয়ে আমাদের কাছে উপস্থিত হলেন। তিনি বলছিলেনঃ
)لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرٍّ قَدِ اقْتَرَبَ فُتِحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدْمِ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مِثْلُ هَذِهِ وَحَلَّقَ بِإِصْبَعَيْهِ الْإِبْهَامِ وَالَّتِي تَلِيهَا(
“লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আরবদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য। অকল্যাণ নিকটবর্তী হয়ে গেছে। ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীর এই পরিমাণ খুলে দেয়া হয়েছে। এই বলে তিনি হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনি আঙ্গুলি দিয়ে গোলাকৃতি করে দেখালেন।”

প্রশ্নঃ (৫০) নবীগণ কেন তাঁদের উম্মতকে দাজ্জালের ফিত্‌না থেকে সাবধান করেছেন? অথচ দাজ্জাল তো শেষ যামানাতেই বের হবে।
উত্তরঃ আদম সৃষ্টি থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে দাজ্জালের ফিত্‌না হচ্ছে সবচেয়ে বড় ফিতনা। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই সংবাদ দিয়েছেন। এই জন্য নূহ (আঃ) থেকে আরম্ভ করে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পর্যন্ত সকল নবীই তাঁদের সম্প্রদায়কে দাজ্জালের ভয় দেখিয়েছেন। যাতে তারা সাবধান থাকতে পারে এবং দাজ্জালের বিষয়টি তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে যায়। রাসূলদের দায়িত্ব ছিল উম্মতকে সকল প্রকার অনিষ্ট হতে সাবধান করা। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
إِنْ يَخْرُجْ وَأَنَا فِيكُمْ فَأَنَا حَجِيجُهُ دُونَكُمْ وَإِنْ يَخْرُجْ وَلَسْتُ فِيكُمْ فَامْرُؤٌ حَجِيجُ نَفْسِهِ وَاللَّهُ خَلِيفَتِي عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ
“আমি তোমাদের মধ্যে বর্তমান থাকাবস্থায় যদি দাজ্জাল বের হয়, তাহলে আমি একাই তার সাথে যুদ্ধ করব এবং তাকে প্রতিহত করব। আমি চলে গেলে যদি তার আগমণ ঘটে, তাহলে প্রতিটি ব্যক্তিই নিজেকে তার ফিতনা থেকে রক্ষা করবে। আমার পরে আল্লাহই প্রতিটি মুসলিমকে হেফাজত করবেন।”

   হাদীছে বর্ণিত হয়েছে যে আদম সৃষ্টির পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত দাজ্জালের ফিত্‌না পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বড় ফিতনা, তাই বিশেষভাবে নামাযের মধ্যে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাজ্জালের ফিত্‌না থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। তিনি শেষ বৈঠকে এই দু’আটিও পাঠ করতেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ
“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জাহান্নাম এবং কবরের আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আরো আশ্রয় প্রার্থনা করছি দাজ্জালের ফিত্‌না হতে।”

   দাজ্জাল শব্দটি (دجل) হতে নেয়া হয়েছে। এর অর্থ মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা ইত্যাদি। দাজ্জাল যেহেতু সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী এবং সবচেয়ে বড় প্রতারক। তাই তাকে দাজ্জাল বলে নাম রাখা হয়েছে।

প্রশ্নঃ (৫১) যারা পরকালের জীবনকে অবিশ্বাস করে এবং বলে এ বিশ্বাস মধ্যযুগের একটি কল্পকাহিনী ও কুসংস্কার মাত্র- এ ধরণের মানুষকে কিভাবে বুঝানো সম্ভব?
উত্তরঃ যে ব্যক্তি পরকালীন জীবনকে অস্বীকার করবে এবং বলবে এটি মধ্যযুগের কল্পিত কাহিনীমাত্র, সে কাফের। আল্লাহ বলেন,
)وَقَالُوا إِنْ هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا وَمَا نَحْنُ بِمَبْعُوثِينَ وَلَوْ تَرَى إِذْ وُقِفُوا عَلَى رَبِّهِمْ قَالَ أَلَيْسَ هَذَا بِالْحَقِّ قَالُوا بَلَى وَرَبِّنَا قَالَ فَذُوقُوا الْعَذَابَ بِمَا كُنتُمْ تَكْفُرُونَ(
“তারা বলে, আমাদের এ পার্থিব জীবনই জীবন। আমাদেরকে পুনরায় জীবিত হতে হবে না। আর যদি আপনি তাদেরকে দেখেন, যখন তাদেরকে প্রতিপালকের সামনে দাঁড় করানো হবে। তিনি বলবেন, এটা কি বাস্তব সত্য নয়? তারা বলবে, হ্যাঁ, আমাদের প্রতিপালকের কসম। তিনি বলবেন, অতএব স্বীয় কুফরের কারণে শাস্তি আস্বাদন কর।” (সূরা আনআ’মঃ ২৯-৩০) আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)وَيْلٌ يَوْمَئِذٍ لِلْمُكَذِّبِينَ الَّذِينَ يُكَذِّبُونَ بِيَوْمِ الدِّينِ وَمَا يُكَذِّبُ بِهِ إِلَّا كُلُّ مُعْتَدٍ أَثِيمٍ إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِ آيَاتُنَا قَالَ أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ كَلَّا إِنَّهُمْ عَنْ رَبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَمَحْجُوبُونَ ثُمَّ إِنَّهُمْ لَصَالُوا الْجَحِيمِ ثُمَّ يُقَالُ هَذَا الَّذِي كُنتُمْ بِهِ تُكَذِّبُونَ(
“সে দিন দুর্ভোগ মিথ্যারোপকারীদের। যারা প্রতিফল দিবসকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। প্রত্যেক সীমালংঘনকারী পাপীই কেবল একে মিথ্যারোপ করে। তার কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হলে সে বলে, ইহা পুরাতনকালের রূপকথা। কখনো না, বরং তারা যা করে, তাই তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে। কখনো না তারা সেদিন তাদের পালনকর্তা থেকে পর্দার অন্তরালে থাকবে। অতঃপর তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এরপর বলা হবে, একেই তো তোমরা মিথ্যারোপ করতে।” (সূরা আত্‌-তাতফীফঃ ১০-১৭) আল্লাহ তা’য়ালা আরো বলেনঃ
)بَلْ كَذَّبُوا بِالسَّاعَةِ وَأَعْتَدْنَا لِمَنْ كَذَّبَ بِالسَّاعَةِ سَعِيرًا(
“বরং তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করে। যে কিয়ামতকে অস্বীকার করে, আমি তার জন্য অগ্নি প্রস্তত করেছি।” (সূরা ফুরক্বানঃ ১১) আল্লাহ আরো বলেনঃ
)وَالَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِ اللَّهِ وَلِقَائِهِ أُوْلَئِكَ يَئِسُوا مِنْ رَحْمَتِي وَأُوْلَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ(
“যারা আল্লাহর আয়াতসমূহ এবং তাঁর সাক্ষাৎ অস্বীকার করে, তারাই আমার রহমত হতে নিরাশ হবে। তাদের জন্যই যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি রয়েছে।” (সূরা আনকাবুতঃ ২৩) যারা পরকালকে অবিশ্বাস করে তাদের কাছে নিম্নবর্ণিত দলীলসমূহ পেশ করা হবেঃ

প্রথমতঃ কিয়ামত এবং পরকালের বিষয়টি যুগে যুগে নবী ও রাসূলদের মাধ্যমে আসমানী কিতাবসমূহে মুতাওয়াতের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে এবং পূর্ববর্তী জাতিসমূহ তা কবূল করে নিয়েছে। অতএব তোমরা কিভাবে নবী-রাসূলদের কথা অমান্য করে পরকালকে অস্বীকার করতে পার? অথচ তোমরা দার্শনিক কিংবা কোন বাতিল ফির্কার প্রবর্তকের কথা বিশ্বাস করে থাক।

দ্বিতীয়তঃ কিয়ামত হওয়ার বিষয়টি বিবেক দ্বারাও স্বীকৃত এবং সমর্থিত। তা কয়েকভাবে হতে পারেঃ

১) প্রত্যেকেই স্বীকার করে যে, সে অসি-ত্বহীন থেকে অসি-ত্বে এসেছে। যিনি প্রথমবার অসি-ত্বহীন থেকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে সক্ষম। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ 
)وَهُوَ الَّذِي يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَهُوَ أَهْوَنُ عَلَيْهِ(
“তিনিই প্রথমবার সৃষ্টিকে অসি-ত্বে আনয়ন করেন, অতঃপর পুনর্বার তিনি সৃষ্টি করবেন। এটা তাঁর জন্য তুলনা মূলক বেশী সহজ।” (সূরা রূমঃ ২৭) আল্লাহ তাআ’লা আরো বলেনঃ
)كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَاعِلِينَ(
“যেভাবে আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব।” (সূরা আম্বিয়াঃ ১০৪)

২) আকাশ-জমিনের সৃষ্টির বড়ত্ব ও অভিনবত্বকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। যিনি এ দু’টিকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি মানুষ সৃষ্টি করতে এবং পুনরায় তাদের প্রথমবারের মত সৃষ্টি করতে সক্ষম। আল্লাহ বলেন,
)لَخَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَكْبَرُ مِنْ خَلْقِ النَّاسِ(
“নিশ্চয় আকাশ-জমিনের সৃষ্টি মানুষ সৃষ্টির চেয়ে অনেক বড়।” (সূরা গাফেরঃ ৫৭) আল্লাহ আরো বলেনঃ
)أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللَّهَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَلَمْ يَعْيَ بِخَلْقِهِنَّ بِقَادِرٍ عَلَى أَنْ يُحْيِيَ الْمَوْتَى بَلَى إِنَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ(
“তারা কি জানে না যে, তিনিই আল্লাহ, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করেছেন তিনি এবং এ গুলোর সৃষ্টিতে কোন ক্লান্তিবোধ করেন নি, তিনি মৃতকে জীবিত করতে সক্ষম? কেন নয়, নিশ্চয়ই তিনি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।” (সূরা আহক্বাফঃ ৩৩) আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)أَوَلَيْسَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِقَادِرٍ عَلَى أَنْ يَخْلُقَ مِثْلَهُمْ بَلَى وَهُوَ الْخَلاقُ الْعَلِيمُ إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ(
“যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি তাদের অনুরূপ সৃষ্টি করতে সক্ষম নন? হ্যাঁ, তিনি মহাস্রষ্টা, সর্বজ্ঞ। তিনি যখন কোন কিছু করতে ইচ্ছা করেন, তখন তাকে বলে দেন, হও তখনই তা হয়ে যায়।” (সূরা ইয়াসীনঃ ৮১-৮২)

৩) প্রত্যেক দৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তি জমিনকে মৃত অবস্থায় দেখে। বৃষ্টি বর্ষিত হওয়ার সাথে সাথে তা উর্বর হয়ে উঠে এবং সেখানে নানা প্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়। যিনি মৃত জমিনকে জীবিত করতে পারেন, তিনি মৃত মানুষকেও পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম। আল্লাহ বলেনঃ
)وَمِنْ آيَاتِهِ أَنَّكَ تَرَى الْأَرْضَ خَاشِعَةً فَإِذَا أَنزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ إِنَّ الَّذِي أَحْيَاهَا لَمُحْيِي الْمَوْتَى إِنَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ(
“তাঁর এক নিদর্শন এই যে, তুমি ভূমিকে দেখবে অনুর্বর অবস্থায় পড়ে আছে। অতঃপর আমি যখন তার উপর বৃষ্টি বর্ষণ করি, তখন শস্যশ্যামল ও স্ফীত হয়ে উঠে। নিশ্চয় যিনি একে জীবিত করেন, তিনি জীবিত করবেন মৃতদেরকেও। নিশ্চয় তিনি সব কিছু করতে সক্ষম।” (সূরা হা-মীম সাজদাহঃ ৩৯)

৪) বিভিন্ন বাস্তব ঘটনা, যা আল্লাহ তাআ’লা আমাদের জন্য বর্ণনা করেছেন, তা পুনরুত্থান সম্ভব হওয়ার সত্যতা প্রমাণ বহন করে। সূরা বাকারাতে এধরণের পাঁচটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেনঃ
)أَوْ كَالَّذِي مَرَّ عَلَى قَرْيَةٍ وَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَى عُرُوشِهَا قَالَ أَنَّى يُحْيِي هَذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا فَأَمَاتَهُ اللَّهُ مِائَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ قَالَ كَمْ لَبِثْتَ قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ قَالَ بَلْ لَبِثْتَ مِائَةَ عَامٍ فَانظُرْ إِلَى طَعَامِكَ وَشَرَابِكَ لَمْ يَتَسَنَّهْ وَانظُرْ إِلَى حِمَارِكَ وَلِنَجْعَلَكَ آيَةً لِلنَّاسِ وَانظُرْ إِلَى الْعِظَامِ كَيْفَ نُنشِزُهَا ثُمَّ نَكْسُوهَا لَحْمًا فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ قَالَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ(
“তুমি কি সে লোককে দেখনি যে এমন এক জনপদ দিয়ে যাচ্ছিল, যা ছিল জনমানব শুণ্য, দেয়ালগুলো বিধ্বস্ত ছাদের উপর পড়ে ছিল? বলল, কেমন করে আল্লাহ মরণের পর এই জনপদকে পুনরায় জীবিত করবেন? অতঃপর আল্লাহ তাকে মৃত অবস্থায় রাখলেন একশ বছর। তারপর তাকে উঠালেন। বললেন, কত কাল এভাবে ছিলে? বলল, আমি ছিলাম একদিন কিংবা একদিনের কিছু সময়। বললেন, তা নয়, বরং তুমি তো একশ বছর ছিলে। এবার চেয়ে দেখ নিজের খাবার ও পানীয়ের দিকে। সেগুলো পচে যায়নি এবং দেখ নিজের গাধাটির দিকে। আর আমি তোমাকে মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত বানাতে চেয়েছি। আর হাড়গুলোর দিকে চেয়ে দেখ, আমি এগুলোকে কেমন করে জুড়ে দেই এবং সেগুলোর উপর মাংসের আবরণ পরিয়ে দেই। অতঃপর যখন তার উপর এ অবস্থা প্রকাশিত হল, তখন বলে উঠল আমি জানি, নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।” (সূরা বাক্বারাঃ ২৫৯)

৫) প্রতিটি ব্যক্তি স্বীয় কর্মের যথাযথ প্রতিদান পাওয়ার জন্য পুনরুত্থান আবশ্যক। তা না হলে মানুষ সৃষ্টির কোন মূল্য থাকে না এবং পার্থিব জীবনে মানুষ ও পশুর মাঝেও কোন পার্থক্য থাকে না। আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
)أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ فَتَعَالَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ(
“তোমরা কি ধারণা কর যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না। অতএবর্ মহিমান্বিত আল্লাহ, তিনি সত্যিকার মালিক, তিনি ব্যতীত সত্য কোন মা’বূদ নেই। তিনি সম্মানিত আরশের মালিক।” (সূরা মু’মিনূনঃ ১১৫-১১৬) আল্লাহ আরো বলেনঃ
)إِنَّ السَّاعَةَ آتِيَةٌ أَكَادُ أُخْفِيهَا لِتُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا تَسْعَى(
“কিয়ামত অবশ্যই আসবে, আমি তা গোপন রাখতে চাই যাতে প্রত্যেকেই তার কর্মানুযায়ী ফল লাভ করে।” (সূরা ত্বো-হাঃ ১৫) আল্লাহ আরো বলেনঃ
)وَأَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَا يَبْعَثُ اللَّهُ مَنْ يَمُوتُ بَلَى وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ الَّذِي يَخْتَلِفُونَ فِيهِ وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّهُمْ كَانُوا كَاذِبِينَ إِنَّمَا قَوْلُنَا لِشَيْءٍ إِذَا أَرَدْنَاهُ أَنْ نَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ(
“তারা আল্লাহর নামে কঠোর শপথ করে যে, যার মৃত্যু হয় আল্লাহ তাকে পুনরুজ্জীবিত করবেন না। অবশ্যই এর পাকাপোক্ত ওয়াদা হয়ে গেছে। কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না। তিনি পুনরুজ্জীবিত করবেনই, যাতে যে বিষয়ে তাদের মধ্যে মতানৈক্য ছিল তা প্রকাশ করা যায় এবং কাফেরেরা জেনে নেয় যে, তারা মিথ্যাবাদী ছিল। আমি যখন কোন কিছু করার ইচ্ছা করি, তখন তাকে কেবল এতটুকুই বলি যে, হয়ে যাও, তখনই তা হয়ে যায়।” (সূরা নাহলঃ ৩৮-৪০) আল্লাহ বলেনঃ
)زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنْ لَنْ يُبْعَثُوا قُلْ بَلَى وَرَبِّي لَتُبْعَثُنَّ ثُمَّ لَتُنَبَّؤُنَّ بِمَا عَمِلْتُمْ وَذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ(
“কাফেরেরা দাবী করে যে, তারা কখনো পুনরুত্থিত হবে না। বলুন, অবশ্যই হবে, আমার পালনকর্তার কসম, তোমরা নিশ্চয় পুনরুত্থিত হবে। অতঃপর তোমাদেরকে অবহিত করা হবে যা তোমরা করতে। এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।” (সূরা তাগাবুনঃ ৭)

   পুনরুত্থান অস্বীকারকারীদের জন্য উপরোক্ত প্রমাণগুলো পেশ করার পরও যদি তারা অস্বীকার করে, তাহলে তারা অতিসত্বরই তাদের পরিণতি সম্পর্কে অবহিত হবে।

প্রশ্নঃ (৫২) কবরের আযাব কি সত্য?
উত্তরঃ কুরআনের প্রকাশ্য আয়াত, সুস্পষ্ট সুন্নাত এবং মুসলমানদের ঐকমত্যে কবরের আযাব সত্য। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
تَعَوَّذُوا بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ تَعَوَّذُوا بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ تَعَوَّذُوا بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ
“তোমরা কবর আযাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর। তোমরা কবর আযাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর। তোমরা কবর আযাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর। কথাটি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তিনবার বলেছেন।”

   সকল মুসলমানই নামাযে বলে,
أَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ وَ مِنْ عَذَابِ القَبْرِ
“আমি আল্লাহর কাছে জাহান্নামের আযাব এবং কবরের আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” সাধারণ মানুষ এবং আলেম-উলামা সবাই এই দু’আটি পাঠ করে থাকে।

   আল্লাহ তাআ’লা কুরআনে বলেনঃ
)النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ(
“সকালে ও সন্ধ্যায় তাদেরকে আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন আদেশ করা হবে, ফেরাউন গোত্রকে কঠিনতম আযাবে প্রবেশ করাও।” (সূরা গাফেরঃ ৪৬) কোন সন্দেহ নেই যে, তাদেরকে আনন্দ-ফুর্তি করার জন্য জাহান্নামের আগুনের উপরে পেশ করা হবে না; বরং তার আযাব ভোগ করার জন্য।

   আল্লাহ বলেনঃ
)وَلَوْ تَرَى إِذْ الظَّالِمُونَ فِي غَمَرَاتِ الْمَوْتِ وَالْمَلَائِكَةُ بَاسِطُوا أَيْدِيهِمْ أَخْرِجُوا أَنفُسَكُمْ الْيَوْمَ تُجْزَوْنَ عَذَابَ الْهُونِ بِمَا كُنتُمْ تَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ غَيْرَ الْحَقِّ وَكُنتُمْ عَنْ آيَاتِهِ تَسْتَكْبِرُونَ(
“আপনি যদি জালিমদেরকে ঐ সময়ে দেখতে পেতেন, যখন তারা মৃত্যু যন্ত্রনায় থাকবে এবং ফেরেশতাগণ তাদের হাত বাড়িয়ে বলবেন, তোমরা নিজেরাই নিজেদের প্রাণ বের করে আন। তোমাদের আমলের কারণে আজ তোমাদেরকে অবমাননাকর আযাব দেয়া হবে। কারণ তোমরা আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করেছিলে এবং তোমরা তাঁর আয়াতের বিরুদ্ধে অহংকার করেছিলে।” (সুরা আনআ’মঃ ৯৩) আর এই আয়াতের মধ্যে ‘আজ’ বলতে মৃত্যুর দিনকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং প্রমাণিত হল যে, কুরআন, সুন্নাহ এবং মুসলমানদের ঐক্যমতে কবরের আযাব সত্য।

প্রশ্নঃ (৫৩) মৃত লাশকে যদি হিংস্র পশুরা খেয়ে ফেলে কিংবা আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে বাতাসে উড়িয়ে দেয়া হয় তবেও কি কবরের আযাব হবে?
উত্তরঃ অবশ্যই হবে। কারণ আযাব হবে রূহের উপর। কেননা শরীর তো মাটির সাথে মিশে যাবে। তাছাড়া যেহেতু বিষয়টি গায়েবের সাথে সম্পৃক্ত, তাই এ কথা বলা যাবে না যে, দেহের কোন আযাবই হবে না। যদিও তা নষ্ট হয়ে গেছে বা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বিষয়টি পরকালের সাথে সম্পৃক্ত। দুনিয়াতে দৃশ্যমান কোন বস্তর সাথে পরকালের গায়েবী বিষয়ের তুলনা চলেনা।

প্রশ্নঃ (৫৪) এক শ্রেণীর লোক কবরের আযাব অস্বীকার করার পক্ষে দলীল পেশ করে যে, কবর খনন করলে দেখা যায় লাশ রয়ে গেছে, কোন পরিবর্তন হয়নি এবং কবর সংকীর্ণ অথবা প্রশস্তও হয়নি। আমরা কিভাবে তাদের উত্তর দিব?
উত্তরঃ আমরা বলব কবরের আযাব কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে সত্য বলে প্রমাণিত। আল্লাহ তাআ’লা বলেন,
)النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ(
“সকালে ও সন্ধ্যায় তাদেরকে আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন আদেশ করা হবে, ফেরাউন গোত্রকে কঠিনতম আযাবে প্রবেশ করাও।” (সূরা গাফেরঃ ৪৬) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
فَلَوْلا أَنْ لا تَدَافَنُوا لَدَعَوْتُ اللَّهَ أَنْ يُسْمِعَكُمْ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ الَّذِي أَسْمَعُ مِنْهُ ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَيْنَا بِوَجْهِهِ فَقَالَ تَعَوَّذُوا بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ النَّارِ قَالُوا نَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ النَّارِ فَقَالَ تَعَوَّذُوا بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ قَالُوا نَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ
“তোমরা যদি দাফন না করতে, তাহলে আমি তোমাদেরকে কবরের আযাব শুনানোর জন্য আল্লাহর কাছে দু’আ করতাম, যা আমি নিজে শ্রবণ করে থাকি। অর্থাৎ তোমরা যেহেতু একে অপরকে দাফন করে থাক, তাই আমি তোমাদেরকে কবরের আযাব শুনানোর জন্য আল্লাহর কাছে দু’আ করা বাদ দিলাম। কারণ তোমরা কবরের আযাব শুনতে পেলে দাফন করা বাদ দিবে। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, তোমরা আল্লাহর কাছে জাহান্নামের আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা কর। ছাহাবীগণ বললেনঃ
نَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ النَّار
আমরা আল্লাহর কাছে কবরের আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তারপর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তোমরা কবরের আযাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর। ছাহাবীগণ বললেনঃ
نَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ عَذَابِ النَّارِ
আমরা আল্লাহর কাছে কবরের আযাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মু’মিন ব্যক্তি সম্পর্কে বলেছেনঃ
يُفْسَحُ لَهُ فِى قَبْرِهِ مَدَّ بَصَرِهِ
“তার কবরকে চোখের দৃষ্টি সীমা পর্যন্ত প্রশস্ত করে দেয়া হয়।”

   এমনি আরো অনেক দলীল রয়েছে, যা শুধুমাত্র ধারণার উপর ভিত্তি করে প্রত্যাখ্যান করা মোটেই জায়েয নয়; বরং তা নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করে নেয়া আবশ্যক। তাছাড়া কবরের আযাব হবে রূহের উপরে। শরীরের উপরে নয়। শরীরের উপরে হলে তা দেখা যেত, তখন বিষয়টি গায়েবের উপর ঈমানের অন্তর্ভুক্ত হতনা। কিন্তু কবরের আযাবের বিষয়টি আলমে বরযখের তথা মৃত্যু পরবর্তী জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। দুনিয়ার প্রকাশ্য বিষয়াদি দ্বারা এটাকে উপলব্ধি করা যাবে না।

   কবরের আযাব, শান্তি, কবরের প্রশস্ততা এবং সংকীর্ণতা এসব বিষয় কেবলমাত্র মৃত ব্যক্তিই অনুভব করতে পারে। অন্য কেউ নয়। কখনো কখনো মানুষ স্বপ্নে দেখে যে, সে কোথাও যাচ্ছে, আকাশে উড়ছে, কাউকে প্রহার করছে কিংবা তাকে কেউ প্রহার করছে। আরো দেখে যে, সে এক সংকীর্ণময় স্থানে আছে অথবা প্রশস্ত কোন স্থানে আনন্দময় জীবন যাপন করছে। অথচ ঘুমন্ত ব্যক্তির পাশের লোকেরা কিছুই অনুভব করতে পারে না। সুতরাং আমাদের উচিৎ এই সমস্ত বিষয়ে শ্রবণ করা, বিশ্বাস করা এবং সেগুলোর আনুগত্য করা।

প্রশ্নঃ (৫৫) পাপী মুমিনের কবরের আযাব কি হালকা করা হবে?
উত্তরঃ হ্যাঁ, কখনো কখনো কবরের আযাব হালকা করা হবে। কারণ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা দু’টি কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি বললেন, এ দু’জনকে কবরের মধ্যে আযাব দেয়া হচ্ছে, তবে বড় কোন অপরাধের কারণে আযাব দেয়া হচ্ছে না। তাদের একজন পেশাব থেকে ভালরূপে পবিত্রতা অর্জন করত না, আর দ্বিতীয়জন চুগলখোরী করত অর্থাৎ একজনের কথা অন্য জনের কাছে লাগাতো। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি তাজা খেজুরের শাখা নিয়ে দু’ভাগে ভাগ করে প্রত্যেক কবরের উপরে একটি করে পুঁতে দিয়ে বললেন, সম্ভবত খেজুরের শাখা দু’টি শুকানোর পূর্ব পর্যন্ত তাদের কবরের আযাব হালকা করা হবে। এ হাদীছের মাধ্যমে জানা যায় যে, আযাব কখনো হালকা করা হয়। তবে প্রশ্ন রয়ে যায় যে, আযাব হালকা হওয়ার সাথে খেজুরের শাখার সম্পর্ক কি?

   উত্তরে বলা যায় যে, খেজুরের শাখা তাজা থাকাকালে আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করবে। তাসবীহ মৃতের কবরের আযাব হালকা করে থাকে। এর উপর ভিত্তি করে আযাব হালকা হওয়ার আশায় কেউ যদি কবরের পাশে তাসবীহ পাঠ করে, তাহলে জায়েয হবে না। কোন কোন আলেম বলেছেন, তাজা খেজুরের শাখা তাসবীহ পাঠ করে বলে আযাব হালকা করা হয়, এই কারণটি দুর্বল। তাজা বা শুকনো সকল বস্তই আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করে থাকে। আল্লাহ বলেনঃ
)تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لَا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ(
“সপ্ত আকাশ ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে সব কিছু তাঁরই তাসবীহ পাঠ করে অর্থাৎ- পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। এমন কিছু নেই যা তাঁর প্রশংসা ও মহিমা ঘোষণা করে না।” (সূরা বানী ইসরাঈলঃ ৪৪) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাথরের তাসবীহ শুনতে পেতেন। অথচ পাথর জড় পদার্থের অন্তর্ভুক্ত। তাহলে আযাব হালকা করার মূল কারণ কি?

   উত্তরে বলা যায় যে, তিনি খেজুরের শাখা দু’টি সজিব থাকা পর্যন্ত কবরের আযাব হালকা করার জন্য দু’আ করেছিলেন। বুঝা গেল শাস্তি মুলতবী থাকার সময়সীমা বেশী দিন দীর্ঘ ছিলনা। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের এ দু’টি কর্ম মানুষকে সাবধান করার জন্যই এরকম করেছিলেন। কারণ তাদের কাজ দু’টি কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাদের একজন পেশাব থেকে ভালরূপে পবিত্রতা অর্জন করতনা। অন্যজন মানুষের মাঝে ঝগড়া-ফাসাদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগাতো। এটা করা কবীরা গুনাহ। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর উম্মতকে সতর্ক করার জন্য সাময়িক সুপারিশ করেছেন।

   কতক আলেম বলেছেন, কবরের আযাব হালকা করার জন্য কবরের উপরে খেজুরের শাখা অথবা গাছ পুঁতে রাখা সুন্নাত। কিন্তু এ ধরণের দলীল গ্রহণ সঠিক নয়। কারণঃ-

১) এ কবরবাসীকে আযাব দেয়া হচ্ছে কি না তা আমরা জানিনা, কিন্তু নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা জানতে পেরেছন।
২) আমরা যদি কবরের উপরে তা রাখি, তাহলে আমরা মৃতের উপরে খারাপ আচরণ ও মন্দ ধারণা পোষণ করলাম। আমরা জানি না হতে পারে সে শান্তিতে আছে। হতে পারে আল্লাহ তাআ’লা অনুগ্রহ করে মৃত্যুর পূর্বে তাকে তাওবা করার তাওফীক দিয়েছেন। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাই সে আযাব থেকে রেহাই পেয়ে গেছে।
৩) সালাফে ছালেহীনের কেউ কোন কবরের উপরে খেজুরের শাখা রাখতেন না। অথচ তারা আল্লাহর শরীয়ত সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানী ছিলেন।
৪) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে খেজুরের শাখা পুঁতে রাখার চেয়ে ভাল জিনিষ শিক্ষা দিয়েছেন। মৃত ব্যক্তির দাফন সমাধা করার পর তিনি বলতেনঃ
اسْتَغْفِرُوا لِأَخِيكُمْ وَسَلُوا لَهُ بِالتَّثْبِيتِ فَإِنَّهُ الْآنَ يُسْأَلُ
তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তার জন্য ঈমানের উপর অটল থাকার তাওফীক কামনা কর। কেননা তাকে এখনই জিজ্ঞাসা করা হবে।

প্রশ্নঃ (৫৬) শাফায়াত কাকে বলে? তা কত প্রকার ও কি কি?
উত্তরঃ শাফায়াত শব্দটির আভিধানিক অর্থ মিলিয়ে নেয়া, নিজের সাথে একত্রিত করে নেয়া। শরীয়তের পরিভাষায় কল্যাণ লাভ অথবা অকল্যাণ প্রতিহত করার আশায় অপরের জন্য মধ্যস্ততা করাকে শাফায়াত বলে। শাফায়াত দু’প্রকার। যথাঃ-

প্রথমতঃ শরীয়ত সম্মত শাফায়াত। কুরআন ও সুন্নাহয় এ প্রকার শাফায়াতের বর্ণনা এসেছে। তাওহীদপন্থীগণ এ ধরণের শাফায়াতের হকদার হবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে জিজ্ঞাসা করলেনঃ
مَنْ أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِكَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَقَدْ ظَنَنْتُ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ أَنْ لَا يَسْأَلُنِي عَنْ هَذَا الْحَدِيثِ أَحَدٌ أَوَّلُ مِنْكَ لِمَا رَأَيْتُ مِنْ حِرْصِكَ عَلَى الْحَدِيثِ أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ أَوْ نَفْسِهِ
“কিয়ামতের দিন কোন্‌ ব্যক্তি আপনার শাফায়াতের বেশী হকদার হবে? নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, হে আবু হুরায়রা! তোমার হাদীছ শেখার আগ্রহ দেখে আমার ধারণা ছিল যে, তোমার পূর্বে এ বিষয় সম্পর্কে কেউ জিজ্ঞাসা করবে না। যে ব্যক্তি অন্তর থেকে ইখলাসের সাথে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করবে, কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তি আমার শাফায়াতের সবচেয়ে বেশী হকদার হবে। এ প্রকার শাফায়াতের জন্য ৩টি শর্ত রয়েছে।

১- শাফায়াতকারীর উপর আল্লাহর সন'ষ্টি থাকা।
২- যার জন্য সুপারিশ করা হবে, তার উপরও আল্লাহর সন'ষ্টি থাকা।
৩- শাফায়াতকারীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে শাফায়াত করার অনুমতি থাকা।

   আল্লাহ তাআ’লা এই শর্তগুলো কুরআন মজীদে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেনঃ
)وَكَمْ مِنْ مَلَكٍ فِي السَّمَاوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَنْ يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَرْضَى(
“আকাশে অনেক ফেরেশতা রয়েছেন, যাদের কোন সুপারিশ ফলপ্রসু হয়না। কিন্তু আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা ও যাকে পছন্দ করেন এবং যাকে শাফায়াত করার অনুমতি দেন তার কথা ভিন্ন।” (সূরা নাজ্‌মঃ ২৬) আল্লাহ বলেনঃ
)مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ(
“কে এমন আছে যে, সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া?” (সূরা বাকারাঃ ২৫৫) আল্লাহ বলেনঃ
)يَوْمَئِذٍ لَا تَنفَعُ الشَّفَاعَةُ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَانُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلًا(
“দয়াময় আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন এবং যার কথায় সন্তুষ্ট হবেন সে ছাড়া কারও সুপারিশ সেদিন কোন উপকারে আসবে না।” (সূরা ত্বো-হাঃ ১০৯) আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنْ ارْتَضَى(
“তারা শুধু তাদের জন্যে সুপারিশ করবেন, যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট।” (সূরা আন্বীয়াঃ ২৮) সুতরাং শাফায়াত পাওয়ার জন্য উপরোক্ত তিনটি শর্ত থাকা আবশ্যক। এই শাফায়ত আবার দু’প্রকারঃ

১) সাধারণ শাফায়াতঃ সাধারণ শাফায়াতের অর্থ হল, সৎ বান্দাদের মধ্যে থেকে যাকে ইচ্ছা এবং যার জন্য ইচ্ছা আল্লাহ শাফায়াত করার অনুমতি দিবেন। এই ধরণের শাফায়াত আল্লাহর অনুমতি পেয়ে আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), অন্যান্য নবী-রাসূল, সত্যবাদীগণ, শহীদগণ এবং নেককারগণ করবেন। তাঁরা পাপী মুমিনদেরেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বের করে আনার ব্যাপারে সুপারিশ করবেন।

২) বিশেষ ও নির্দিষ্ট সুপারিশঃ এই ধরণের শাফায়াত নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর জন্য নির্দিষ্ট। এই শাফায়াতের মধ্যে সবচেয়ে বড় হল হাশরের মাঠের শাফায়াত। হাশরের মাঠে মানুষ যখন বিপদে পড়ে যাবে এবং অসহনীয় আযাবে গ্রেপ্তার হবে, তখন তারা একজন সুপারিশকারী খুঁজে ফিরবে। যাতে করে তারা এই ভীষণ সংকট থেকে রেহাই পেতে পারে। প্রথমে তারা আদম (আঃ)এর কাছে গমণ করবে। অতঃপর পর্যায়ক্রমে নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা (আঃ)এর কাছে যাবে। তাঁরা কেউ সুপারিশ করতে সাহস করবেন না। অবশেষে তারা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর কাছে আসবে। তিনি মানুষকে এই বিপদজনক অবস্থা হতে মুক্ত করার জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেন। আল্লাহ তাঁর দু’আ এবং শাফায়াত কবূল করবেন। এটিই হল সুমহান মর্যাদা, যা আল্লাহ তাকে দান করেছেন। আল্লাহ বলেনঃ
)وَمِنْ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَكَ عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُودًا(
“আপনি রাত্রির কিছু অংশ জাগ্রত থেকে আল্লাহর এবাদতে মশগুল থাকুন। এটা আপনার জন্য অতিরিক্ত (নফল ইবাদত)। আপনার পালনকর্তা অচিরেই আপনাকে সুমহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবেন।” (সূরা বানী ইসরাঈলঃ ৭৯)

   নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে সমস্ত সুপারিশ করবেন, তার মধ্যে জান্নাতবাসীদের জন্য জান্নাতে প্রবেশ করানোর সুপারিশ অন্যতম। জান্নাতবাসীগণ যখন পুলসিরাত পার হবে, তখন জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে একটি সেতুর উপরে আটকানো হবে। সেখানে তাদের পারস্পরিক জুলুম-নির্যাতনের প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ দেয়া হবে। প্রতিশোধ নেয়া ও পারস্পরিক জুলুম-নির্যাতন হতে পবিত্র করার পর জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর সুপারিশক্রমে বেহেশতের দরজা খোলা হবে।

দ্বিতীয়তঃ শরীয়ত বিরোধী শাফায়াতঃ এধরণের শাফায়াত কোন কাজে আসবে না। মুশরেকরা আল্লাহর নিকটে তাদের বাতিল মা’বূদদের কাছ থেকে এধরণের শাফায়াতের আশা করে থাকে। অথচ এই শাফায়াত তাদের কোন কাজে আসবে না। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)فَمَا تَنْفَعُهُمْ شَفَاعَةُ الشَّافِعِينَ(
“কোন সুপারিশকারীর সুপারিশ তাদের উপকারে আসবে না।” (সূরা মুদ্দাস্‌সিরঃ ৪৮) কারণ আল্লাহ তাআ’লা মুশরিকদের শির্কের উপরে সন্তুষ্ট নন। তাদের জন্য শাফায়াতের অনুমতি দেয়াও সম্ভব নয়। আল্লাহ যার উপর সন্তুষ্ট হবেন, কেবল তার জন্যই সুপারিশ বৈধ। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য ফাসাদ ও কুফরী পছন্দ করেন না। মুশরিকরা কি যুক্তিতে মূর্তী পূজা করত তা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেনঃ
)هَؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ(
“এরা আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে।” (সূরা ইউনুসঃ ১৮) সুতরাং মুশরিকরা তাদের বানোয়াট মূর্তিদের উপাসনা করার পিছনে যুক্তি ছিল যে, মূর্তিরা তাদের জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে। এটা তাদের মূর্খতার পরিচয়। কারণ তারা এমন জিনিষের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের চেষ্টা করে, যা তাদেরকে আল্লাহ থেকে আরো দূরে সরিয়ে দেয়।

প্রশ্নঃ (৫৭) মুমিনদের শিশু বাচ্চাদের পরিণাম কি? মুশরিকদের যে সমস্ত শিশু প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পূর্বে মৃত্যু বরণ করে, তাদের অবস্থা কি হবে?
উত্তরঃ মুমিনদের শিশু সন্তানগণ তাদের পিতাদের অনুসরণ করে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আল্লাহ বলেনঃ
)وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُمْ مِنْ عَمَلِهِمْ مِنْ شَيْءٍ كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ(
“যারা ঈমানদার এবং তাদের সন্তানরা ঈমানে তাদের অনুগামী, আমি তাদেরকে তাদের পিতৃপুরুষদের সাথে মিলিত করে দেব এবং তাদের আমল বিন্দুমাত্রও হ্রাস করব না। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কর্মের জন্য দায়ী হবে।” (সূরা তূরঃ ২১)

   অমুসলিমদের নাবালক শিশুদের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ কথা হল, আমরা বলব আল্লাহই ভাল জানেন বড় হলে তারা কি আমল করত। দুনিয়ার বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে তারা তাদের পিতা-মাতাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। আর আখেরাতে তাদের অবস্থা কি হবে আল্লাহই ভাল জানেন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে এ কথাই বর্ণিত হয়েছে। পরকালে তাদের কি হবে সেটা জানার ভিতরে আমাদের কোন লাভ নেই। দুনিয়াতে তাদের বিধান হল, তারা প্রাপ্ত বয়স্ক মুশরিকদের মতই হবে। মারা গেলে তাদেরকে গোসল দেয়া হবে না, কাফন পরানো হবে না, তাদের উপর জানাযার নামায পড়া হবে না এবং মুসলমানদের গোরস্থানে দাফন করা হবে না।

প্রশ্নঃ (৫৮) জান্নাতে পুরুষদের জন্য হুর থাকার কথা বলা হয়েছে। প্রশ্ন হল মহিলাদের জন্য কি আছে?
উত্তরঃ-জান্নাতীদের নেয়ামত বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেনঃ
)وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ (
“সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য আছে, যা তোমরা দাবী কর।” (সূরা হা-মীম সিজদাহঃ ৩১-৩২) আল্লাহ আরো বলেনঃ
)وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيهِ الْأَنفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ وَأَنْتُمْ فِيهَا خَالِدُونَ(
“এবং তথায় রয়েছে মন যা চায় এবং নয়ন যাতে তৃপ্ত হয়। তোমরা সেখানে চিরকাল থাকবে।” (সূরা যুখরুফঃ ৭১)

   ইহা জানা কথা যে, মন যা চায়, তার মধ্যে সর্বোত্তম হল বিবাহ করার মনোবাসনা। তা জান্নাতীদের জন্য অর্জিত হবে। চাই পুরুষ হোক কিংবা মহিলা হোক। মহিলাকে আল্লাহ তাআ’লা জান্নাতে তাঁকে তাঁর দুনিয়ার স্বামীর সাথে বিবাহ দিয়ে দিবেন। যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)رَبَّنَا وَأَدْخِلْهُمْ جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدْتَهُم وَمَنْ صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ(
“হে আমাদের পালনকর্তা! আর তাদেরকে প্রবেশ করাও চিরকাল বসবাসের জান্নাতে, যার ওয়াদা আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের বাপ-দাদা, পতি-পত্নী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করে তাদেরকে। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা গাফেরঃ ৮) আর দুনিয়াতে যদি অবিবাহিত থাকে তাহলে জান্নাতে তার নয় জুড়ানো কোন পুরুষের সাথে বিবাহের ব্যবস্থা করবেন।

প্রশ্নঃ (৫৯) জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসী হবে মহিলা- কথাটি কি ঠিক? ঠিক হয়ে থাকলে কারণ কি?
উত্তরঃ জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসী হবে মহিলা- কথাটি ঠিক। কেননা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা খুৎবা প্রদানের সময় তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন,
)يَا مَعْشَرَ النِّسَاءِ تَصَدَّقْنَ فَإِنِّي أُرِيتُكُنَّ أَكْثَرَ أَهْلِ النَّارِ فَقُلْنَ وَبِمَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ تُكْثِرْنَ اللَّعْنَ وَتَكْفُرْنَ الْعَشِيرَ(
“হে নারী সমাজ! তোমরা বেশী করে সাদকা কর। কারণ আমি জাহান্নামের অধিকাংশকেই দেখেছি তোমাদের মধ্যে থেকে। জাহান্নামের অধিকংশ অধিবাসী কেন মহিলাদের মধ্যে থেকে হবে- এই প্রশ্ন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে করা হয়েছিল। তিনি বলেছেন, তোমরা বেশী পরিমাণে মানুষের উপরে অভিশাপ করে থাক এবং স্বামীর সদাচরণ অস্বীকার কর।” নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই হাদীছে নারীদের বেশী হারে জাহান্নামে যাওয়ার কারণ বর্ণনা করেছেন। তারা বেশী পরিমাণে মানুষকে গালি-গালাজ করে, অভিশাপ করে, এবং স্বামীর অকৃতজ্ঞ হয়।

প্রশ্নঃ (৬০) পথভ্রষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় যারা তাকদীরের মাসআলাসহ আকীদার বিভিন্ন বিষয় পাঠ করা পছন্দ করেন না, তাদের জন্য আপনার উপদেশ কি?
উত্তরঃ তাকদীরের বিষয়টি আকীদার অন্যান্য মাসআলার মতই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের উচিৎ এ মাসআলাটি সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণা অর্জন করা। কেননা এ ধরণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সন্দেহের উপর থাকা ঠিক নয়। কিন্তু যে সমস্ত বিষয় না শিখলে অথবা বিলম্বে শিখলে পথ ভ্রষ্ট হওয়ার ভয় রয়েছে, তা অবশ্যই শিখতে হবে। তাকদীরের মাসআলাটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা ভালভাবে শিক্ষা করা প্রতিটি বান্দার উপর আবশ্যক। মূলতঃ তাকদীরের মাসআলায় কোন সমস্যা নেই। মানুষের কাছে আকীদার আলোচনা কঠিন হওয়ার অন্যতম কারণ হল, তারা আকীদা শিখতে গিয়ে ‘কিভাবে’ কথাটিকে ‘কেন’ কথার উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। অথচ মানুষকে তার আমলের ব্যাপারে দু’টি প্রশ্নবোধক শব্দ দিয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে। কেন করলে এবং কিভাবে করলে। আমলটি কেন করেছো এটি হল ইখলাছ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা। আর কিভাবে করেছো এটি হল রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর অনুসরণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা। বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ কিভাবে করেছো এটির উপর বেশী গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কেন করতে হবে এ বিষয়টির প্রতি তেমন কোন গুরুত্বই দেয়না। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর অনুসরণের ব্যাপারে খুঁটিনাটি বিষয় জানতে চায়। কিন্তু আকীদার বিষয়টির উপরে কোন গুরুত্ব দেয়না। দুনিয়াবী বিষয়ে মানুষ খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। অথচ তার অন্তর আল্লাহ (আক্বীদাহ, ইখলাছ ও তাওহীদের বিষয়) সম্পর্কে সম্পূর্ণ গাফেল। মূলতঃ দেখা যায় কতিপয় মানুষ বর্তমানে দুনিয়া পূজারী হয়ে গেছে। অথচ সে টেরও পাচ্ছে না। অনেক মানুষ আল্লাহর সাথে শির্কে লিপ্ত হয়েছে। অথচ সে অনুভবও করতে পারে না। আকীদার বিষয়টি সম্পর্কে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আলেম সমাজ পর্যন্ত অনেকেই গুরুত্ব প্রদান করে না। এ বিষয়টি খুবই ভয়াবহ। অবশ্য বিনা আমলে শুধু মাত্র আকীদার উপরে গুরুত্ব দেয়াও ভুল। কারণ আমল হল আকীদা সংরক্ষণের জন্য প্রাচীর স্বরূপ। আমরা রেডিও-টিভি এবং পত্র-পত্রিকায় শুনতে পাই যে, পরিচ্ছন্ন আকীদাই হল দ্বীন। আমল না করে এভাবে শুধুমাত্র আকীদার উপরে গুরুত্ব দেয়াতে দ্বীনের কিছু কিছু হারাম বিষয়কে হালাল করে নেয়ার আশংকা রয়েছে। এই যুক্তিতে যে, আকীদা ঠিক আছে।

   মোট কথা এই যে, মানুষের উপর আকীদার বিষয়গুলো শিক্ষা করা আবশ্যক। যাতে করে তারা আল্লাহর নাম, গুণাবলী এবং কর্মক্ষমতা ও তাঁর বিধানাবলী সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখতে পারে। নিজে বিভ্রান্ত না হয় এবং অপরকে বিভ্রান্ত না করে। তাওহীদের জ্ঞান সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান। এ জন্য বিদ্বানগণ ইলমে তাওহীদকে ‘ফিকহে আকবার’ বা সর্বশ্রেষ্ঠ ফিক্‌হ বলে নাম রেখেছেন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
)مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ(
“আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের জ্ঞান দান করেন।” দ্বীনের জ্ঞানের মধ্যে তাওহীদের জ্ঞানের গুরুত্ব সর্বপ্রথম। তাই মানুষের উপর আবশ্যক হল, এ বিষয়টির উপর গুরুত্ব প্রদান করবে যে, কিভাবে সে তাওহীদের জ্ঞান অন্বেষণ করবে এবং কোন উৎস থেকে তা অর্জন করবে। প্রথমে সন্দেহ মুক্ত ও সুস্পষ্ট বিষয়গুলোর জ্ঞান অর্জন করবে। অতঃপর বিদ্‌আত ও সন্দেহ পূর্ণ বিষয়গুলোর শিক্ষা অর্জন করার পর সঠিক আকীদার আলোকে তার উত্তর দিবে। আকীদার সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলোর জ্ঞান অবশ্যই কুরআন, সুন্নাহ এবং ছাহাবীগণের বক্তব্য অতঃপর তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ীনে কেরাম এবং পরবর্তী যুগের নির্ভরযোগ্য আলেমগনের লেখনী ও বক্তব্য থেকে গ্রহণ করতে হবে। তাদের মধ্যে থেকে শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া এবং তাঁর সুযোগ্য ছাত্র ইবনুল কাইয়্যিমের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

প্রশ্নঃ (৬১) সম্মানিত শায়খ! আশা করি তাকদীরের মাসআলা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবেন। মানুষের মূল কাজ কি পূর্ব নির্ধারিত এবং কাজটি পালন করার নিয়মের ক্ষেত্রে মানুষ কি স্বাধীন? উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, কোন মানুষের জন্য যদি লেখা থাকে যে, সে একটি মসজিদ বানাবে। সে অবশ্যই মসজিদ বানাবে। তবে কিভাবে বানাবে এ ব্যাপারে সে স্বাধীন। এমনিভাবে পাপ কাজ নির্ধারিত থাকলে তা অবশ্যই করবে। কিভাবে করবে তা নির্ধারিত হয়নি। মোট কথা মানুষের তাকদীরের যেসমস্ত কর্ম নির্ধারিত আছে, তা বাস্তবায়নের ব্যাপারে মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন কথাটি কি ঠিক?
উত্তরঃ তাকদীরের মাসআলা নিয়ে বহু দিন যাবৎ মানুষের মাঝে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। এই জন্যই মানুষ তাকদীরের মাসআলাকে কেন্দ্র করে তিনভাগে বিভক্ত হয়েছে।

১) এক শ্রেণীর লোক বলে থাকে সব কিছু পূর্ব নির্ধারিত ভাগ্য অনুযায়ী সংঘটিত হয়। এতে মানুষের ব্যক্তিগত কোন স্বাধীনতা নেই। এদের মতে প্রচন্ড বাতাসের কারণে ছাদের উপর থেকে কোন মানুষ নীচে পড়ে যাওয়া এবং স্বেচ্ছায় সিড়ি বেয়ে নেমে আসা একই রকম।

২) অন্য একদলের মতে মানুষ তার কর্মে সম্পূর্ণ স্বাধীন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কর্তৃক লিখিত ভাগ্যকে তারা সরাসরি অস্বীকার করে। তাদের মতে মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন রূপে কর্ম সম্পাদন করে থাকে। ভাগ্য বলতে কিছু নেই।

৩) উভয় দলের মাঝখানে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা হল, তাঁরা আল্লাহ তাআ’লার নির্ধারিত তাকদীরে বিশ্বাস করেন। সাথে সাথে তারা কর্ম নির্বাচনের ক্ষেত্রে বান্দার স্বাধীনতাকে স্বীকার করেন। বান্দার কর্ম আল্লাহর নির্ধারণ এবং বান্দার নির্বাচনের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়ে থাকে। ছাদের উপর থেকে বাতাসের চাপে মাটিতে পড়ে যাওয়া এবং স্বেচ্ছায় সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসার মাঝে মানুষ অবশ্যই পার্থক্য করতে জানে। প্রথমটিতে তার কোন ইচ্ছা ছিলনা এবং দ্বিতীয়টি তার ইচ্ছা অনুযায়ী সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু উভয় কাজ আল্লাহর ফায়সালা অনুযায়ীই সংঘটিত হয়েছে। আল্লাহর রাজত্বে তাঁর ইচ্ছার বাইরে কিছুই সংঘটিত হয়না। বান্দা আপন ইচ্ছায় যা নির্ধারণ করে থাকে, তা সম্পর্কেই তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। শরীয়তের আদেশ-নিষেধ অমান্য করে তাকদীরের মাধ্যমে দলীল পেশ করার কোন সুযোগ নেই। কেননা শরীয়ত বিরোধী কর্মের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় সে আল্লাহর নির্ধারণ সম্পর্কে অবগত থাকে না। স্বেচ্ছায় পাপ কাজের প্রতি অগ্রসর হওয়ার কারণেই দুনিয়া বা আখেরাতে শাস্তির সম্মুখীন হবে। কাউকে পাপ কাজের উপর বাধ্য করা হলে তাকে শাস্তি দেয়া যাবে না। যেমন একজন অন্য জনকে জোরপুর্বক মদ পান করিয়ে দিলে মদপানকারীকে শাস্তি দেয়া যাবে না। কারণ এক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় সে পান করে নি। মানুষ ভাল করেই জানে যে, আগুন থেকে পালিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করা এবং বসবাসের জন্য সুন্দর ঘরবাড়ি নির্বাচন করা তার আপন পছন্দ অনুযায়ী হয়ে থাকে। সুন্দর ঘরবাড়ি নির্ধারণ এবং আগুন থেকে বাঁচার সুযোগ থাকা সত্বেও যে মানুষ সে সুযোগ গ্রহণ করেনি, তাকে সুযোগ নষ্ট করার জন্য তিরস্কার করা হয়। তবে কি জন্যে সে পরকালের আযাব থেকে রেহাই পাওয়ার এবং জান্নাত আবশ্যককারী আমলগুলো ছেড়ে দেয়াকে নিজের অপরাধ মনে করবে না?

   বর্ণিত প্রশ্নে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ যদি কারও তাকদীরে লিখে রাখেন যে, সে একটি মসজিদ বানাবে, সে অবশ্যই মসজিদটি বানাবে কিন্তু কিভাবে বানাবে সে ব্যাপারে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন এই উদাহরণটি ঠিক নয়। কেননা তাতে ধারণা করা হয় যে, নির্মাণের পদ্ধতি সম্পূর্ণ বান্দার হাতে। এতে আল্লাহর কোন হাত নেই। সঠিক কথা এই যে, নির্মাণ করা এবং নির্মাণের পদ্ধতি সবই তাকদীরে নির্ধারিত। উভয়টি নির্বাচনে বান্দার স্বাধীনতা রয়েছে। তবে তাকে বাধ্য করা হয়নি। যেমনভাবে তাকে আপন ঘরবাড়ি নির্মাণ বা মেরামত করতে বাধ্য করা হয়নি। তাকদীর সম্পূর্ণ গোপন বিষয়। অহীর মাধ্যমে যাকে আল্লাহ অবগত করান সেই কেবল জানতে পারে। এমনিভাবে নির্মাণের পদ্ধতিও আল্লাহর নির্ধারণের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। সমস্ত জিনিষের বিবরণ বিস্তারিতভাবে এবং সংক্ষিপ্তভাবে তাকদীরে লিখিত আছে।

   আল্লাহ যে বিষয়ের ইচ্ছা করেন বা নির্ধারণ করেন, তা ব্যতীত বান্দার পক্ষে অন্য কিছু নির্বাচন করা সম্ভব নয়। বরং বান্দা যখন কোন কিছু করে, তখন সে ভাল করেই জানে যে, এটা আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সকল কর্ম সৃষ্টি ও নির্ধারণ করেন আর বান্দা প্রকাশ্যভাবে তা সম্পাদন করে। বান্দা যখন কর্ম সম্পাদন করে, তখন সে অনুভবই করতে পারে না যে, কেউ তাকে কাজটি করতে বাধ্য করছে। বাহ্যিক উপকরণের মাধ্যমে বান্দা যখন কাজটি করে ফেলে, তখন সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহই তার ভাগ্যে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।

   প্রশ্নে বর্ণিত মানুষের পাপ কাজের যে উদাহরণ দেয়া হয়েছে, তাতে আমরা তাই বলব, যা আমরা মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে বলেছি। বান্দা কর্তৃক স্বেচ্ছায় কোন কাজ নির্বাচন করা আল্লাহর নির্ধারণের পরিপন্থী নয়। কেননা কাজ করার জন্য বান্দা যখন অগ্রসর হয়, তখন সে সেচ্ছায় কাজটি নির্বাচন করেই অগ্রসর হয় এবং সে জানে না যে, কেউ তাকে কাজ করার জন্য বাধ্য করছে। কিন্তু যখন সে করে ফেলে, তখন সে জানতে পারে যে, আল্লাহ তার জন্যে কাজটি নির্ধারণ করেছেন। এমনিভাবে পাপকাজে লিপ্ত হওয়া এবং তার প্রতি অগ্রসর হওয়া বান্দার নির্বাচনের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। এটি তাকদীরের খেলাফ নয়। আল্লাহই সকল কিছুর একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। সকল কর্ম বাস্তবায়নের উপকরণও তিনি সৃষ্টি করেছেন। বান্দার পক্ষ থেকে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যে সকল কাজ সংঘটিত হয়, তা সবই আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত। আল্লাহ বলেনঃ
)أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ إِنَّ ذَلِكَ فِي كِتَابٍ إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ(
“তুমি কি জাননা যে, আল্লাহ জানেন যা আকাশে ও জমিনে আছে। এসব কিতাবে লিখিত আছে। এটা আল্লাহর কাছে সহজ।” (সূরা হজ্বঃ ৭০) আল্লাহ বলেনঃ
)وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوًّا شَيَاطِينَ الْإِنسِ وَالْجِنِّ يُوحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُورًا وَلَوْ شَاءَ رَبُّكَ مَا فَعَلُوهُ فَذَرْهُمْ وَمَا يَفْتَرُونَ(
“এমনিভাবে আমি প্রত্যেক নবীর জন্যে শত্রু হিসেবে সৃষ্টি করেছি মানুষ ও জিন শয়তানদের। তারা ধোঁকা দেয়ার জন্যে একে অপরকে চাকচিক্যপূর্ণ প্রবঞ্চনা মূলক কথা-বার্তা শিক্ষা দেয়। যদি আপনার পালনকর্তা চাইতেন, তবে তারা এ কাজ করতনা।” (সূরা আনআ’মঃ ১১২) আল্লাহ আরো বলেনঃ
)وَكَذَلِكَ زَيَّنَ لِكَثِيرٍ مِنْ الْمُشْرِكِينَ قَتْلَ أَوْلَادِهِمْ شُرَكَاؤُهُمْ لِيُرْدُوهُمْ وَلِيَلْبِسُوا عَلَيْهِمْ دِينَهُمْ وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا فَعَلُوهُ فَذَرْهُمْ وَمَا يَفْتَرُونَ(
“এমনিভাবে অনেক মুশরেকের দৃষ্টিতে তাদের উপাস্যরা সন্তান হত্যাকে সুশোভিত করে দিয়েছে। যেন তারা তাদেরকে বিনষ্ট করে দেয় এবং তাদের ধর্মমতকে তাদের কাছে বিভ্রান্ত করে দেয়। যদি আল্লাহ চাইতেন, তবে তারা এ কাজ করতনা। অতএব, আপনি তাদেরকে এবং তাদের মিথ্যাচারিতাকে পরিত্যাগ করুন।” (সূরা আনআ’মঃ ১৩৭) আল্লাহ আরো বলেনঃ
)وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا اقْتَتَلَ الَّذِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمْ الْبَيِّنَاتُ وَلَكِنْ اخْتَلَفُوا فَمِنْهُمْ مَنْ آمَنَ وَمِنْهُمْ مَنْ كَفَرَ وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا اقْتَتَلُوا وَلَكِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ(
“আর আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন, তাহলে পরিস্কার নির্দেশ এসে যাবার পর পয়গাম্বরদের পেছনে যারা ছিল তারা লড়াই করত না। কিন্তু তাদের মধ্যে মতবিরোধ হয়ে গেছে। অতঃপর তাদের কেউ তো ঈমান এনেছে, আর কেউ হয়েছে কাফের। আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন, তাহলে তারা পরস্পরে লড়াই করতো না, কিন্তু আল্লাহ তাই করেন, যা তিনি ইচ্ছা করেন।” (সূরা বাকারাঃ ২৫২)

   কোন মানুষের উচিৎ নয় যে, নিজের ভিতরে বা অন্যের ভিতরে এমন কোন জিনিষের অনুসন্ধান করা, যা অপরের জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে এবং তাকদীরের মাধ্যমে শরীয়তের বিরোধীতা করার ধারণা সৃষ্টি হতে পারে। ছাহাবীদের আমল এ রকম ছিলনা। অথচ তাঁরা সত্য জানতে ও উদ্‌ঘাটন করতে অধিক আগ্রহী ছিলেন। ছহীহ বুখারীতে আলী বিন আবু তালেব (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
]مَا مِنْكُمْ مِنْ نَفْسٍ مَنْفُوسَةٍ إِلَّا كُتِبَ مَكَانُهَا مِنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ وَإِلَّا قَدْ كُتِبَ شَقِيَّةً أَوْ سَعِيدَةً فَقَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَلَا نَتَّكِلُ عَلَى كِتَابِنَا وَنَدَعُ الْعَمَلَ فَمَنْ كَانَ مِنَّا مِنْ أَهْلِ السَّعَادَةِ فَسَيَصِيرُ إِلَى عَمَلِ أَهْلِ السَّعَادَةِ وَأَمَّا مَنْ كَانَ مِنَّا مِنْ أَهْلِ الشَّقَاوَةِ فَسَيَصِيرُ إِلَى عَمَلِ أَهْلِ الشَّقَاوَةِ قَالَ أَمَّا أَهْلُ السَّعَادَةِ فَيُيَسَّرُونَ لِعَمَلِ السَّعَادَةِ وَأَمَّا أَهْلُ الشَّقَاوَةِ فَيُيَسَّرُونَ لِعَمَلِ الشَّقَاوَةِ ثُمَّ قَرَأَ ( فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى ) الْآيَةَ
“তোমাদের মধ্যে এমন কোন লোক নেই, যার ঠিকানা জান্নাতে অথবা জাহান্নামে লিখে দেয়া হয়নি। ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমরা কি ভাগ্যের লেখার উপর ভরসা করে বসে থাকব না এবং আমল বর্জন করব না? নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “না; বরং তোমরা আমল কর। কারণ প্রত্যেক ব্যক্তিকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সে কাজ সহজ করে দেয়া হবে। যে ব্যক্তি সৌভাগ্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত হবে, তার জন্য সৌভাগ্যশীলদের আমল সহজ করে দেয়া হবে আর যে ব্যক্তি দুর্ভাগ্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত হবে, তার জন্য দুর্ভাগ্যশীলদের আমল সহজ করে দেয়া হবে।” অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুরআনের এই আয়াতটি পাঠ করলেনঃ
)فَأَمَّا مَنْ أَعْطَى وَاتَّقَى وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَى وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى(
“অতএব, যে দান করে, আল্লাহ ভীরু হয় এবং উত্তম বিষয়কে সত্যায়ন করে। আমি তাকে সুখের বিষয়ের (জান্নাতের) জন্যে সহজ পথ দান করব। আর যে কৃপণতা করে ও বেপরওয়া হয় এবং উত্তম বিষয়কে মিথ্যা মনে করে। আমি তাকে কষ্টের বিষয়ের (জাহান্নামের) জন্যে সহজ পথ দান করব। (সূরা আল-লাইলঃ ৫-১০)”

    উপরোক্ত হাদীছে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভাগ্যের লিখনের উপর নির্ভর করে আমল ছেড়ে দিতে নিষেধ করেছেন। কারণ সৌভাগ্যবান না দুর্ভাগ্যবান, তা জানার কোন উপায় নেই এবং মানুষকে তার সাধ্যানুযায়ী আমল করার আদেশ দেয়া হয়েছে। কুরআনের আয়াত দিয়ে প্রমাণ করা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি ঈমান আনবে এবং সৎ আমল করবে, তার জন্য কল্যাণের সহজ পথকে আরো সহজ করে দিবেন। এটিই ফলদায়ক ঔষধ। এর মাধ্যমেই বান্দা তার সৌভাগ্যের উচ্চ শিখরে আরোহণ করতে সক্ষম হবে এবং ঈমান আনার সাথে সাথে সৎ আমল করার জন্যে সদা স্বচেষ্ট থাকবে।

   আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন সৎআমল করার তাওফীক দেন, ভাল পথ সহজ করে দেন, কঠিন পথ থেকে আমাদেরকে দূরে রাখেন এবং দুনিয়া-আখেরাতে ক্ষমা করেন।

প্রশ্নঃ (৬২) সৃষ্টির পূর্বে মানুষের ভাগ্যে যা লেখা হয়েছে, তা কি দু’আর মাধ্যমে পরিবর্তন করা সম্ভব?
উত্তরঃ সন্দেহ নাই যে, ভাগ্যের লিখন পরিবর্তনে দু’আর প্রভাব রয়েছে। তবে জেনে রাখা দরকার, পরিবর্তনটাও পূর্বে লেখা আছে যে, দু’আর মাধ্যমে অমুকের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। এই ধারণা যেন না হয় যে, আপনি ভাগ্যের কোন অলিখিত বস্ত পরিবর্তনের জন্যে দু’আ করছেন। সুতরাং দু’আ করবেন এটাও লেখা আছে। আর দু’আর মাধ্যমে যা অর্জিত হবে, তাও লিখিত আছে। এই জন্যই আমরা দেখতে পাই যে, রোগীকে ঝাড়-ফুঁক করা হলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদল সৈনিক কোন একদিকে প্রেরণ করলেন। তাঁরা কোন এক গোত্রের নিকটে মেহমান হিসাবে উপস্থিত হলে গোত্রের লোকেরা মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। রাতের বেলা সেই গোত্রের নেতাকে বিষাক্ত সাঁপে দংশন করল। তাকে ঝাড়ার জন্য কবিরাজ অনুসন্ধান করা হল। কিন্তু কোন কবিরাজ পাওয়া গেলনা। অবশেষে লোকেরা ছাহাবীদের নিকট এসে কবিরাজ অন্বেষণ করল। একজন সাহাবী বললেন, আমি ঝাড়-ফুঁক করতে রাজি আছি, তবে আমাকে বিনিময় দিতে হবে। তারা একশটি ছাগল দিতে রাজি হলে উক্ত সাহাবী রোগীকে সূরা ফাতিহা পড়ে ঝাড়-ফুঁক করলেন। ফলে রোগী এমনভাবে সুস্থ হয়ে উঠল মনে হয় যেন রশির বাঁধন হতে মুক্ত করা হল।

   উক্ত হাদীছ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, রোগ মুক্তর জন্য ঝাড়-ফুঁক যথেষ্ট কার্যকর। দু’আর প্রভাব রয়েছে। তবে তাতে ভাগ্যের পরিবর্তন হয়না; বরং ভাগ্যে এটাও লেখা রয়েছে যে দু’আ করবে তার ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। সব কিছুই সংঘটিত হয় ভাগ্যের লিখন অনুযায়ী।

প্রশ্নঃ (৬৩) রিজিক এবং বিবাহ কি লাওহে মাহফুজে লিখিত আছে?
উত্তরঃ আল্লাহ তাআ’লা যেদিন কলম সৃষ্টি করেছেন, সেদিন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত মাখলুকাত সৃষ্টি হবে, সবই লাওহে মাহফূজে লিপিবদ্ধ আছে। আল্লাহ তাআ’লা কলম সৃষ্টি করে বললেন, লিখ। কলম বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমি কি লিখব? আল্লাহ তাআ’লা বললেন, কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু হবে সব লিখে ফেল। সে সময় কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু পৃথিবীর বুকে সংঘটিত হবে, কলম সব কিছুই লিখে ফেলল। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, ভ্রুন মাতৃগর্ভে চার মাস অতিবাহিত হওয়ার পর আল্লাহ তাআ’লা একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। ফেরেশতা তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দেন এবং লিখে দেন তার রিজিক, বয়স এবং তার কাজ অর্থাৎ সৌভাগ্যবান হবে না দুর্ভাগা হবে। রিজিক লিখা আছে এবং কিভাবে অর্জন করবে, তাও লিখা আছে। রিজিক অন্বেষণের সাথ সাথে রিজিক অন্বেষণের উপকরণও লিপিবদ্ধ আছে। আল্লাহ বলেনঃ
)هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمْ الْأَرْضَ ذَلُولًا فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِنْ رِزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ(
“তিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে সুগম করেছেন, অতএব তোমরা তাতে বিচরণ কর এবং তার দেয়া রিজিক আহার কর। তাঁরই কাছে পুনরুজ্জীবন হবে।” (সূরা মুলকঃ ১৫) রিজিক পাওয়ার এবং তা বৃদ্ধি হওয়ার অন্যতম মাধ্যম হল, পিতা-মাতার সাথে সৎ ব্যবহার করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
)مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ أَوْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ(
“যে ব্যক্তি চায় যে, তার রিজিক বাড়িয়ে দেয়া হোক এবং বয়স বাড়িয়ে দেয়া হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” রিজিক বৃদ্ধির আরো মাধ্যম হল তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ(
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে নিস্কৃতির পথ বের করে দিবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিজিক দান করবেন।” (সূরা তালাকঃ ২-৩) এমন বলা যাবে না যে, রিজিক যেহেতু নির্ধারিত আছে, সুতরাং আমি এর উপকরণ অনুসন্ধান করব না। এটা বোকামীর পরিচয়। বুদ্ধিমানের পরিচয় হল রিজিক এর জন্য এবং দ্বীন্তদুনিয়ার কল্যাণ অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালানো। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
)الْكَيِّسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ(
“বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের হিসাব নিল এবং পরকালের জন্য আমল করল। অক্ষম ও নির্বোধ সেই ব্যক্তি, যে নিজের কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করল এবং আল্লাহর উপর ভরসা করে বসে থাকল।” রিজিক যেভাবে লিপিবদ্ধ আছে, বিবাহ করাও নির্ধারিত রয়েছে। এই পৃথিবীতে কে কার স্বামী বা স্ত্রী হবে, তাও নির্দিষ্ট রয়েছে। আসমানজমিনের কোন কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন নয়।

প্রশ্নঃ (৬৪) মুসিবত নাযিল হলে যে ব্যক্তি অসন্তুষ্ট হয়, তার হুকুম কি?
উত্তরঃ বালা-মুসিবত নাযিল হওয়ার সময় মানুষ চার স্তরে বিভক্ত হয়ে যায়। যথাঃ-

প্রথম স্তরঃ অসন'ষ প্রকাশ করা। এটি আবার কয়েক প্রকার।

১ম প্রকারঃ আল্লাহ যে বিষয় নির্ধারণ করেছেন, তার কারণে অন্তর দিয়ে আল্লাহর উপর অসন্তুষ্ট হয়ে যাওয়া। এটা হারাম। কারণ এধরণের অসন'ষ্টি কখনো কুফরীর দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ
)وَمِنْ النَّاسِ مَنْ يَعْبُدُ اللَّهَ عَلَى حَرْفٍ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرٌ اطْمَأَنَّ بِهِ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةٌ انقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ(
“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধা-সংকোচ নিয়ে আল্লাহর এবাদত করে। যদি সে কল্যাণ প্রাপ্ত হয়, তবে এবাদতের উপর কায়েম থাকে এবং যদি কোন পরীক্ষায় পড়ে, তবে পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। সে ইহকালে ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত।” (সূরা হজ্জঃ ১১)
২য় প্রকারঃ কখনো অসন'ষ্টি কথার মাধ্যমে হয়ে থাকে। যেমন হতাশা প্রকাশ করা এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দু’আ করা। এটাও হারাম।
তৃতীয় প্রকারঃ কখনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে হয়ে থাকে। যেমন গাল চাপড়ানো, জামা-কাপড় ছেড়া, মাথার চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলা ইত্যাদি সবই হারাম এবং ধৈর্য্য ধারণের পরিপন্থী।

দ্বিতীয় স্তরঃ বিপদের সময় ধৈর্য্য ধারণ করা। যেমন কোন আরবী কবি বলেছেন ‘বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করা খুবই কঠিন। কিন্তু এর শেষ পরিণাম খুবই সুমধুর।’ কেননা এই সবর করাটা তার নিকট খুবই কঠিন তবুও সে সবর করে। বিপদগ্রস্ত হওয়াটা যেমন অপছন্দ করে তেমনি তাতে অসন'ষ্টি প্রকাশ করাটাও তার নিকট অপছন্দনীয়। কিন্তু তার ঈমান তাকে অসন'ষ্টি প্রকাশ থেকে বিরত রাখে। মোটকথা সে বিপদে আপতিত হওয়া এবং না হওয়াকে এক মনে করে না। এক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করা ওয়াজিব। কারণ আল্লাহ তায়ালা বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ করার আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ
)وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ(
“তোমরা ধৈর্য্যধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” (সূরা আনফালঃ ৪৬)

তৃতীয় স্তরঃ বিপদ আসার পর সন্তুষ্ট থাকা এবং মুসিবত আসা ও না আসা উভয়কেই সমান মনে করা। তাই বিপদ আসলেও তার কাছে বিপদ সহ্য করা বেশী কঠিন মনে হয় না। গ্রহণযোগ্যমতে এধরণের ছবর মুস্তাহাব। ওয়াজিব নয়। এটা এবং পূর্ববর্তী স্তরের মাঝে পার্থক্য অতি সুস্পষ্ট। বিপদ হওয়া এবং না হওয়া সমান মনে হওয়া সন্তুষ্ট থাকার ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। এ প্রকারের এবং পূর্বের প্রকারের মাঝে পার্থক্য এই যে, পূর্বের প্রকারে বিপদে আপতিত ব্যক্তি বিপদকে কঠিন মনে এবং ধৈর্য্য ধারণ করে।

চতুর্থ স্তরঃ শুকরিয়া আদায় করা। এটা সর্বোচ্চ স্তর। তা এই যে, বিপদের সময় আল্লাহর প্রশংসা করা। কারণ সে ভাল করেই জানে যে, এ সমস্ত বিপদাপদ গুনাহ মোচন এবং ছাওয়াব বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
مَا مِنْ مُصِيبَةٍ تُصِيبُ الْمُسْلِمَ إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا عَنْهُ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا
অর্থঃ কোন মুসলিম বিপদাপদে পতিত হলে বিনিময়ে আল্লাহ তাআ’লা তার গুনাহ মোচন করেন। এমন কি শরীরে একটি কাঁটা বিধলেও তার বিনিময়ে গুনাহ মাফ করা হয়।

প্রশ্নঃ (৬৫) সম্মানিত শায়খ! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী, ( لا عدوى ولاطيرة ولا هامة ولا صفر ) “একজনের রোগ অন্যজনের শরীরে সংক্রমিত হয়না। পাখী উড়িয়ে বা পাখীর ডাক শুনে কল্যাণ-অকল্যাণ নির্ধারণের নিয়ম ইসলামে নেই। সফর মাসকেও অশুভ মনে করাও ঠিক নয়। এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা জানতে চাই। হাদীছে বর্ণিত জিনিষগুলোর প্রভাবকে অস্বীকার করা হয়েছে। এগুলো কোন ধরণের অস্বীকার? নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর বাণী, “কুষ্ঠ রোগী থেকে পলায়ন কর যেভাবে তুমি বাঘ থেকে ভয়ে পলায়ন কর”। এই হাদীছ ও প্রথমোক্ত হাদীছের মধ্যে কিভাবে সমন্বয় করব?
উত্তরঃ একজনের রোগ অন্যজনের শরীরে সংক্রমিত হওয়াকে আদ্‌ওয়া বলা হয়। শারীরিক রোগে যেমন এটা হয়, তেমনি চারিত্রিক রোগের ক্ষেত্রেও এমন হয়ে থাকে। এ জন্যই নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, অসৎ বন্ধু কামারের ন্যায়। সে হয়ত তোমার জামা পুড়িয়ে ফেলবে। তা না হলে কমপক্ষে তুমি তার কাছ থেকে দুর্গন্ধ পাবে।

   কোন জিনিষ দেখে, কোন কথা শুনে বা জানার মাধ্যমে কুলক্ষণ মনে করাকে ‘ত্বিয়ারা’ বলা হয়।

  ‘হামাহ’ এর ব্যাখ্যা দু’ধরণ হতে পারে। ক) এমন রোগ, যা একজনকে আক্রমণ করে অন্যজনের নিকট সংক্রমিত হয়। খ) ‘হামাহ’ বলা হয়, আরবদের ধারণামতে এমন এক শ্রেণীর পাখিকে, যে গভীর রাতে নিহত ব্যক্তির বাড়িতে উপস্থিত হয়ে তার পরিবারের লোকদেরকে ডাকাডাকি করে এবং প্রতিশোধ নেয়ার উৎসাহ দেয়। কেউ কেউ ধারণা করে যে, এটি নিহত ব্যক্তির রূহ পাখির আকৃতি ধরে উপস্থিত হয়েছে। এই পাখিটিকে আমাদের পরিভাষায় হুতুম পেঁচা বলা হয়। তৎকালিন আরবরা এ পাখির ডাককে কুলক্ষণ মনে করত। কারো ঘরের পাশে এসে এ পাখি ডাকলে তারা বিশ্বাস করত যে, সে মৃত্যু বরণ করবে।

   ‘ছফর’ এর বিভিন্ন ব্যাখ্যা করা হয়েছে। (১) আরবী ছফর মাস। আরবরা এ মাসকে অকল্যাণের মাস মনে করত। (২) এটি উটের এক ধরণের রোগের নাম, যা এক উটের শরীর থেকে অন্য উটের শরীরে সংক্রমিত হয়। (৩) ছফর মাসকে আরবরা কখনো হারাম মাসের সাথে গণনা করত। আবার কখনো হালাল মাস হিসাবে গণ্য করত। এটি আরবদের গোমরাহী মূলক একটি আচরণ। 

   তবে উল্লেখিত ব্যাখ্যাগুলির মধ্যে গ্রহণযোগ্য কথা হল, জাহেলী সমাজের লোকেরা ছফর মাসকে অমঙ্গলের মাস মনে করত। মূলতঃ কল্যাণ-অকল্যাণ নির্ধারণে সময় বা মাসের কোন প্রভাব নেই। ছফর মাস অন্যান্য মাসের মতই। তাতে কল্যাণ-অকল্যাণ আল্লাহর নির্ধারণ অনুযায়ীই হয়ে থাকে।

   উপরে বর্ণিত ভ্রান্ত বিশ্বাস খন্ডন করতে গিয়ে কোন কোন মানুষ যখন ছফর মাসে কোন কাজ সমাধা করে, তখন সেই তারিখ লিখে রাখে এবং বলে কল্যাণের মাস ছফর মাসের অমুক তারিখে কাজটি সমাধা হল। এটি এক বিদ্‌আত দ্বারা অন্য বিদ্‌আতের এবং এক অজ্ঞতা দ্বারা অন্য অজ্ঞতার চিকিৎসা করার শামিল। এটি কল্যাণের মাসও নয় এবং অকল্যাণের মাসও নয়। এই জন্যই কোন কোন বিদ্বান পেঁচার ডাক শুনে (خيرا ان شاء الله) “আল্লাহ চাহেতো ভাল হবে” এ কথা বলার প্রতিবাদ করেছেন। ভাল বা খারাপ কোন কিছুই বলা যাবে না। সে অন্যান্য পাখির মতই ডাকে।

   উপরের চারটি বিষয়ের প্রভাবকে হাদীছে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করা হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় আল্লাহর উপর ভরসা করা সকল মু’মিনের উপর আবশ্যক। এতে ঈমান মজবুত হবে। এ সমস্ত কুসংস্কারের সামনে মুমিন ব্যক্তি কখনো দুর্বল হবে না।

   কোন মুসলিম ব্যক্তি যখন এ সমস্ত বিষয়ের প্রভাবকে বিশ্বাস করবে, তখন নিম্নলিখিত দু’অবস্থার এক অবস্থা হতে পারেঃ

 (১) সে হয়ত বিশ্বাস করে সামনের দিকে অগ্রসর হবে অথবা থেমে যাবে। এ অবস্থায় তার কর্মসমূহ এমন বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত করল, যার কোন প্রভাব নেই।
(২) কোন কিছু পরওয়া না করে কাজের প্রতি অগ্রসর হবে, কিন্তু মনের ভিতরে দুর্বলতা ও দুশ্চিন্তা থেকেই যাবে। কিন্তু এটি প্রথমটির চেয়ে হালকা। কারণ সে এ সমস্ত বিষয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করে থাকে।

   কিছু কিছু মানুষ শুভ-অশুভ নির্ধারণ করার জন্য কুরআন মাজীদ খুলে থাকে। খুলে জাহান্নামের আলোচনা দেখতে পেলে লক্ষণ ভাল নয় বলে মনে করে। আর জান্নাতের আলোচনা দেখতে পেলে খুশী হয়। এটি জাহেলী যামানার লোকদের কাজের মতই। যারা জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ধারণ করত।

   নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উক্ত জিনিষগুলোর অস্তিত্বকে অস্বীকার করেন নি। কারণ এগুলোর অস্তিত্ব রয়েছে। তবে এগুলোর প্রভাবকে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মেনে নেন নি। আল্লাহই সকল বস্তর উপর প্রভাব বিস্তারকারী। সুতরাং যদি জানা যায় যে, কোন বস্ত সংঘটিত হওয়াতে সঠিক কারণ রয়েছে, তাহলে তাকে কারণ হিসাবে বিশ্বাস করা বৈধ। কিন্তু নিছক ধারণা করে কোন ঘটনায় অন্য বস্তর প্রভাব রয়েছে বলে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। কোন বস্ত নিজে নিজেই অন্য ঘটনার কারণ হতে পারে না। সংক্রামক রোগের অস্তিত্ব রয়েছে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “অসুস্থ উটের মালিক যেন সুস্থ উটের মালিকের উটের কাছে অসুস্থ উটগুলো নিয়ে