সোমবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৭

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি নূরের তৈরি?

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি নূরের তৈরি?



নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি নূরের তৈরি?

ভূমিকা
আল্লাহ তাআলার যাবতীয় প্রশংসা এবং নবী  মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি অসংখ্য দরূদ এবং সালাম বর্ষিত হোউক!
সউদী  আরবে আল খাফজী শহরে ইসলামিক গাইডেন্স সেন্টারে সাপ্তাহিক আলোচনা অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রকমের প্রশ্নের সম্মুখিন হতাম। তম্মধ্যে একটি অন্যতম প্রশ্ন প্রায় প্রায় করা হত।
প্রশ্নটি হলঃ ‘নবী (সা:) নূরের তৈরী না মাটির তৈরী?’ আদম সন্তান তো মাটিরই হয় কিন্তু লোক কেন এ প্রশ্ন করছিল?

অধিক জানার আগ্রহ মনকে নাড়া দেয়। বিষয়টি নিয়ে গবেষনা করতে গিয়ে যখনই অভ্যন্তরে পৌঁছালাম তখন এর গুড় রহস্য প্রষ্ফুটিত হতে লাগল। দেখা গেল সুফীবাদ বা পীরবাদের এটি একটি আক্বীদাহ, যা তারা জনসাধারণের মধ্যে প্রচার করে থাকে। অভ্যন্তরে আছে এমন কিছু তথ্য যা মানুষকে পীর-ফকীর মাযার-দরগাহ তথা দৈনন্দীন ঘটিত শির্কী কার্যকলাপের দিকে আহবান করে। এই  বিশ্বাসের রেশ ধরে নবী (সা:) কে কবরে জীবিত এবং তাঁর সাথে সাথে কথিত মৃত ওলীদেরকেও জীবিত প্রমাণ করার অপচেষ্টা করা হয়েছে।  এতটুকু প্রমাণ করতে পারলেই  তাদের  আসল উদ্দেশ্য হাসিল হয়।  ফলে কবরের কাছে ওলী  বা পীরের নিকট দুআ-প্রার্থনা করা,  তাদের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নযরানা-উপঢৌকন পেশ করে তাদের অসীলা তথা মাধ্যম ধরা, সব জায়েয হয়ে যায়।  এই ধারনায় রয়েছে নবী  (সা:) এর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি । খৃষ্টান ও ঈহুদীরা তাদের  নবীগণের ব্যাপারে অতিরঞ্জন করতে গিয়ে তাঁদেরকে আল্লাহর পুত্র হিসেবে আখ্যা দেয়, ফলে  তারা মুশরিক হয়ে যায়। আল্লাহ ও তার রাসূল এ বিষয়ে উম্মতকে সতর্ক  করে দেন। কিন্তু তার পরও যদি নবী (সা:) কে কেউ বলে যে তিনি (নূরূন মিন্ নূরিল্লাহ) আল্লাহর নূরের তৈরী, তাহলে ইহুদী  খৃষ্টানদের বিশ্বাস এবং এই বিশ্বাসের মধ্যে কি আসলে কোন পার্থক্য থাকল? কারণ কেউ বলল আল্লাহর পুত্র আর কেউ বলল  আল্লাহর সত্তারই একটি অংশ।

এই ধরণের তথ্য দ্বারা সহজ সরল ভাষায় অলংকৃত হয়েছে পুস্তকখানি। পক্ষ ও বিপক্ষের মূল দলীলসমূহ একত্রিত করা হয়েছে। উলামায়ে সালাফগণের ব্যাখ্যা পেশ করা হয়েছে। হাদীস জাল কিংবা দুর্বল হলে কারণ উল্লেখ করা হয়েছে এবং তথ্যাবলীর সুক্ষè বরাত দেয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য, পাঠক যেন সঠিক আক্বীদা (ধর্মবিশ্বাসের) অধিকারী হয় এবং ভ্রান্ত ও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যের কারণে প্রচারিত ধ্যান ধারণা ও শির্ক বিদআতের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পায়। আর তা হলে আমার শ্রম সার্থক হবে, আমি হব সৌভাগ্যবান। আল্লাহ তুমি আমার  এই ক্ষুদ্র প্রয়াসকে কবূল কর। আমীন!

         এই শুভ সময়ে আমি সর্বপ্রথমে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায়  করি । তার পরে শুকরিয়া জ্ঞাপন করি শ্রদ্ধেয়  শাইখ মতিউর রহমান সালাফী সাহেবের ( অনুবাদক ও গবেষক দাম্মাম ইসলামিক কালচারাল সেন্টার ) এবং বড় ভাই শাইখ আব্দুল্লাহ আল কাফী সাহেবের ( অনুবাদক ও গবেষক জুবাইল দাওয়া এন্ড গাইডেন্স সেন্টার) যাঁরা প্রচুর ব্যস্ততার মাঝেও পুস্তকটির ভুল-ভ্রান্তি  কারেক্শন এবং সুপরামর্শ দ্বারা সহযোগিতা করেছেন। আল্লাহ তাঁদের উত্তম জাযা দিন।

        উল্লেখ থাকে যে,প্রণয়ন ও গবেষনার সফরে এটি আমার নব প্রয়াস, তাই ভূল-ত্রƒটি থাকা স্বাাভাবিক। বিজ্ঞ মহল হতে সুপরামর্শ পেলে কৃতজ্ঞতায় বাধিত হব।

                                         লেখক:  আব্দুর রাকীব মাদানী
                                          আল্ খাফজী,  সউদী আরব।

প্রথম অধ্যায়

নবী (সা:) নূরের তৈরী  কারা বলেন ?

আমাদের দেশে এক প্রকার লোক দেখা যায়, যারা আলেম উলামাদের বেশে থাকে। নিজেকে আহ্লুস্ সুন্নাহ ( সুন্নী ) বলে পরিচয় দেয়। উপমহাদেশে তাদের ব্রেলী বলা হয় কারণ তাদের মতবাদের উস্তাদ হচ্ছেন সাইয়্যেদ আহমেদ রেযা ব্রেলভী সাহেব। তিনি ব্রেলী শহরের তাই তাদেরকে ব্রেলভী বলে জানা যায়। কেউ কেউ তাদেরকে সূফী-দরবেশ নামেও জানেন, যেমন আরবী ভাষীয় ভাইয়েরা। সহজ সরল ভাবে তাদের জানতে হলে এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে, যারা পীর মুরীদীকে বিশ্বাস করে, যাদের ধারনা পীরই হচ্ছেন সব কিছু, পীরের উসীলা বা মাধ্যম ছাড়া আল্লাহর কাছে আমল কবূল হয়না, তারাই হচ্ছে ঐ শ্রেণীর আলেম। তাই দেখা যায়, কোনো কোনো পীর তাদের লম্বা পাগড়ী ভক্তদের ধরিয়ে বায়আত বা শপথ বাক্য পাঠ করান। ভক্তরা আনন্দে অঙ্গীকার করে। অঙ্গীকার রক্ষা করা হয় কি হয়না সেটা পরের কথা। এই প্রকার লোকদের নিকট থেকে জম্ম নিয়েছে এই আকীদা বা বিশ্বাসের। নবী মুহাম্মদ (সা:) যিনি আদম সন্তান, যিনি নবীদের প্রধান, অন্যান্য মানব সন্তানের মত যাঁর বাবা মা ছিলেন, যিনি খাওয়া-দাওয়া করতেন, বাজার-ঘাট যেতেন, বিবাহ-শাদী করেছিলেন, আনন্দমুহুর্তে খুশী হতেন, দুঃখ-কষ্টের সময় মর্মাহত হতেন, অর্থাৎ একজন মানবের মধ্যে যা কিছু গুণাগুণ থাকে সব কিছুই তাঁর মধ্যে ছিল, তা সত্ত্বেও তিনি নাকি মানুষের মত মাটির তৈরী না হয়ে নূর বা জ্যোতির তৈরী। তাও আবার আল্লাহর সত্তার নূর দ্বারা তৈরী অন্য নূরের নয়।

      মোট কথা উম্মতে মুহাম্মদিয়ার মধ্যে দুর্ভাগ্যবশতঃ যত সব ফের্কা বা দল দেখা যায় তার মধ্যে ব্রেলভী বা পীর পন্থিরাই কেবল এই আকীদাহ বা বিশ্বাস রাখে এবং এরাই হচ্ছে এই মতবাদের জনক।

                  কেন বলেন?

নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নূর দ্বারা তৈরী বলার পিছনে দুটি কারণের যে কোন  একটি থাকতে পারে :-

প্রথম কারণ: অতিরিক্ত সম্মাান প্রদর্শন ।

নূরী ভাইদের যুক্তি হচ্ছে, যে নবী শেষ নবী, যিনি সারা বিশ্বের নবী, যিনি নবীদের সাইয়্যেদ বা প্রধান, যাঁর প্রতি স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ও ফেরেস্তাগণ দরূদ পড়েন এবং উম্মতকেও দরূদ ও সালাম প্রেরণ করার নির্দেশ দেন, কিয়ামতের ভয়াবহ দিবসে য়িনিই হিসাব-কিতাবের জন্য মহান আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার সম্মান লাভ করবেন, যিনিই জান্নাতীদের জন্য জান্নাতের দরজা খুলবেন, যিনিই গুনাহগার উম্মতের জন্য সুপারিশ করবেন, আল্লাহ তাআলা যাঁকে হাবীব বলেছেন, যিনি আরোও অসংখ্য গুণাবলী এবং সম্মানের অধিকারী, তিনি আবার আদম সন্তানের মত মাটির কিভাবে হবেন? তাদের জ্ঞান-গরীমা বলে: নূর বা জ্যোতি মাটির চেয়ে উত্তম। তাই তিনি নূরের অন্যান্য লোকদের মত মাটির নয়।

 পর্যালোচনা:

ক- শুধু উপাদানের কারণে কোন সৃষ্ট জীব কি শ্রেষ্ঠ হয়?

ইসলাম প্রিয় ভাইয়েরা! সৃষ্টি জগতে বা পৃথিবীতে আমরা যা কিছু দেখতে পাচ্ছি, সব কিছুর সৃষ্টির একটি মূল ধাতু বা উপাদান আছে। যেমনটি মুসলিম শরীফের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। ফেরেশতাগণকে যে উপাদান দ্বারা তৈরী করা হয়েছে তা হল নূর বা জ্যোতি। জিনদেরকে যা দ্বারা তৈরী করা হয়েছে তাহল আগুন এবং মানব জাতিকে যা দ্বারা তৈরী করা হয় তা হল মাটি। এখন প্রশ্ন হল, উপাদান  হিসাবে জ্যোতি, আগুন বা মাটি কি এক অপরের উপর অধিক মর্যাদা রাখে, না রাখেনা? এর জবাব হচ্ছে, না কোন মর্যদা রাখেনা। কারণ সকল উপাদানের সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন মহান আল্লাহ তাআলা এবং ঐসকল উপাদান দ্বারা তৈরীকৃত জীব বা বস্তুরও স্রষ্টা মহান আল্লাহ।  আর তিনি কোন বিশেষ উপাদানকে অন্য উপাদানের উপর সম্মান দেননি। তাই উপাদান হিসাবে সব সমান এবং উপাদান দ্বারা যা তৈরী তাও সমান। সে মানুষ হোক বা জ্বিন হোক বা ফেরেশতা। হ্যাঁ! যে কারণে সৃষ্টির মর্যাদা বৃদ্ধি হয়, তাহল তাদের গুণ এবং তাদের নেক আমল। ফেরেশতাগণ নূরের তৈরী হওয়া সত্ত্বেও সমষ্টিগতভাবে মানুষের চেয়ে উত্তম নয়। তবে এটা সত্য যে বিশেষ কিছু ফেরেশতা, বিশেষ কিছু মানুষের চেয়ে উত্তম কিন্তু সাধারণতঃ আদম (আঃ) ও আদম সন্তান ফেরেশতাদের থেকে উত্তম । কারণ তাদের মধ্যে শুধু  সৎ কাজ করার স্বভাব নেই বরং অসৎ কাজে লিপ্ত হওয়ারও ক্ষমতা আছে। চাইলে সৎ পথে থাকতে পারে না চাইলে অসৎ পথে চলতে পারে। পক্ষান্তরে ফেরেশতাগণের স্বভাবে আছে আনুগত্বতা তাই তারা সবসময় সৎ কাজে নিয়োজিত। এই সব কারণে নেক বান্দা ফেরেশতার চেয়েও উত্তম। পৃথিবীর অসংখ্য লোভ লালসা এবং শয়তানের অবিরাম চক্রান্ত ও কুমন্ত্রণা থাকা সত্ত্বেও সৎ পথে অটল থাকে এবং মহান আল্লাহ তাআলার আদেশ লংঘন করেনা। (দেখুন, শারহুত্ তাহাবিয়াহ ২৮১-২৯০ এবং মাউযু আউর মুনকার রিওয়ায়িত)

খ-  উপাদানের কারণে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ, ইবলিসের যুক্তি ঃ-

আমরা বেশীর ভাগ মানুষই জানি যে, আল্লাহ তাআলা আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করার পর ফেরেশতাগণকে সিজদা করতে আদেশ করেন। সমস্ত ফেরেশতা আদেশ পালন করতঃ সিজদা করেন। কিন্তু  ইবলিস শয়তান সিজদা করতে অস্বীকার করে এবং যুক্তি পেশ করে। যুক্তিটি আল্লাহ তাআলা কুরআনে বর্ণনা করেন ঃ

 ( قا لَ أنَا خيرٌ منه خلقتنى مِن نارٍ و خلقته من طين ) الأعراف/১২

অনুবাদঃ (ইবলিস বলে আমি তার (আদম) থেকে উত্তম। আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন আর ওকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।) [সূরা আরাফ/ ১২]

ইবলিস শয়তানের ধারণা, আগুন মাটির চেয়ে উত্তম। কিন্তু আসলে তার ধারণা কি ঠিক? প্রকৃতপক্ষে আগুন কি মাটির তুলনায় উত্তম? ভেবে দেখলে আগুন নয় মাটিই  উত্তম। কারণ আগুনের স্বভাবে রয়েছে ক্রোধ, রাগ, জ্বালা, যন্ত্রণা, অহংকার এবং দাম্ভিকতা। আর সে কারণেই সে আদমের কাছে মাথা নত করেনি। যেমন তার স্বভাব হচ্ছে নিজের কাছাকাছি বস্তুকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া। অন্যদিকে মাটির স্বভাবে রয়েছে বিনয়, নম্রতা, আত্মসমর্পণ এবং আনুগত্য। আর এ কারণেই  আদম সন্তান আনুগত্য করে চলেছে। ভুল-ত্র“টির সময় আত্মসমর্পণ করছে তার রবের নিকটে। মাটির স্বভাবে রয়েছে বৃদ্ধির ক্ষমতা, ধংসের নয়। তাই তার গর্ভ থেকে জম্ম নেয় হাজার হাজার উদ্ভিদ। সবুজ রঙ্গে রঙ্গানর ক্ষমতা আছে তার মধ্যে। পক্ষান্তরে এই সব কিছুকে ধংস করার ক্ষমতা রাখে আগুন। আরো এক ধাপ এগিয়ে দেখলে দেখা যায়, আল্লাহ জাহান্নামে যে ভয়ঙ্কর আযাবের বর্ণনা দিয়েছেন, তা হচ্ছে আগুনের আযাব। যদি আগুন মাটির চেয়ে ভালই হত, তাহলে মনে হয় জাহান্নামে আগুন দ্বারা নয় মাটি দ্বারা শাস্তি দেয়া হত।

          মোটকথা, সৃষ্টি জগতের কোন উপাদান কারো অপেক্ষা অতিরিক্ত মর্যাদা রাখে, এই ধারণার সূচনা হয় ইবলিস শয়তান থেকে। তাই যদি কোন ভাই ধারণা করে যে, নূরের সৃষ্টি হলেই মর্যাদাবান হবে, নচেৎ নয়। তাহলে তার ধারণা সঠিক নয়। কারণ সব উপাদানের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ। হ্যাঁ, যে কারণে কোন উপাদান বা বস্তু মর্যাদা লাভ করে , তাহল  তার গুণগত বৈশিষ্ট। প্রিয় নবী (সাঃ) এর মধ্যে যে গুণাবলী  ছিল, সৃষ্টিকুলের উপর শ্রেষ্ঠ হওয়ার জন্য তাই যথেষ্ট ছিল। নূরের তৈরী বলেই যে তিনি শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছিলেন এমন কথা নয়।

গ-নূর দ্বারা সৃষ্টি জাতির উপর মাটি দ্বারা সৃষ্টি জাতির মর্যাদা:

কারো যদি মনে হয় যে, নূরের তৈরী হলেই সর্বসম্মানীয় হয়। আর মাটির তৈরী হলে সম্মান কম হয়। তাহলে তাদের আরো বলবঃ মহান আল্লাহ নিজেই মাটির মানুষকে নূরের তৈরী সৃষ্টির চেয়ে সম্মান দিয়েছেন। আল্লাহ যখন আদম (আঃ) কে নিজ হাতে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করে জীবন দান করেন, তখন নূরের তৈরী ফেরেশতাগণকে আদেশ করেন তাঁকে সিজদা করতে। ফেরেশতাগণ সাথে সাথে সিজদা করেন। করেনি কেবল ইবলিস শয়তান। সূরা বাকারার ৩৪ নং আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ

( وَ إذ قُْلنَا للملائكةِ اسْجُدُوا لأدمَ فَسَجَدُوا إلاّ إْبِليسَ أبَى واستكبَرَ وكان من الكافِرِين) البقرة/৩৪

অনুবাদঃ- (এবং যখন আমি আদম (আঃ) কে সিজদা করার জন্য ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিলাম, তখন ইবলিস ব্যতীত সবাই সিজদা করলো। সে নির্দেশ পালনে অস্বীকার করল এবং অহংকার প্রদর্শন করল, ফলে সে কাফিরদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেল।)

ফলকথাঃ- আদম মাটির তৈরী হওয়া সত্বেও নূরের তৈরী ফেরেশতাগণ তাকে সিজদা করেন। যা দ্বারা নূরের চেয়ে মাটির সম্মান বেশী, প্রমাণ হয়। তাই যদি কোন ব্যক্তি বলে যে, মাটি থেকে নূরের সম্মান বেশী, তাহলে সেটা হবে তার ব্যক্তিগত নিছক ধারণা মাত্র। কুরআনের আয়াতটি তার ধারণা বতিলে যথেষ্ট।

দ্বিতীয় কারণঃ   ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য।

 নবী (সা:) কে আল্লাহর নূরের তৈরী বলার পিছনে আর একটি অভ্যন্তরীণ কারণ থাকতে পারে যা সাধারণ জনগণের কাছে অস্পষ্ট, তা হল : যদি প্রমাণ করতে পারা যায় যে, নবী (সা:) আল্লাহর নূরের তৈরী। তাহলে প্রমাণিত হল যে নবী হচ্ছেন আল্লাহরই একটি অংশ বা তাঁর মধ্যে আল্লাহর বিশেষ অংশ নিহিত আছে। তাই যেমন আল্লাহ তাআলা সর্বসম্মানীয় তেমনি তাঁর নবীও। যেমন আল্লাহ তাআলার কাছে দু’আা করা, চাওয়া, ফরিয়াদ করা, নযর-মান্নত করা, কুরবানী করা ইত্যাদী  জায়েয। তেমনি এসব তাঁর নবীর কাছেও করা যায় এবং এই ধারণা রাখা যায়। আর নবীর কাছে যদি এসব করা বৈধ হয়, তাহলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এও বলে গেছেন ঃ

 “و إن العلماء ورثة الأنبيا”
অর্থঃ-‘‘উলামাগণ নবীদের উত্তরাধিকারী ।’’ [আবু দাউদ, কিতাবুল ইলম, হাদীসটিকে শাইখ আলবানী  (রহ:) সহীহ বলেছেন।

 ফলে আমরা পীর-ফকীররাই হচ্ছি আলেমের দল। প্রকৃতপক্ষে আলেম কে সেটা পরের কথা। আমরাই হচ্ছি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দায়িত্ব বহনকারী। তাই যেমন নবী (সা:) সম্মান ও ভালবাসার পাত্র,তেমন আমাদেরকেও সম্মান ও খতির করা জনসাধারণদের জরূরী। যেমন নবীজীকে সাহাবায়ে কেরামগণ সম্মান করতেন, তেমন জনসাধারণকেও আমাদের করতে হবে। মুরগি পোলাও তৈরী করা, হাথ-পা ধুয়ে দেওয়া, ব্যবহৃত পানি পান করা, হাতে-কপালে চুমু খাওয়া, তাযীমী সিজদা গ্রহণ করা, নযরানা-উপঢৌকন পেশ করা সব জায়েয। অনুরূপ আমাদের সন্তুষ্ট রাখলে আমরা সুপারিশ করে তোমাদের ক্ষমা করাব। তাই অবুঝ লোকেরা পীরের সন্তুষ্টির জন্য যাবতীয় কাজ করে। নিজের আব্বা-আম্মার জন্য যা করা হয়না পীরের জন্য তা করা হয়। শুধু তাই নয় সাধারণ জনগণকে বুঝান হয়, তারা নাকি মৃত্যুবরণ করেনা। ফলে জীবিত ও মৃত উভয় সময়েই মানুষ তাদের জন্য নযর-মান্নত, শিরনি, চাদর দান ইত্যাদি করে থাকে। মোট কথা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ও স্বার্থ-সিদ্ধির কারণে তারা বলে থাকে যে, নবী নূরের তৈরী যা, জনসাধারণ বুঝতে পারেনা।

********

প্রিয় নবীর প্রকৃত সম্মান

প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে আল্লাহ তাআলা অনেক সম্মানে ভূষিত করেন। কোন ব্যক্তি যদি আল্লাহর দানকৃত সম্মানের উর্ধ্বে সম্মান দিতে চায়, তাহলে সেটা আসল সম্মান নয় বরং এটা হবে আল্লাহর উপর বাড়াবাড়ি। নিুে কুরআন ও হাদীসে প্রমাণিত বিশেষ কয়েকটি সম্মানের বর্ণনা দেয়া হল ঃ-

আল্লাহ তাআলা বলেন ঃ

(مَا كَانَ مُحمدٌ أبَا أحَدٍ مِن رِّجَالِكُم ولكِنْ رَسُولَ اللهِ و خَاتَمَ النَّبِيِّين ) الأحزاب/৪০

অনুবাদ ঃ- (মুহাম্মদ তোমাদের কোন ব্যক্তির পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী।) [আল্ আহযাব/ ৪০]

       রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন ঃ ‘‘ আমার এবং বিগত নবীদের উদাহারণ তার মত, যে একটি সুন্দর প্রাসাদ নির্মাণ করল। কিন্তু একটি ইটের স্থান ছেড়ে দিল। মানুষেরা সেই প্রসাদটিকে ঘুরে ফিরে দেখে এবং তার সৌন্দর্যে মোহিত হয়। তবে সবাই বলে যদি সেই ইটটি লাগান হত তো কতই না সুন্দর লাগত! নবী (সা:) বলেনঃ আমিই সেই ইট, আমিই নবীগণের মধ্যে শেষ নবী।’’ [বুখারী, কিতাবুল মানাকীর, হাদীস নং ৩৫৩৫]

       তিনি (সাঃ) আরো বলেনঃ ‘‘ অন্যান্য নবীদের তুলনায় আমাকে ছয়টি বিষয়ে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আমাকে জাওয়ামেউল- কালেম (অল্প শব্দে ব্যাপক অর্থ) দান করা হয়েছে। আমাকে ভীতি দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে। (অর্থাৎ শত্র“কুল আমার ভয়ে ভীত সস্ত্রস্ত হয়ে পড়ে )  আমার উম্মতের জন্য গনীমতের সম্পদ হালাল করা হয়েছে। সারা পৃথিবীর মাটি পবিত্র এবং মসজিদে পরিণত করা হয়েছে।  আমাকে সমগ্র মানব জাতির উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়েছে এবং আমার আগমনের মাধ্যমে নবীগণের আবির্ভাব সমাপ্ত হয়েছে।’’     [মুসলিম, কিতাবুল মাসাজিদ, হাদীস নং ১১৬৭]

     তিনি (সাঃ) আরো বলেনঃ- ‘‘ কিয়ামত দিবসে আমি হ্ব আদম সন্তানদের প্রধান। আর এতে গর্বের কিছু নেই এবং আমার হাতে থাকবে প্রশংসার ঝান্ডা এতেও অহংকারের কিছু নেই।’’ [ তিরমিযী, আবওয়াবুত তাফসীর, সূরা বনী ইসরাইল, হাদীস নং ৩৩৫৭]

       তিনি (সাঃ) আরো বলেনঃ‘‘ কিয়ামত দিবসে আমিই আদম সন্তানের প্রধান। আমিই কবর হতে প্রথমে উঠব। আমিই হব প্রথমে সুপারিশকারী এবং আমারই  সুপারিশ প্রথমে কবূল করা হবে।’’ [মুসলিম, কিতাবুল ফাযায়েল, হাদীস নং ৫৮৯৯]

       তিনি (সাঃ) আরো বলেনঃ‘‘ আল্লাহ তাআলা ইসমাঈল (আঃ) এর সন্তান হতে কিনানা গোত্রকে নির্বাচন করেছেন। আর কিনানা গোত্র হতে কুরাইশ গোত্রকে নির্বাচন করেছেন। আর কুরাইশ গোত্র হতে বানু হাশেমকে নির্বাচন করেছেন এবং বানু হাশেম হতে আমাকে নির্বাচন করেছেন।’’ [মুসলিম, কিতাবুল ফাযায়েল, হাদীস নং ৫৮৯৭]

নবী (সাঃ) তাঁর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি নিষেধ করেছেন।

         আসলে প্রত্যেক বিষয়ে বাড়াবাড়ি অপছন্দনীয়। বিশেষ করে তা যদি শরিয়তের ব্যাপারে হয়, তাহলে সেটা চরম অপরাধ এবং জঘণ্য কাজ। বিগত উম্মতেরা তাদের নবীদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করার কারণে কাফের ও মুশরিক হয়ে গেছে, যেমন নাসারা বা খৃষ্টানরা তাদের নবী ঈসা (আঃ) কে আল্লাহর সন্তান বলেছে। অন্যদিকে ইহুদীরা উযাইরকে আল্লাহর পুত্র বলে আখ্যা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাদের এই জঘণ্য ধারণার ব্যাপারে বলেনঃ-

( و قَالتِ اليهُودُ عُزَيرٌ ابنُ اللهِ وَ قَالتِ النَّصارَى المَسِيحُ ابنُ اللهِ ذلِك قَولُهم بِأفوَاهِهم يُضَاهِؤنَ قَولَ الذينَ كَفَرُوامِن قَبلُ، قَاتَلَهُم اللهُ أنّى يُؤفَكُون ) التوبة/৩০

অর্থঃ- (ইহুদীরা বলে, উযাইর আল্লাহর পুত্র এবং নাসারারা বলেঃ মসীহ আল্লাহর পুত্র। এ হচ্ছে তাদের মুখের কথা। এরা পূর্ববর্তী কাফেরদের মত কথা বলে। আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন, এরা কোন্ উল্টা পথে চলে যাচ্ছে।) [সূরা তওবা-৩০]

নবী (সাঃ) বিগত উম্মতের এই প্রকারের বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করেছিলেন এবং নিজ উম্মতের মধ্যেও তার আশংকা করেছিলেন। তাই তিনি উম্মতকে সতর্ক করে দিয়ে বলেনঃ

” لا تُطرُونى كما أطرتِ النصارى ابن مريم إنّما أنا عبدٌ فقولواعبدُ الله و رسوله ”  متفق عليه

অর্থঃ- ‘‘তোমরা আমাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করবেনা, যেমন নাসারারা মরিয়মের পুত্রের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছে। নিঃসন্দেহে আমি হচ্ছি আব্দ বা দাস।  তাই তোমরা বল আল্লাহর বান্দা বা দাস এবং তাঁর রাসূল।’’  [ বুখারী,মুসলিম ]

তিনি (সাঃ) আরো বলেনঃ

” إيّاكم والغُلُوّ، فإنّما أُهلِكَ من كانَ قبلكم الغلوّ “- البخارى-

অর্থঃ ‘‘ অতিরঞ্জন হতে সাবধান! কারণ অতিরঞ্জনই বিগত উম্মতকে ধংস করেছে।’’  [ বুখারী ]

 প্রিয় নবীর এই ইরশাদকে পড়লে এটাই জানা যায় যে, তিনি তার প্রিয় উম্মতকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন: বিগত উম্মতেরা বিশেষ করে খৃষ্টানরা, তাদের নবী ঈসা (আঃ) এর ব্যাপারে অতিরিক্ত শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছে। আর এই সম্মানই তাদের পথ ভ্রষ্টের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। তারা বলেছে ঈসা (আঃ) হচ্ছেন আল্লাহর পুত্র।  তাই তোমরা আমার ব্যাপারে ঐরূপ কথা বলনা। আমাকে আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল বলে  ডাকবে। নবীজীকে কি বলে ডাকতে হবে, তাঁর কতখানি প্রশংসা করতে হবে, তিনি নিজেই তা বলে গেছেন। কিন্তু আজ তার উম্মতের একটি দল বাড়াবাড়ি করে চলেছে।  তারা বলছে: নবীকে আল্লাহ তার নূর দিয়েসৃষ্টি করেছেন এবং তাঁকে সৃষ্টি না করলে আসমান-যমীন জন্নাত-জাহান্নাম কিছুই তৈরী করা হতনা।

        নবীজী আল্লাহর নূরের তৈরী, এই মত বা ধারণার মাধ্যমে এটাই প্রমাণ হয়, যে মোহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহরই একটি অংশ। এই আকীদাহ বা বিশ্বাস এবং খৃষ্টানদের আকীদাহ যে, ঈসা আল্লাহর পুত্র, দুটির মধ্যে কি আসলে কোন পার্থক্য আছে? একজন আল্লাহর সন্তান আর একজন আল্লাহর সত্তার নূরের। আল্লাহ যেন আমাদের বুঝার সুমতি দেন! আমীন!

*****************

 দ্বিতীয় অধ্যায়

মুহাম্মদ (সাঃ) মানুষ ছিলেন,  আল্লাহর নূর ছিলেন  না।

দলীলাদি ঃ

আগেই বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক দল লোক নবী (সাল্লাল্লাহু আলাই হি ওয়া সাল্লাম) এর সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে, তাঁকে মানব জাতির গন্ডি থেকে বের করে নূরী জাতির দলে প্রবেশ করিয়েছে এবং বলেছে মুহাম্মদ (সাঃ) সাধারণ মানুষের মত মাটি দ্বারা তৈরী ছিলেননা বরং তাঁকে তৈরী করা হয়েছিল আল্লাহর নূর বা জ্যোতি দ্বারা। নিুে পবিত্র কুরআন, সহীহ হাদীস এবং সুষ্ঠু বিবেক দ্বারা কিছু প্রমাণ পেশ করা হল, যা দ্বারা সত্য প্রকাশ পাবে যে, নবীজী নূরের সৃষ্ট না মাটির সৃষ্ট।

প্রথম দলীল ঃ- পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেনঃ                         
( قُل إنّما أنَا بَشَرٌ مِثلُكم يُوحى إلىَّ أنّما إلاهُكُم إلهٌ واحِدٌ فَمن كانَ يَرجُوا ِلقاءَ رَبِّه فليَعمَل عَمَلاً صَالحاً و لا يُشرِك بِعِبادةِ   ربِّه أحداً ) الكهف /১১০

অনুবাদঃ- (হে নবী! তুমি বলে দাও, আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ, আমার প্রতি অহী (প্রত্যাদেশ) হয় যে, তোমাদের মাবুদ কেবল একক, সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাত কামনা করে সে যেন সৎ কর্ম করে ও তার ইবাদতে কাউকে শরীক না করে।) [কাহাফ/ ১১০]

প্রমাণ করণঃ উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা নবী মুহাম্মদ (সাঃ) কে বলতে বলেন যে,তিনি আমাদের মতই মানুষ। তাই অন্যান্য মানুষ যেমন মাটির তৈরী তিনিও তেমনি মাটির তৈরী এবং মানুষ জাতির অন্তর্ভূক্ত। কারণ সকল মানুষের পিতা আদম (আঃ)। আর আদমকে আল্লাহ মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। তবে মহানবী (সাঃ) এবং অন্যান্য মানুষের মধ্যে পার্থক্য হল, তাঁর কাছে অহী আসে কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে অহী আসেনা। আর এই অহীই হচ্ছে বিরাট মর্যাদা যা নবী ছাড়া অন্য লোক লাভ করতে পারেনা।

‘‘বাশার’’ শব্দের অপব্যাখ্যা

প্রিয় পাঠকবৃন্দ! আয়াতে বর্ণিত ‘‘বাশার’’ শব্দের অর্থ ‘‘মানুষ’’। কিন্তু নূরী ভাইয়েরা যেন কসম খেয়ে বসেছে যে নবীজীকে নূরের প্রমাণ করাতেই হবে। আর সে কারণে তারা এই শব্দটির অপব্যাখ্যা করতেও দ্বিধা করেন না। এই আয়াতটি যখন তাদের সামনে পেশ করা হয় তখন অনেকেই বলে যে, ‘বাশার’ মানে যে শুধু মানুষ তা কে বলল? বাশারের মানে তো চামড়াও হয় এবং এখানে চামড়াকেই বুঝান হয়েছে।  সে কারণে নবী (সাঃ) এর শরীরের উপরাংশ চামড়া দিয়ে আবৃত ছিল আর ভিতরটা ছিল নূরের।

এবার ‘বাশার’ শব্দের অর্থ আরবী অভিধান হতে তুলে ধরা হল ঃ বিশিষ্ট অভিধানিক ফিরূযাবাদী, আলকামুস আল মুহীতে বলেন ঃ

‘‘আলবাশার’’ অর্থাৎ ইনসান বা মানুষ, পুংলিঙ্গ স্ত্রীলিঙ্গ, এক বচন দ্বীবচন এবং বহুবচন সব ক্ষেত্রে একই ভাবে ব্যবহৃত হয়। কোন কোন সময় দ্বীবচন ও বহুবচন লক্ষ্য করা যায়। বহু বচনে বলা হয় ‘আবশার’। এবং বাশার শব্দটি চামড়ার অর্থেও ব্যবহার হয়। (আল কামুস আল মুহীত, বাবুর রা, ফাসলুল বা, পৃঃ ৪৪৭)  অনুরূপ দেখুন, আল মুজাম আল ওয়াসীত ১ম খন্ড পৃঃ ৫৮। তবে তিনি চামড়ার অর্থবোধক শব্দ আলাদা করে বন্ধনীর মধ্যে ‘‘আলবাশারাহ’’ লিখেছেন। মোট কথা ঃ- যে কোন আরবী অভিধান খুললেই ‘বাশার’ শব্দের অর্থ ইনসান বা মানুষ রূপে পাওয়া যায়। আর উপ অর্থ চামড়া লক্ষ্য করা যায়। এখন কথা হল আসল অর্থ নেব না গৌণ অর্থ নেব? তর্কের খাতিরে উপঅর্থ চামড়া ধরেই নিলাম কিন্তু এই অর্থে কুরআন মজীদের আয়াতটি কি ব্যবহৃত হয়েছে? চামড়ার অর্থ নিলে আয়াতটির অনুবাদ হবে এই রকমঃ (হ নবী তুমি বলে দাও। আমি তো তোমাদের মতই এক চামড়া…) আর আসল অর্থ নিলে অর্থ হবেঃ (আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ…)। প্রথম অর্থটি একটি বেমানান ও হাস্যকর কথা। মহান আল্লাহর বাণী এই রকম কথা বার্তা হতে পূত-পবিত্র। কারণ মানুষ নিজের পরিচয় দেয়ার সময় বিশেষ গুনের বর্ণনা দেয়, যেমন বলে আমি আপনাদের মতই একজন সাধারণ মানুষ।  বা আমি একজন শিক্ষক বা আমি একজন ব্যবসায়ী। কিন্তু কেউ যদি বলে আমি তোমাদের মতই হাড় বা মাংস বা চামড়া।  তাহলে কথাটি হবে হাস্যকর ও বেমানান। সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন ব্যক্তি এই ধরণের উত্তর দিতে পারেনা। প্রকৃতপক্ষে মানুষ কুরআনের মধ্যে পরিবর্তন করতে পারবেনা। কারণ আল্লাহ তাআলা কুরআনের হিফাজতের দায়িত্ব নিজে নিয়েছেন। কিন্তু নিজের মতলবের উদ্দেশ্যে অর্থের বিকৃতি ও অপব্যাখ্যা অনেকে করেছে এটি তার একটি দৃষ্টান্ত মাত্র।

পয়গম্বর হওয়া এবং মানুষ হওয়া এ দুটি অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট।

জেনে রাখা ভালো যে, কারো পয়গম্বর বা নবী-রাসূল হওয়া আর তার মানুষ না হওয়া, এটি অসম্ভব এবং অবাস্তব বিষয়। অর্থাৎ কেউ নবী বা রাসূল হবেন আর তিনি মানুষ হবেন না এটা হতেই পারেনা।

সে কারণে পৃথিবীর প্রথম থেকে নিয়ে শেষ নবী পর্যন্ত যত নবী এবং রাসূল এসেছেন সবাই মানুষ ছিলেন। মানুষ যা দ্বারা তৈরী তাঁরাও তা দ্বারা তৈরী ছিলেন। অন্য কোন উপাদান দ্বারা তাঁদের সৃষ্টি করা হয়নি। তাঁদের সকলের মানুষ হওয়াও আবশ্যিক ছিল। কারণ তাঁদেরকে মানব জাতির হিদায়েতের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়েছিল। মহান আল্লাহ এই বিষয়টি স্পষ্ট ভাবে কুরআনে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন ঃ

( قُل لَو كَانَ فى الأَرضِ مَلائِكَةٌ يَمشُونَ مُطمَئِنَّين لَنزَّلنا عليهم من السَّماءِ ملَكاً رَسولاً ) الإسراء/৯৫

অনুবাদঃ (লোকেদের বলে দাও! ফেরেশতারা যদি নিশ্চিন্ত হয়ে পৃথিবীতে চলা ফেরা করতো তবে আমি আকাশ হতে ফেরেশতাকেই তাদের নিকট রাসূল করে পাঠাতাম।)  [সূরা ইসরা/৯৫]

বুঝা গেল, এই বিশাল পৃথিবীতে যে জাতি বসবাস করে তাদের হিদায়েতের জন্য তাদের মধ্য থেকেই কোন এক ব্যক্তিকে রাসূল করে পাঠান হয়। অন্য কোন জাতি বা অন্য কোন উপাদান দ্বারা তৈরী কোন ব্যক্তিকে রাসূল করে পাঠান হয়না। তাই আমরা মানুষ আমাদের নবীও মানুষ এবং এতেই আমাদের গর্ব।

দ্বিতীয় দলীল ঃ মক্কার মুশরেকদের উক্তি ঃ

নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) যে মানুষ ছিলেন সেটা মক্কার মুশরিকরাও বলত ও বিশ্বাস রাখত । তাঁকে ও বিগত আম্বিয়াগণকে কাফেরদের অবিশ্বাস করার কারণও ছিল এটি যে, তাঁরা সকলে ছিলেন তাদের মতই মানুষ। তারা বলত আমাদের মত মানুষ আবার নবী কিভাবে হয়? তারা সেই সময় যা বলেছিল, আল্লাহ কুরআনে তা বর্ণনা করেন। এরূপ কয়েকটি উক্তি নিুে বর্ণনা করা হল ঃ

১-( و ما مَنَعَ النَّاسَ أن يُؤمنوا إذ جَاءَهم الهُدى إلآ أن قَالوا أبعثَ اللهُ بشَراً رَسولاً ) الإسراء/৯৪

 অনুবাদ ঃ (আল্লাহ কি মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন? তাদের এই উক্তিই মানুষকে ঈমান আনয়ন থেকে বিরত রাখে, যখন  তাদের  নিকট আসে হিদায়েত।) [ইসরা/৯৪]

২- ( ما هذا إلا بشرُ مثلكم يأكل ممّا تأكلون منه و يشربُ ممّا تشربون، ولئن أطعتم بشراً مثلكم إنّكم إذاً لخاسرون)المؤمنون/৩৩-৩৪

অনুবাদ ঃ তারা বলতঃ (এ তো তোমাদের মতই একজন মানুষ। তোমরা যা খাও সে তাই খায় এবং তোমরা যা পান কর, সেও তাই পান করে। যদি তোমরা তোমাদের মতই একজন মানুষের আনুগত্য কর,তবে তোমরা নিশ্চিত রূপেই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। )    [আল মুমেনূন/৩৩-৩৪]

৩- ( وما أرسلنا قبلك من المرسلين إلا إنّهم ليأكلون الطعام و يمشون فى الأسواق) الفرقان/২০

অনুবাদ ঃ ( আপনার পূর্বে যত রাসূল প্রেরণ করেছি, তারা সবাই খাদ্য গ্রহণ করত এবং হাটে-বাজারে চলা ফেরা করত। )               [আল ফুরকান/২০]

বর্ণিত আয়াত সমূহে বলা হয়েছে যে, বিগত উম্মতের লোকেরা তাদের নবীগণকে অস্বীকার করেছিল এ বলে যে, তোমরা আমাদের মতই মানুষ। একই ভাবে আমাদের নবী (সাঃ) এর বেলাও কাফেরে কুরাইশরা বলেছিলঃ তুমি তো আমাদের মতই মানুষ। যদি আল্লাহ কোন ফেরেশতাকে নবী করে পাঠাতেন তো আমরা ঈমান আনতাম। তখন আল্লাহ তারঁ রাসূল (সাঃ) কে বলতে বলেন যে, আমার পূর্বে যেসব নবীগণ এসেছেন তারাও তো মানুষ ছিলেন, খাবার খেতেন, হাটে-বাজারে বেড়াতেন। তোমরা তাদের বিশ্বাস কর। তবে আমাকে কেন অস্বীকার কর? অর্থাৎ মুহাম্মদ (সাঃ) যদি তাদের মত মানুষ না হয়ে নূরের তৈরী ফেরেশতার মত হতেন, তাহলে তাদের ঈমান আনতে কোন বাধা ছিলনা। তাদের ঈমান আনতে যা বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তা হল মুহাম্মদ (সাঃ) এর মানুষ হওয়া। বুঝা গেল, সেই যুগের কাফেররাও নবী মুহাম্মদ (সাঃ) কে তাদের মত মানুষ মনে করত। কিন্তু বর্তমান যুগের কিছু অবুঝ মুসলমান তাদের চেয়েও যেন বেশী বুঝল।

তৃতীয় দলীল ঃ- হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যোহরের নামায চার রাকাআতের পরিবর্তে পাঁচ রাকাআত পড়ালেন। নামায শেষে এক সাহাবী  তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন: নামায কি আল্লাহর পক্ষ হতে বেশী করে দেওয়া হয়েছে? নবী (সাঃ) অন্য সাহাবাদের বলেন: কি ব্যাপার সে কেন এই প্রশ্ন করছে? উত্তরে তাঁরা বলেন: আপনি পাঁচ রাকাআত নামায পড়িয়েছেন তাই সে জিজ্ঞাসা করছে। তখন তিনি (সাঃ) সালামের পর দুটি সিজদা করেন। অপর এক বর্ণনায় এসেছে, নবী (সাঃ) বলেনঃ

” إنّما أنا بشرٌ أنسى كما تنسَون، فإذا نسيتُ فذكِّرونى”( مسلم )

অনুবাদ: ‘‘আমি একজন মানুষ। তোমরা যেমন ভুলে যাও, আমিও তেমন ভুলে যাই। তাই আমি যদি ভুলে যাই, তোমরা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেবে।’’ [মুসলিম,আল মাসাজিদ, হাদীস নং ১২৭৪]

     বর্ণিত হাদীসে নবী (সাঃ) বলেন: আমি মানুষ এবং যেমন মানুষ ভুলে তেমন আমিও ভুলে যাই। বুঝা গেল, তিনি মানুষ ছিলেন এবং মানুষের স্বভাবও তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল, তাই মানুষ যা দ্বারা তৈরী তিনিও তা দ্বারা তৈরী ছিলেন।

চতুর্থ দলীল ঃ- উম্মে সালামাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন ঃ

” إن رسول الله صلى الله عليه وسلم سمع خصومةً بباب حجرتِه، فخرج إليهم فقال: إنما أنا بشر و إنه يأتينى الخصم فلعلّ بعضكم أن يكون أبلغ من بعض فأحسب أنه صادق فأقضى له بذالك، فمن قضيت له بحق مسلم، فإنما هى قطعة من النار فليأخذها أو ليتركها “( البخارى والمسلم)

একদা নবী (সঃ) তাঁর দরজার নিকট ঝগড়ার শব্দ শুনতে পেলেন। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন:‘‘ আমি একজন মানুষ, আমার কাছে বিবাদীরা ফয়সলা নিতে আসে। তাদের মধ্যে কেউ অন্যের চেয়ে স্পষ্ট ভাষী হয়। (গচ্ছিত আকারে সুন্দর ভাবে মিষ্টি ভাষায় কথা বলে) শুনে আমার ধারণা হয় সেইই সত্য, তাই তার পক্ষে ফয়সলা দেই। এরকম ফয়সালা দিতে গিয়ে কোন মুসলিম ব্যক্তির হক যদি অন্যের পক্ষে চলে যায়, তাহলে মনে রাখবে, সেটি হচ্ছে জাহান্নামের আগুনের একটি টুকরো। সুতরাং সে তা গ্রহণ করুক বা প্রত্যাখ্যান করুক।’’ [বুখারী, মাযালিম,হাদীস নং ২৪৫৮, মুসলিম, আকযিয়াহ, হাদীস নং ৪৪৭৫]

এ হাদীস থেকেও প্রমাণিত হয় যে, নবী (সাঃ) মানুষ ছিলেন। তাই মানুষ যা দ্বারা তৈরী, তিনিও তা দ্বারা তৈরী ছিলেন।

সুষ্ঠু বিবেক হতে কিছু প্রমাণ ঃ

১-   আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে প্রজননের যে পদ্ধতি রেখেছেন তা হল, প্রত্যেক জাতির সাথে তার স্বজাতির মিলন। মানুষের মিলনে মানুষ। গরুর মিলনে গরু। ছাগল ভেড়ার মিলনে ছাগল ভেড়া। এই নিয়ম বিরাজ করছে সারা পৃথিবীতে। আর এটাই হল প্রজননের নিয়ম বা স্বভাব। তাই পৃথিবীতে কোথাও শোনা যায়না যে, অমুক দেশে মানুষের পেট থেকে পশুর জম্ম হয়,বা তমুক দেশে জীব-জন্তুর পেট থেকে মানব সন্তানের জম্ম হয়। এরকমও হয়না যে, বিশেষ কোন দেশের বা স্থানের মহিলারা লোহা, কাঁচ, বা প্লাস্টিক জম্ম দেয়। মানুষের পেট থেকে যেমন মানুষ ছাড়া অন্য কিছু জম্ম নেয়না, তেমন সাধারণ ভাবে আমাদের এটাই বিশ্বাস রাখতে হবে যে, নবী (সাঃ) তাঁর আম্মাজান আমিনার গর্ভ হতে জম্মগ্রহণ করেন। আর তিনি ছিলেন মানুষ তাই  তার সন্তানও মানুষ। সাধারণ মানুষের শরীর যেমন রক্ত, মাংস এবং হাড় দ্বারা গঠিত, তেমন নবী (সাঃ) এর শরীরও রক্ত, মাংস এবং হাড়ের ছিল। এমন বলা অযৌক্তিক যে, তাঁর শরীরের রক্ত গোস্ত এবং হাড় ছিল নূর বা জ্যোতির।

২-   নূরী ভাইয়েরা মীলাদুন্নবী প্রভৃতি মহফিলে যখন নবী (সাঃ) এর বর্ণনা দেন, তখন প্রায় ভূমিকায় বলতে শুনা যায়, সমস্ত প্রসংসা আল্লা তাআলার, যিনি মানুষকে আঠার হাজার মাখলুকাতের মধ্য থেকে আশরাফুল মাখলুকাত (সৃষ্টি জগতেরশ্রেষ্ঠ) করে সৃষ্টি করেছেন। আসলে সৃষ্টির সংখ্যা আঠার হাজার না তারও বেশি সেটা পরের প্রশ্ন। কথা হল, সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠ যদি মানবকুল হয়, যারা সকলে মাটির তৈরী আর তার মধ্যে প্রিয় নবীকে যদি বলি, তিনি মাটির নয় জ্যোতির বা নূরের তৈরী, তাহলে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ দল থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হলনা কি? একটু ভেবে দেখুন! অতিরঞ্জিত করতে গিয়ে তাঁর মর্যাদা ক্ষুন্ন তো করিনা ?

৩-   যারা বলেন, নবীজী নূরের তৈরী,তাদের যদি প্রশ্ন করা হয় যে, নূর হতে কি জম্ম নেয়? তাহলে উত্তর পাওয়া যাবে: নূর থেকে নূরই জম্ম নেয়। যেমন মানুষ হতে মানুষ জম্ম নেয়। তাহলে প্রশ্ন জাগে, নূর নবীর সন্তানগণও কি তাহলে নূরের ছিলেন? কিন্তু না, নূরী ভাইয়েরা আবার নবীর     সন্তানগণকে নূরের বলেন না। আব্বা নূরের, সন্তানরা মাটির এটা কি ধরণের যুক্তি।

৪-   আদম (আলাইহিস্ সালাম) কে সৃষ্টি করার রহস্যকে আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্পষ্ট ভাবে বর্ণনা করেছেন। সৃষ্টির পূর্বে ফেরেশতাদের সাথে পরামর্শ।  তাদের মতামত।  নিজ হাতে আদমের শারীরিক কাঠামো তৈরী করণ।  সৃষ্টির পরে জীবন দান।  ফেরেস্তাদের আদমকে সিজদা করার নির্দেশ।  সব কিছুই বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। (দেখুন সূরা বাকারার ৩০-৩৭ নং আয়াত) সাথে হাওয়া (আঃ) এর সিৃষ্টির বর্ণনাও দেওয়া হয়েছে। অন্য স্থানে যেই মহান ব্যক্তির সৃষ্টির রহস্যকে বর্ণনা করেন তিনি হলেন ঈসা (আঃ)। কি ভাবে আল্লাহর আদেশে ঈসা (আঃ) এর মা গর্ভবতী হন। পরে লোকেরা কি বলে। আল্লাহ আবার তাঁকে কি পন্থা অবলম্বন করতে বলেন সব কিছুই আল্লাহ তাআলা বিস্তারিত ভাবে উল্লেখ করেছেন।                              (সূরা মারইয়ামের ১৬-৩৬ নং আয়াত দ্রষ্টব্য। )                                               এই তিনটি ঘটনা দ্বারা আল্লাহ তাআলা মানুষ সৃষ্টির ব্যাপারে    তাঁর অলৌকিক ক্ষমতাকে প্রকাশ করেছেন।  প্রথমত ঃ তিনি বিনা মাতা পিতায় মানুষ তৈরী করতে পারেন যা,  আদম (আঃ) এর ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত। দ্বিতীয়তঃ শুধু পুরুষ দ্বারাই মানুষ তৈরী করতে পারেন, তার  নমূনা হল হাওয়া (আঃ) তৃতীয়তঃ বিনা পুরুষে মানুষ তৈরী করতে পারেন।  তার প্রমাণ  হল ঈসা (আঃ) এর জম্ম রহস্য। এই তিনটি ঘটনা ছাড়া পৃথিবীর সকল মানুষ পিতা মাতার মিলনে জম্ম নেয়। অর্থাৎ সবারই আসল হচ্ছে মাটি। এর মধ্যে যদি কেউ পিতা মাতার মিলনে জম্ম নেয়, আর তার আসল মাটি না হয়ে নূর বা জ্যোতি হয়, তাহলে এটিও একটি বড় রহস্য। এই ধরণের বড় ঘটনার উল্লেখ অবশ্যই কুরআন বা সহীহ হাদীসে থাকা দরকার। কিন্তু না আল্লাহ কুরআনে বলেছেন যে, আমি মানুষের পেট হতে নূরকে জম্ম দিলাম। আর সে হল  হল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আর না নবী (সাঃ) সহীহ হাদীসে বলেনঃ যে, আল্লাহ তাঁকে নূর দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।

৫-   এটা সত্য যে, জিন জাতি আগুনের তৈরী। জিন জাতির সাথে মাটির তৈরী মানব জাতির বিবাহ শাদী হয়না। এখন কথা হচ্ছে নবী (সাঃ) যদি নূরের হন, তাহলে তাঁকে বিবাহ করার দরকার ছিল কোন নূরী জাতির সাথে। কিন্তু এরকম হয়নি। তিনি বিবাহ করেছেন মানব সন্তানকে। এটা প্রমাণ করে, যে তিনি আসলে আমাদের মত মানুষ তাই বিবাহ ও করেছিলেন মানুষকে।

৬-   প্রিয় নবী (সাঃ) যদি মাটির না হয়ে, নূর দ্বারা সৃষ্ট হতেন, তাহলে মানুষেরা বলতে সুযোগ পেত যে, তাঁর পক্ষে এত বেশি বেশি ইবাদত করা, জিহাদ করা, কঠিন মুহুর্তগুলোতে ধৈর্য ধারণ করা এবং আরো অসংখ্য গুনাবলী যা তাঁর মধ্যে ছিল, এইসব এ কারণেই সম্ভব হয়েছিল যে, তিনি আমাদের মত মাটির তৈরী মানুষ ছিলেন না। যদি আমাদের মত হতেন তাহলে এসব সম্ভব হতনা। ফলে নবী (সাঃ) কে অস্বীকার করার পথ প্রশস্ত হত। মানুষ হয়ে এত সব বৃহৎ গুণের অধিকারী হওয়াতেই তাঁর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পায়। কিন্তু নূরের হয়ে এ সমস্ত গুনের অধিকারী  হওয়াতে তাঁর মহত্ব প্রকাশ পায়না।

*********

তৃতীয় অধ্যায়

প্রতিপক্ষের দলীলসমূহ এবং পর্যালোচনা

বেইনসাফী হবে যদি আমি প্রতিপক্ষের দলীলসমূহের বর্ণনা না দেই। তাই তাদের বিশেষ কয়েকটি দলীল  উল্লেখ করব এবং আসলে সে গুলো দলীল না সংশয় তার একটু পর্যালোচনা করব ইনশাআল্লাহ। তার আগে পাঠক ভাইদের জ্ঞাতার্থে বলে দেয়া ভালো মনে করছি যে, আসলে দলীল কাকে বলে? আমাদের জানতে হবে। শরীয়তী বিষয়ে দলীল প্রমাণ হচ্ছে, মহান আল্লাহর বাণী এবং নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সহীহ বা বিশুদ্ধ হাদীস। মাউযূ (জাল) যয়ীফ (দুর্বল) হাদীস কখনও দলীল হতে পারেনা। আর বিশেষ করে এই বিষয়টির সম্পর্ক আকীদার সাথে আমলের সাথে নয়। তাই এ ক্ষেত্রে সহীহ অকাট্ট দলীল থাকতে হবে। একই ভাবে কুরআন-হাদীসের দলীল  মযুদ থাকা সত্ত্বেও বিবেক-বুদ্ধি, অনুমান বা রায় কিয়াস দ্বারা ঢিল ছুড়া কথা-বার্তা কখনও দলীল নয় বরং ওসব হচ্ছে কুরআন ও হাদীসের সাথে বেআদবী। অনুরূপ ভাবে ব্যক্তিগত মত বা দাবির পক্ষে যে  দলীল পেশ করা হবে সেটাও হতে হবে স্পষ্ট। অস্পষ্ট দলীল গৃহীত হবেনা।

তাদের প্রথম দলীল ঃ-  
( يآ أهلَ الكتابِ قد جاءكم رسولُنا يبيِّنُ لكم كثيراً مما كنتم تُخفونَ من الكتاب و يعفُو عن كثير،قد جاءكم من الله نورٌ وَّ كتابٌ مبين) المائدة/ ১৫

অনুবাদ ঃ (হে আহলে কিতাবগণ! তোমাদের কাছে আমার রাসূল আগমন করেছেন। কিতাবের যে সব বিষয় তোমরা গোপন করতে, তিনি তার মধ্য থেকে অনেক বিষয় প্রকাশ করেন এবং অনেক বিষয় মার্জনা করেন। তোমাদের কাছে একটি উজ্বল জ্যোতি এসেছে এবং একটি সুস্পষ্ট গ্রন্থ।) [ আল্ মায়েদাহ/ ১৫]

 তারা বলেন ঃ এই আয়াতে উজ্বল জ্যোতি বলতে মুহাম্মদ (সা:) কে বুঝান হয়েছে এবং এটিই প্রমাণ করে যে, তিনি নূরের তৈরী।

পর্যালোচনা ঃ দলীলটির ব্যাপারে পর্যালোচনা করার আগে একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল।

        তখন আমার বয়স ১৬-১৭ হবে। মাদ্রসার ছাত্র। আমার জনৈক বন্ধুর সাথে এক গ্রামে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সময়টা ছিল সকাল বেলা। সেই বাড়ির মালিক বৃদ্ধ লোক। ভালো লোক। নামায রোযা এবং কুরআন তিলাওয়াত নিয়মিত করতেন। অভ্যাসমত সে দিন সকালেও তিনি কুরআন মজীদ তিলাওয়াত করছিলেন। ঠিক সেই সময় আমাদের এলাকায় একটি মাসআলাকে কেন্দ্র করে যেথা-সেথা ফতুয়া তলব হচ্ছিল। মাসআলাটি ছিল, প্রত্যেক ফরয নামাযের পর ইমাম সাহেবের মুক্তাদীগণকে নিয়ে সম্মিলিতভাবে দুআ করা শরীয়ত সম্মত না  অসম্মত ? যেমনটা আমাদের দেশের বেশীর ভাগ লোকের স্বভাব। এমন অনেক লোক আছে যারা আসলে নামায পড়েনা অথচ চৌরাস্তায়, চায়ের দোকানে জ্বোর গলায় ফতোআবাজী করে। হ্যাঁ! এতদিন ধরে এই রকম করে  আসলাম, এখন এই মৌলবী কোথা থেকে আসল? যত সব মৌলবী! তত সব ফতোআ! এই মৌলবীর পিছনে নামায পড়া যাবেনা। কেউ আবার বলে, নামায হচ্ছে ভাতের ন্যায়  আর দুআ হচ্ছে পানির ন্যায়। ভাত খাওয়ার পর পানি পান না করলে যেমন অবস্থা হয়, তেমন নামায পড়ার পর দুআ না করলে নামাযির অবস্থা হয়। কেউ আবার বলে, আরে সালাম ফিরালে তো নামায শেষ হয়ে যায়, তাহলে তোমরা আবার এনিয়ে এত কেন বাড়াবাড়ি করছিস? শেষ মেষ একটি বড় সিদ্ধান্ত হচ্ছিল এবং এই দলটিই ছিল বড় দল । বাপ দাদার  যুগ থেকে যা করে আসছি তাই করব। মৌলবীরা যাই মন তাই বলুক। তবে একথা কেউই বলছিলনা যে, চলুন অমুক প্রতিষ্ঠানে বা অমুক ভাল আলেমের কাছে যাই এবং এবিষয়ে কুরআন হাদীস কি বলে তা জেনে নিই। কুরআন হাদীস সম্মত হলে আমল চলবে, অন্যথায় বাঞ্চাল হয়ে যাবে। (বর্তমানে হারামাঈন শরীফাঈন তথা মক্কা এবং মদিনার মসজিদে নববীতে এই ধরণের দুআর কোন অস্তিত্ব নেই।)

  হ্যাঁ ! তো আমি যা বলছিলাম, সেই বৃদ্ধ লোক যিনি কুরআন পড়ছিলেন। সেই সময় তিনি সূরা বাকারার ২০১ নং আয়াত (রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুন্ ইয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল আখিরাতে হাসানা … ) পাঠ করছিলেন। তিনি ছিলেন সেই দলের মধ্যে, যারা দুআ করার পক্ষে ছিল। আর যায় কোথায়, আমাদের দুই তালেবে ইলমকে দেখে সঙ্গে দলীল দিয়ে বসলেন। বললেন: এই দেখ, কুরআনে আল্লাহ দুআ করতে বলেছেন। এই দেখ দলীল। (রাব্বানা আতিনা…। ) এই বৃদ্ধ লোককে এখন কে বুঝাবে যে, (রাব্বানা আতিনা…) একটি কুরআনের আয়াত। দুআও বটে। বরং একটি জামে (অর্থপূর্ণ) দুআ। যার অর্থ হলঃ ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাদেরকে ইহকালে কল্যাণ দান করুন ও পরকালে কল্যাণ করুন এবং দোযখের আগুন হতে আমাদের রক্ষা করুন’। কিন্তু এ থেকে কিভাবে প্রমাণিত হল যে, প্রত্যেক ফরয নামায শেষে ইমাম সাহেবকে মুক্তাদীগণকে নিয়ে সমবেত ভাবে দুআ করতে হবে? আসলে সেই লোক নামায শেষে ইমামকে প্রত্যহ দু’আ করার সময় এই দু’আ পড়তে শুনেছে। তাই তা দু’আর দলীল হিসাবে মনে করে বসেছে। অনুরূপ নূরী দলের নিকট এই আয়াতটি, যা দ্বারা তারা নবী (সাঃ) নূরের তৈরী বলে দলীল দিচ্ছে। আল্লাহ বলেন :

  ( قد جاءكم من الله نُورٌ و كِتَابٌ مُبِيْن ) المائدة/১৫

 যেমন কিনা ‘‘নূর’’ শব্দটি তারা কুরআনে পেল, আর তাদেরকে কে পায়। তারা বলে উঠল এই তো নূর। এই তো প্রমাণ, নবী নূরের তৈরী। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন নবী নূরের তৈরী। আর এর ফলশ্র“তিতে সব স্থানে নূরের তাজাল্লী দেখতে পায়। তাদের কথা-বার্তায়, ওয়াজ-নসীহতে, বই-পুস্তকে ‘‘নূর’’ শব্দটির প্রাধান্য ব্যাপক আকারে পরিলক্ষিত হয়। নূর নবী, নূরে মুহাম্মদী, নূরানী চেহারা, নূরানী নামায শিক্ষা, নূরানী কায়েদাহ, নূরানী মাজমুআয়ে ওযায়েফ, নূরানী পাঞ্জে সূরাহ, নূরানী বঙ্গানুবাদ কুরআন শরীফ, নূরানী ট্রেনিং, নূরে ইলাহী, নূরূন্নবী, নূর বখ্শ, নূর বখ্ত, নূর জাহান,আনওয়ারে এলাহী, নূরে রূহ, নূরে মতলূব, নূরূন আলা নূর। ‘‘নূর’’ শোনে শোনে এমন হয়ে গেছে যে, কুরআন শরীফে কথাও নূর শব্দটি এলেই মনে করে বসে, এই তো নবীজী নূরের হওয়ার প্রমাণ, যেমন সেই বৃদ্ধ লোকটি ইমামের পিছনে প্রতিদিন নামায শেষে দুআ করার সময় (রাব্বানা আতিনা…) শোনে শোনে দুআর দলীল মনে করেছিল। আসলে মুফাস্সিরে কিরামগণ এই মর্মে কি ব্যাখ্যা করেছেন তা দেখার প্রয়োজন তারা মনে করেন না।

আয়াতে বর্ণিত ‘‘নূর’’ ও ‘‘কিতাবের’’ অর্থ ঃ

সূরা মায়েদার যে আয়াত দ্বারা প্রতিপক্ষের ভাইয়েরা নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে, আল্লাহর নূরের তৈরী বলে দলীল পেশ করে থাকেন, তার অনুবাদ হল ঃ (তোমাদের কাছে একটি নূর (জ্যোতি) এবং একটি স্পষ্ট কিতাব এসেছে।) এই আয়াতে নূর হতে কি বুঝান হয়েছে বা বর্ণিত নূর শব্দের ব্যাখ্যা মুফাস্সিরগণ কি করেছেন, তা পাঠকদের কাছে তুলে ধরা হলঃ-

প্রথম মত ঃ- কুরআন মজীদের বিশ্লেষকদের একটি দল উক্ত আয়াতে ‘‘নূর’’ ও ‘‘কিতাবুম্মুবীন’’’থেকে একটিই অর্থ নিয়েছেন।   আর তা হল কুরআন মজীদ। এই অর্থ গ্রহণ করা হলে এখানে নূর থেকে নবী (সাঃ) কে বুঝান হয়নি। আর যদি তিনি (সাঃ) উদ্দেশ্যই না হন , তাহলে এই আয়াত, নূরের তৈরী প্রমাণের দলীল তো আদৌ হতে পারেনা।  ( তফসীরে সাদী, পৃঃ নং ১৮৮, কুরআন কারীমের ঊর্দু অনুবাদ, মদীনায় ছাপা, পৃঃ নঃ ২৯১)

       তবে প্রশ্ন জাগে,  ( نُورٌ وَّ كِتَابٌ مُّبِيْنْ)     ‘‘নূ রূন ওয়া কিতাবুম্মুবীন’’ যদি একই বস্তু হয়, তাহলে আল্লাহ তাআলা নূর বলার পর ( و ) ‘ওয়াও’ অর্থাৎ ‘‘এবং’’ অক্ষরটি কেন ব্যবহার করলেন? ওয়াও হরফে আতফ, যা দ্বারা দুটি ভিন্ন ভিন্ন অর্থের শব্দকে একত্রিত করা হয়। এখানে নূরের পর ‘‘ওয়াও’’ আছে তারপর ‘‘কিতাবুম্মুবীন’’ এসেছে। তাই দুটি শব্দের অর্থ ভিন্ন ভিন্ন হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

উত্তর ঃ আরবী ভাষায় যেমন হরফে আতফ ‘‘ওয়াও’’ দ্বারা দুটি ভিন্ন অর্থের শব্দকে একত্রিত করার নিয়ম আছে, তেমন দুটি একই অর্থের শব্দকেও একত্রিত করার নিয়ম আছে। যাকে আরবী পরিভাষায় মুতারাদিফ বলা হয়। একাধিক স্থানে আল্লাহ তাআলা কুরআনে তা বর্ণনা করেছেন। তম্মধ্যে একটির উল্লেখ করা হল। এই ধরণের আত্ফকে আত্ফে তাফসীরী বলা হয়। আল্লাহ বলেন ঃ

( قال إنّما أشكُوا بَثِّى وَ حُزْنِى إلى اللهِ و أعلم من الله ما لا تعلمون ) سورة يوسف /৮৬

অনুবাদঃ- (তিনি [ ইয়াকূব আঃ ] বলেনঃ আমি তো আমার বেদনা ও দুঃখ শুধু আল্লাহর নিকট নিবেদন করছি এবং আমি আল্লাহর নিকট হতে এমন কিছু জানি, যা তোমরা জাননা। ) [ইউসুফ/ ৮৬ ]

আয়াতে বর্ণিত ‘‘বাস্সী’’ এবং ‘‘হুয্নী’’ শব্দ দুটি একই অর্থ বোধক। তবুও হরফে আতফ ‘‘ওয়াও’’ ব্যবহার করা হয়েছে।

     অনুরূপ প্রচলিত বাংলা ভাষাতেও লক্ষ্য করা যায়। যেমন বলা হয়, ‘‘লোকটি অভিজ্ঞ এবং পন্ডিত’’। আসলে অভিজ্ঞ ও পন্ডিত সমঅর্থের শব্দ কিন্তু আমরা ‘‘এবং’’ অব্যয় দ্বারা পৃথক করে বলে থাকি।

    মুফাস্সিরে কিরামগণের এই মতটিকে, ( অর্থাৎ ‘নূর এবং  কিতাব’ একই বস্তু ) আরো বলিষ্ঠতা দান করে, এর পরের আয়াতটি। অর্থাৎ ১৬ নং আয়াতটি। আল্লাহ বলেনঃ

( يَهْدِى بِهِ اللهُ منِ اتَّبَعَ رِضْوانه ) المائدة / ১৬

অনুবাদঃ ( এর দ্বারা আল্লাহ, যারা তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে, তাদের হিদায়েত দান করেন।) 
যে ভাইয়েরা আরবী ভাষায় সামান্য জ্ঞান রাখেন তারা অবশ্যই জানেন যে, (بِهِ) শব্দে ‘‘হি’’ হচ্ছে যমীর বা সর্বনাম। আর এই সর্বনামটি এক বচনের জন্য ব্যবহার হয়। যদি ‘‘নূর’’ ও ‘‘কিতাব’’ দু’টি ভিন্ন ভিন্ন অর্থের শব্দ হত তাহলে দ্বীবচনের সর্বনাম ব্যবহার করার দরকার ছিল। অর্থাৎ বলতে হত ( بهما ) ‘‘বিহিমা’’। কিন্তু ব্যবহার হয়েছে একবচনের সর্বনাম। যা দ্বারা বুঝা যায় যে নূর এবং কিতাব একই যিনিস  আর তা হল আলকুরআন। [ দেখুন,কুরআনের ঊর্দু তরজমা ও তফসীর, মদীনায় ছাপা, পৃঃ ২৯১-২৯২]

  মোটকথাঃ- দুটি শব্দের মাঝে ‘‘ও’’ বা ‘‘এবং’’ থাকলে শব্দ দুটির অর্থ সবসময় ভিন্ন ভিন্ন হয়না বরং অনেক সময় একই অর্থ প্রকাশ করে। আর সেটাই আয়াতে বর্ণিত ‘‘নূর’’ ও ‘‘কিাতাব’’ এর ক্ষেত্রে হয়েছে।  (আল্লাহই ভাল জানেন।)

দ্বিতীয় মত ঃ- মুফাস্সিরে কিরামগণের আর একটি মত হল যে, এখানে ‘‘নূর’’ থেকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বুঝান হয়েছে এবং ‘‘কিতাবুম্মুবীন’’ থেকে কুরআন মজীদকে বুঝান হয়েছে। [দেখুন, তফসীরে তাবারী, ৬/১৯৪]

এই তফসীরটি পড়ে হয়ত কিছু ভাই আনন্দ বোধ করবেন ও ভাববেন, প্রতিপক্ষেরও দলীল আছে। পাঠক বৃন্দ! প্রকৃতপক্ষে ‘‘নূর’’ শব্দ দ্বারা মুহাম্মদ (সাঃ) কে উদ্দেশ্য করা , আর তিনি নূর দ্বারা সৃষ্টি, এর প্রমাণ হওয়া দুটি বাক্যের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। মুফাস্সির ইবনে জারীর ত্বাবারী (রহঃ) এর মন্তব্য হচ্ছে, নূর দ্বারা মুহাম্মদ (সাঃ) কে বুঝান হয়েছে এর অর্থ এটা নয় যে, আল্লাহ তাআলা নবী (সাঃ) কে তাঁর নূর দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। ইবনে জারীর বলেন ঃ

 ” يعنى بالنّور محمداً صلى الله عليه و سلم، الذى أنارالله به الحق، و أظهر به الإسلام، و محق به الشرك، فهو نور لمن استنار به ”             
অর্থাৎ, নূর দ্বারা মুহাম্মদ (সাঃ) কে বুঝান হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর দ্বারা হক্ককে আলোকিত করেছেন এবং শির্ককে নাশ করেছেন। তাই যে ব্যক্তি আলোর অনুসন্ধানকারী,নবী (সাঃ) তার জন্য আলো স্বরূপ। [তফসীরে ত্বাবারী, ৬/১৯৪]

ফল কথা ঃ আল্লাহর বাণী , (আল্লাহর পক্ষ হতে নূর বা জ্যোতি এসেছে।) এখানে নূর থেকে যদি মুহাম্মদ (সাঃ) কেও বুঝান হয়, তবুও এটা প্রমাণ হয়না যে, নবীজীকে আল্ল্াহ নূর দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আর সেই কারণে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের প্রসিদ্ধ তফসীরবিদগণের কেহই একথা বলেননি যে, এই আয়াত থেকে প্রমাণ হয় বা বুঝা যায় যে নবী (সাঃ) কে নূর দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে বা তিনি নূরের সৃষ্ট। [ দেখুন, তফসীরে ত্বাবারী, তফসীরে কুরত্বুবী, ইবনে কাসীর, ফতহুল কাদীর]

কুরআন ও তাওরাতকে আল্লাহ নূর বলেছেন

আল্লাহ তাআলা কুরআন সম্পর্কে বলেন ঃ

( فالذين آمنوا به و عزَّرُوهُ و نَصَرُوهُ واتبعواالنورَ الذى أنزل معه أولئك هم المفلحون ) الأعراف /১৫৭

অনুবাদঃ (সুতরাং তাঁর (নবীর) প্রতি যারা ঈমান রাখে, তাকে সম্মান করে ও সাহায্য করে, আর এই নূরকে (কুরআনকে) অনুসরণ করে চলে যা তাঁর নিকট অবতীর্ণ করা হয়েছে।  তারাই সাফল্য লাভ করবে। ) [আরাফ/ ১৫৭]

তাওরাত সম্বন্ধে বলেনঃ

( قل من أنزلَ الكتاب الذى جاء به موسى نوراً و هدًى للنَّاس) الأنعام /৯১

অনুবাদঃ ( হে নবী তুমি বলে দাও! ঐ গ্রন্থকে কে নাযিল করেছে, যা মুসা নিয়ে এসেছিল, যা আলোক বর্তিকা এবং মানব মন্ডলীর জন্য হেদায়েত স্বরূপ। ) [ আনআম/৯১]

 উক্ত আয়াত দুটিতে আল্লাহ তাআলা কুরআন এবং তাওরাতকে নূর বলেছেন। কিন্তু এর অর্থ কি এটা যে, কুরআন মজীদ এবং তাওরাত নূরের তৈরী ? যেমন কুরআন মজীদ ও তাওরাতকে আল্লাহ নূর বলেছেন অথচ কিতাবদুটি নূরের তৈরী নয়, তেমন প্রিয় নবী (সাঃ) কে নূর বলা হয়েছে বটে কিন্তু তিনি নূর বা জ্যোতির তৈরী নন।

 আরবী সাহিত্যের ইলমে বালাগাতে এই পদ্ধতিকে ইস্তেআরাহ বলা হয। যার অর্থ হলঃ ‘কোন শব্দের পরিবর্তে অন্য শব্দ ব্যবহার করা। দুই শব্দের অর্থের মধ্যে মিল থাকার কারণে এবং ব্যবহৃত শব্দের মধ্যে কারীনা বা সম্পর্ক পরিলক্ষিত হওয়ার কারণে’। যেমন মানুষকে ‘আসাদ’ বলা হয়। আসাদ আরবী ভাষায় বাঘকে বলা হয়। কিন্তু কখনো কখনো শক্তিশালী বাহাদুর ব্যক্তিকেও আসাদ বা বাঘ বলা হয়। অর্থাৎ তার শক্তি ও সাহস যেন বাঘের মত। আসলে কিন্তু কোন মানুষ বাঘ হতে পারেনা। ঠিক তেমনিই মহান আল্লাহ নবী মুহাম্মদ (সাঃ) কে নূর বা আলো বলে আখ্যায়িত করেছেন কারণ যে সময় নবী আরবে প্রেরীত হন সে সময় আরবের লোকেরা কুফরীর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। নবী (সাঃ) তাদের হিদায়েতের পথ দেখান। ফলে তাঁর আগমন বা তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল নূরের ন্যায়। তার মাধ্যমে সত্যের পথ উদ্ভাসিত হয়। জাহেলিয়াতের অন্ধকার বিদূরিত হয়। সত্য ও ন্যায়ের আলো প্রজ্জ্বলিত হয়।

একটি দেশীয় কথা

আমরা বিষয়টি প্রচলিত ভাষার মাধ্যমেও বুঝতে পারি। আমরা বাংগালীরা বলে থাকি ‘‘সোনার বাংলা’’।  বিশেষ করে কবিরা এই ধরনের বাক্য কবিতায় বেশি ব্যবহার করে থাকেন। এখন কথা হল ‘‘সোনার বাংলা’’ কথাটির অর্থ কি এই যে, বাংলার দেশটি সোনার তৈরী ? না, তবে বাংলার সৌন্দর্য এবং বাংলার প্রতি ভালবাসাকে সোনার সাথে তুলনা করা হয়েছে। তেমনি নবী (সাঃ) এর দ্বারা  আরববাসীর অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন যাত্রা, আলোয় পরিণত হয়েছিল বলে তাঁকে নূর বা আলো বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তিনি নূরের সৃষ্ট ছিলেন না।

প্রতিপক্ষের দ্বিতীয় দলীলঃ

নবী (সাঃ) কে নূরের তৈরী প্রমাণ করার জন্য প্রায় সময় প্রতিপক্ষের আলেমগণ একটি জাল হাদীস পেশ করে থাকেন। হাদীসটি নিুরূপ ঃ

” عن جابر بن عبد الله رضى الله عنه قال: قلت يا رسول الله! بأبى أنت و أمى أخبرنى عن أوّل شىء خلقه الله تعالى قبل الأشياء، قال: يا جابر! إنّ اللهَ خَلَقَ قَبْلَ الأشياء،نورَ نَبِيِّكَ مِن نورِهِ، فجعَلَ ذلك النور يدور بالقدرةِ حيثُ شاء الله، و لم يَكُنْ فى ذلك الوقت لَوحٌ ولا قلمٌ ولاجنَّةٌ ولانارٌ ولا ملكٌ ولا سماءٌ ولا أرضٌ ولا شمسٌ ولا قمرٌ ولا جَنِّىٌ ولا إنسىٌ ”  (موضوع)

অনুবাদঃ জাবের বিন  আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদা আমি রাসূল (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করি, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার প্রতি আমার বাবা-মা কুরবান হোক, আল্লাহ তাআলা সব কিছুর আগে কি সৃষ্টি করেন? নবী (সাঃ) বলেন:   ‘‘ হে জাবের! আল্লাহ তাআলা সমস্ত বস্তুর  পূর্বে তাঁর নূর দ্বারা তোমার নবীর নূরকে সৃষ্টি করেন। তারপর সেই নূর নিজ ক্ষমতায় আল্লাহর আদেশে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়। সেই সময় লউহ, কলম, জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা, আসমান-যমীন, সূর্য-চন্দ্র, জিন, মানুষ কোন কিছুই ছিলনা।’’

এই হাদীসে নবী (সাঃ) বলেনঃ আল্লাহ সবার আগে নিজ নূর হতে নবীর নূরকে তৈরী করেন, যা দ্বারা বুঝা যায় নবীজী নূরের তৈরী।

পর্যালোচনা ঃ

ক- দলীলটি জাল ঃ নূরী ভাইয়েরা এই কথাগুলোকে জনসাধারণের কাছে এত বেশী বর্ণনা করে যে, সাধারণ মানুষ শোনে শোনে তা প্রায় মুখস্ত করে ফেলেছে এবং বিশ্বাস করে ফেলেছে যে, এটি নবীর হাদীস।

পাঠক বৃন্দ! আসলে এটি হাদীস নয়। কিছু লোক নবীর হাদীস বলে প্রচার করেছে মাত্র। সে কারণে না তো প্রাচীন আর না বর্তমান যুগের কোন মুহাদ্দিস হাদিসটির সনদ বা সূত্র খোঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছেন। অর্থাৎ এটি একটি মুখে মুখে প্রচলিত সনদ বিহীন হাদীস।

হ্যাঁ, মুহাদ্দেসীনদের মধ্যে কেউ কেউ এমন কিছু পুস্তক রচনা করেছেন, যার মধ্যে জাল, যঈফ ও বানোয়াট-কাল্পনিক এবং হাদীসের নামে প্রচলিত মানুষের মুখের কথা প্রভৃতির সমাহার ঘটিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মুহাদ্দেস যেমন                   (১) ভারত বর্ষের বিশিষ্ট আলেম আবুল হাসানাত আব্দুল হাই লখনৌভী। তিনি রচনা করেছেনঃ‘‘ আল্ আছার আল্ মারফূআহ্ ফিল্ আখবারিল মাউযূআ’’।  (২) ইসমাইল বিন মুহাম্মদ আল্ আজলূনী। তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম ঃ ‘‘ কাশ্ ফুল খাফা ওয়া মুযীলুল ইল্ বাস আম্মাশ্ তাহারা মিনাল আহাদীস্ আলা আলসিনাতিন্নাস’’। এই সমস্ত বরেণ্য উলামায়ে কিরামগণ উপুরোল্লিখিত হাদীসটি অন্যান্য জাল বা মাউযূ হাদীসের তালিকায় উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয় বইয়ের প্রথম খন্ড পৃষ্ঠা নং ২৬৫ হাদীস নং ৮২৭ দ্রষ্টব্য। তিনি এই জাল হাদীসটি আব্দুর রাজ্জাক বিন উমর আদ্ দিমাশ্কীর সনদ হতে বর্ণনা করেছেন। এবং ইবনু হাজার আসকালানী ‘তাকরীবুত্ তাহযীব’ গ্রন্থে আব্দুর রাজ্জাককে ‘মাত্রূক’ বা প্রত্যাখ্যাত বলেছেন। [ মাউযূ আউর মুনকার রিওয়ায়েত,পৃঃ নং ২৮৪]

 বিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট মুহাদ্দিস শাইখ নাসেরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) তাঁর স্বর্ন গ্রন্থ ‘‘সিল্ সিলাতুল্ আহাদীছ আস্ স্বহীহায়’’ (সহীহ হাদীস সিরিজ) ৪৫৮ নম্বর হাদীসের বর্ণনার সময় উপরে বর্ণিত হাদীসটি বাতিল বলে আখ্যা দিয়েছেন।

     ফলকথাঃ- হাদীসটি জাল। আর জাল হাদীস শরীয়তের কোন বিধানের কখনই দলীল হতে পারেনা। বিশেষ করে তা যদি আক্কীদাহ সম্পর্কীয় হয় তাহলে তো কখনই গ্রহণীয় নয়।

জালসাজীর করিশমা

        উপরোক্ত জাল বর্ণনাটির কাহিনী এখানেই শেষ হয়না বরং তার শাখা-প্রশাখা সুদূর প্রসারী । তাই তার একটু বর্ণনা না দিয়ে পারছিনা, যেন পাঠক ভাইয়েরা জাল এবং জালসাজীর অদ্ভুততা লক্ষ্য করতে পারেন। বলা হয়েছে, সেই নবীর নূর বা নূরে মুহাম্মদী যা আল্লাহ সব কিছুর পূর্বে তৈরী করেন। যখন তা দ্বারা অন্যান্য সৃষ্টিকে তৈরী করার ইচ্ছা করেন তখন উহাকে চার ভাগে বিভক্ত করেন । প্রথম অংশ দ্বারা কলম,  দ্বিতীয় অংশ দ্বারা লউহে মাহফুয এবং তৃতীয় অংশ দ্বারা আরশ তৈরী করেন। অবশিষ্ট নূরে মুহাম্মদীর চতুর্থ অংশটিকে আবার চার ভাগে বিভক্ত করা হয়। উহার প্রথম ভাগ দ্বারা আরশ উত্তোলনকারী ফেরেশতাগণকে, দ্বিতীয় ভাগ দ্বারা কুরসী এবং তৃতীয় অংশ দ্বারা বাকি ফেরেশতাগণকে তৈরী করা হয়। অবশিষ্ট থেকে যায় নূরে মুহাম্মদীর আর এক অংশ। উহাকেও বিভক্ত করা হয় চার ভাগে। প্রথম অংশ দ্বারা তৈরী হয় সাত আকাশ, দ্বিতীয় অংশ দ্বারা তৈরী হয় যমীন এবং তৃতীয় অংশ দ্বারা তৈরী হয় জান্নাত এবং জাহান্নাম। আবার থেকে যায় এক চতুর্থাংশ। তাকেও ভাগ করা হয় চার ভাগে। আবার চলে সেই চার ভাগের বর্ণনা। .. .. চারের আঁকড়া কিছুতেই পিছু ছাড়েনা। শেষ ফলাফল হয় এই যে, সেই নূরে মুহাম্মদী দ্বারা সারা বিশ্ব তৈরী করা হয়। [ দেখুন তাঁদের প্রিয় বই, আল্ মাওয়াহিব আল্লাদুন্নীয়্যাহ:১/১২ এর বরাতে রাদ্দে আক্কাইদে বিদইইয়্যাহ, পৃ: ২৬৬-২৬৮ ]

     তাঁদের এই দলীলের ফলাফল অনুযায়ী পৃথিবীর সবকিছু নূরে মুহাম্মদী দ্বারা তৈরী । তাহলে আল্লাহর শত্র“ ফেরাউন, নমরূদ, হামান, আবু জাহল, আবু লাহাব, যেনাকারী এবং যেনাকারীনী, মদ্যপানকারী এবং মদ, জুয়াড়ী এবং জুয়া, মুর্তী এবং মন্দীর,  জাহান্নাম এবং জাহান্নামী , শুকর , কুকুর, ইদুর এবং বিড়াল সবই কি নূরে মুহাম্মদী হতে তৈরী ?? !!! নাউযু বিল্লাহ ! ইহাই কি আপনাদের নযরে নবীর মর্যাদা এবং নবীর মহব্বত ?? বরং এই বর্ণনা অনুযায়ী তো এর থেকেও জঘন্য আক্কীদা প্রমাণ হয়। তা হল , এ সবও আল্লাহর নূর কারণ নূরে মুহাম্মদী হচ্ছে প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর নূর যা, দ্বারা এসব কিছু তৈরী হয়েছে। ইহাই কি আক্কীদাহ।

খ- প্রথম সৃষ্টি নবীর নূর না কলম ?

প্রতিপক্ষের দ্বিতীয় দলীলটি জাল হওয়ার আর একটি বড় কারণ হচ্ছে এই যে, হাদীসটি সহীহ বা বিশুদ্ধ হাদীসের বিপরীত। উলামায়ে কিরামগণ জাল হাদীসের আলামত বা নিদর্শন বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন: কোন হাদীস জাল হওয়ার অন্যতম লক্ষণ হচ্ছে কুরআন বা সহীহ হাদীসের বিপরীত হওয়া। অন্যদিকে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম কলমকে সৃষ্টি করেছেন। রাসূল (সাঃ) বলেনঃ

” إن أوَّل شىءخلقه الله تعالى القلم، و أمره أن يكتب كل شىء يكون “

‘‘সর্বপ্রথম আল্লাহ তাআলা যা সৃষ্টি করেন, তা হল কলম। তার পর কলমকে লিখতে আদেশ করেন যা কিছু ভবিষ্যতে হবে’’। হাদীসটিকে ইবনু আসেম আস্ সুন্নাহ গ্রন্থে (১০৮), ও আল্ আওয়ায়েল্ গ্রন্থে (৩), আবূ ইয়ালা তার মুসনাদ গ্রন্থে ১/ ১২৬, বায়হাকী সুনান আল্ কুবরাতে ৯/৩ এবং আল্ আসমা ওয়াস্ সিফাত গ্রন্থের পৃঃ নঃ২৭১ এ বর্ণনা করেন। [ দেখুন সিলসিলা সহীহা, প্রথম খন্ড হাদীস নং ১৩৩)

অনুরূপ তিরমিযী (রহঃ) হাদীসটিকে আবওয়াবু তাফসীরিল কুরআনের পরিচ্ছেদ, তাফসীর সূরা নূন ওয়াল কালাম এ বর্ণনা করেছেন এবং শাইখ আলবানী (রহঃ) সহীহ বলেন। [ দেখুন সহীহ তিরমিযী পৃঃ ৭৫২, হাদীস নং ৩৩১৯, শাইখ আলবানীর হুকুম সহ ]

অন্যদিকে সহীহ মুসলিমে আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত একটি হাদীসে নবী (সাঃ) বলেন ঃ

 “خُلقت الملائكة من نور، و خُلق الجانُّ من مارجٍ من نار، و خُلق آدم مما وصف لكم “

অর্থঃ ‘‘ ফেরেশ্তাগণকে নূর দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে, জিন সম্প্রদায়কে অগ্নিশিখা হতে তৈরী করা হয়েছে এবং আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেই বস্তু দ্বারা যার বর্ণনা তোমাদের দেয়া হয়েছে’’। ( অর্থাৎ কুরআনে বলা হয়েছে যে, তিনি মাটির তৈরী।)   [মুসলিম, কিতাবুয্ যুহুদ, হাদীস নং ৭৪২০]

এই হাদীসটিতে নবী (সাঃ) তিনটি জাতির সৃষ্টির মূল ধাতুর বর্ণনা দিয়েছেন। বলেছেন: জিন জাতিকে আগুন দ্বারা, মানব জাতিকে মাটি দ্বারা এবং ফেরেশতাগণকে নূর দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। এখন কথা হল, যদি নবী (সাঃ) ও নূরের তৈরী হতেন, তাহলে তাঁর উম্মতকে জানিয়ে দেয়া দরকার ছিল যে, ফেরেশতাদের সাথে সাথে আমাকেও নূর দ্বারা তৈরী করা হয়েছে। কিন্তু তিনি তা বলেননি যা দ্বারা বুঝা যায় যে, নবী (সাঃ) কে নূর দ্বারা সৃষ্টি করা হয়নি।

   উপরোক্ত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হল যে, সৃষ্টির প্রথম বস্তু হচ্ছে কলম। নবীর নূর নয়। প্রথম সৃষ্টি নবীর নূর বলে যে হাদীস প্রচার করা হয় তা জাল কথা । হাদীস নয়।

       উল্লেখ থাকে যে, নবীজী আল্লাহর নূরের তৈরী বলে যতগুলো হাদীস বর্ণনা করা হয় সবই জাল-যয়ীফ এবং বানোয়াট। তাছাড়া কুতুবে সিত্তা এবং প্রসিদ্ধ হাদীসের বইসমূহে তার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়না।

প্রতিপক্ষের তৃতীয় দলীল ঃ নবীজীর ছায়া ছিলনা

আসলে এটি দলীল নয় বরং একটি যুক্তি বা সংশয় মাত্র। তারা বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাধারণ বস্তুর মত ছায়া হতনা।  এ থেকে প্রমাণ হয় যে, তিনি নূরের তৈরী। কারণ নূর বা জ্যোতির ছায়া হয়না।

পর্যালোচনা ঃ- নূরী ভাইদের পূর্বসূরী আলেম-উলামাগণ এ ধরণের কোন কথা বলেছেন কিনা আমার জানা নেই। তবে বর্তমান যুগের অনেক নামধারী আলেমকে সাধারণ মানুষকে এ যুক্তি দ্বারা বিভ্রান্ত করতে দেখা যায়। যারা এ যুক্তি পেশ করে আনন্দ এবং গর্ব বোধ করে, তাদের প্রশ্ন করা ভাল যে,  ভাই আপনি কি নবী (সাঃ) কে দেখেছেন? স্বভাবতঃ উত্তর আসবে, না। এবার তাকে জিজ্ঞেস   করুন: তাহলে তাঁর ছায়া ছিল কি ছিলনা আপনি কি করে জানলেন? অর্থাৎ আপনার কথা গ্রহণীয় নয়। এ বিষয়ে যাঁদের কথা গ্রহণীয় তাঁরা হলেন সাহাবায়ে কিরাম, যাঁরা নবী (সাঃ) কে দেখেছেন এবং তাঁর সাথে থেকেছেন। তাই চলুন সাহাবাদের কিছু বর্ণনা এ বিষয়ে পাওয়া  যায় কি না খোঁজে দেখি।

নবীর ছায়ার প্রমাণ ঃ হযরত আয়েশা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন ঃ একদা আল্লাহর রাসূল এক সফরে ছিলেন। সাথে ছিলেন সাফিয়্যাহ ও যয়নব। সাফিয়্যাহ নিজের উট হারিয়ে ফেলেন। যয়নব (রাযিঃ) এর কাছে ছিল  অতিরিক্ত কিছু উট। তাই নবী (সাঃ) যয়নবকে বলেন, সাফিয়্যার উট নিখোঁজ হয়ে গেছে। তুমি যদি তাকে তোমার একটি উট দিয়ে সাহায্য করতে তো ভাল হত! উত্তরে যয়নব বলেন: হুঁ! আমি ঐ ইহুদীর মেয়েকে উট দেব! (অর্থাৎ তিনি দিতে অস্বীকার করেন এবং সাফিয়্যাহ (রাযিঃ) কে ইহুদী সন্তান বলে কটুক্তি করেন। কারণ তিনি ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ইহুদীয়া ছিলেন।) এই কটুক্তির কারণে নবী (সাঃ) যয়নবের সাথে মেলামেশা বন্দ করে দেন। জিলহজ্জ এবং মুর্হারম দুই কিংবা তিন মাস ধরে তার সাথে সাক্ষাৎ করা থেকে বিরত থাকেন। যয়নব (রাযিঃ) বলেন: আমি নিরাশ হয়ে পড়ি এমনকি শয়নের খাটও সরিয়ে নেই। এমনি এক সময় দিনের শেষার্ধে, নিজেকে রাসূল (সাঃ) এর ছায়ার মধ্যে পাই। তিনি আমার দিকে এগিয়ে আসছিলেন। আরবী শব্দগুলো এইরূপ ঃ

” إذا أنا بظلِّ رسول الله صلى الله عليه و سلم مُقْبِلٌ “

( رواه أحمد والطبراني في الأوسط و ابن سعد في الطبقات الكبرى )

[ মুসনাদে আহমদ, ৬/১৬৪-১৮২, আত্ ত্বাবাকাত আল্ কুবরা, ৮/১০০, এবং ত্বাবারানী তাঁর আওসাত গ্রন্থে )

আল্লাহর রাসূলের স্ত্রী যয়নব (রাযিঃ) রাসূলের ছায়া দেখতে পান। এখন বলুন, আপনাদের কথা নেব না নবী (সাঃ) এর স্ত্রী মা যয়নবের কথা নেব?

      বর্ণনাটি স্পষ্ট তবে পাঠক ভাইদের উদ্দেশ্যে একটু উদাহরণ সহ বুঝিয়ে দেয়া ভাল মনে করছি। যয়নব (রাযিঃ) এর ঘটনাটি আমরা ভালভাবে উপলব্ধি করতে পারি, নিজেদের ছোট-খাটো ঘটণাবলীর মাধ্যমে। যেমন অনেক সময় মানুষ অন্যমনস্ক হয়ে বসে থাকে। কোন কিছু গভীর ভাবে চিন্তা করে। এমন সময় কেউ পার্শ্বে চলে এলেও টের পাওয়া যায়না। কিন্তু কেউ যদি রোদের মধ্যে বসে থাকে আর হঠাৎ ছায়া হয়ে যায় কিংবা কোন কিছু  তাকে স্পর্শ করে, তাহলে অন্যমনস্কতা ভেঙ্গে যায়। চমকে উঠে এবং এদিক ওদিক তাকায়। ঠিক এমনটাই ঘটেছিল হযরত যয়নবের বেলায়। বেখেয়াল অবস্থায় হঠাৎ ছায়া দেখতে পেয়ে উপরে তাকান। দেখেন সেটা নবীর ছায়া এবং তিনি (সাঃ) তার দিকে এগিয়ে আসছেন। যয়নব (রাযিঃ) আনন্দ বোধ করেন।

ছায়া না থাকার  আর একটি বড় সংশয়

নবীজীর ছায়া ছিলনা এর প্রমাণে আবার কেউ বলেন ঃ ‘ হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ছায়া জমীনে পতিত হতনা। না সূর্যের আলোতে আর না চাঁদের কিরণে তাঁর ছায়া দেখা যেত বরং তাঁর নূর  সূর্য ও প্রদীপের আলোকে ঢেকে ফেলত’।

আসলে মানুষ যদি ইসলামের মূল প্রমাণ অর্থাৎ কুরআন হাদীসের অধ্যায়ন ছেড়ে কেচ্ছা কাহিনী তথা বাজারী বই পুস্তকের আশ্রয় নেয় এবং সে গুলিকে শরীয়তের দলীল- প্রমাণ মনে করে বসে তাহলে এরকম ভ্রান্ত যুক্তির উদ্ভব হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু পাঠক ভাইদের জ্ঞাতার্থে বলে দেয়া ভাল মনে করছি যে, শুধু বুখারী ও মুসলিম শরীফে এক ডজনেরও বেশী হাদীস আছে যাতে বর্ণনা হয়েছে যে, নবী (সাঃ) স্বয়ং অনেক ক্ষেত্রে ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন কিংবা তাঁকে ছায়া করা হয়েছে। এরকম নয় যে তাঁর নূর সূর্য বা প্রদীপের আলোকে ঢেকে ফেলত আর তাঁকে ছায়া করা যেতনা। তন্মধ্যে দুটি হাদীসের উল্লেখ নিুে করা হলঃ

(১)  হিজরতের লম্বা হাদীসে বর্ণিত, রাবী বলেন ঃ.. .. .. নবী (সাঃ) বানু আমর বিন আউফ গোত্রে রবীউল আউয়াল মাসের সোমবারে  অবতরণ করেন। আবু বকর লোকেদের অভ্যর্থনার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে থাকেন। আর নবী (সাঃ) চুপ-চাপ বসে থাকেন। ইতিপূর্বে আনসারদের মধ্যে যারা নবী (সাঃ) কে দেখেনি তারা আবু বকর কে সালাম করতে থাকে। ( ভুলবসতঃ নবী মনে করে) তারপর যখন আল্লাহর রাসূলের উপর রোদ পড়ে, তখন আবু বকর এসে নিজের চাদর দিয়ে তাঁকে ছায়া করে দেন। এ কারণে মানুষেরা নবী (সাঃ) কে  চিনতে পারে। [ বুখারী, কিতাবু মানাকিবিল আনসার, বাবু হিজরাতিন্নাবী.. হাদীস নং ৩৯০৬]

(২)    জাবির বিন আব্দুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা আল্লাহর রাসূলের সাথে নাজদে লড়াই করি। রাস্তার মাঝে নবী (সাঃ) এর ‘‘কায়লূলার’’ দুপুর বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। জায়গাটিতে ছিল বহু কাটাওয়ালা গাছ। তিনি (সাঃ) একটি গাছের নিচে যান এবং সেই গাছের ছায়ার নিচে বিশ্রাম করেন। আর তরবারিটি ডালে টেঙ্গে রাখেন।  [বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাবু গাযওয়াতি বানিল মুস্ তালিক হাদীস নং ৪১৩৯]

তাছাড়া এই সমস্ত ভাইদের গজল এবং ওয়ায মহফিলে হয়ত: অনেকে শুনে হবেন। গাওয়া হয় এবং বলা হয় নবীজী যখন বাল্যকালে ছাগল চরাতেন তখন, মেঘ এসে তাঁকে ছায়া করত।  দাবী একরকম আর আলোচনা আর এক রকম?

বস্তু মাত্রেরই ছায়া আছে, কুরআন থেকে প্রমাণ

পৃথিবীতে এমন কোন বস্তু পাওয়া যাবেনা যার ছায়া নেই। এ কথার প্রমাণ পবিত্র কুরআনেও পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন ঃ

( أوَ لَمْ يَرَوا إلى مَا خَلَقَ اللهُ مِن شئٍ يَتَفَيَّؤُا ظِلالُه عن اليمين والشَّمَائلِ سُجَّداً للهِ وَهُمْ دَاخِرُوْن ) النحل/  ৪৮

অনুবাদ ঃ (তারা কি লক্ষ্য করেনা আল্লাহর সৃষ্ট বস্তুর প্রতি, যার ছায়া ডানে ও বামে ঢলে পড়ে বিনীত ভাবে আল্লাহর প্রতি সিজদাবনত হয়। ) [নাহ্ল /৪৮]

আল্লাহ তাআলা আরো বলেনঃ

( و لله يَسْجُدُ مَن فِى السَّمَاوَاتِ والأَرْضِ طَوْعاً وَ كَرْهاً وَ ظِلَالُهُمْ بالغُدُوَّ والآصَال ) الرعد/১৫

অনুবাদ ঃ- (আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় আল্লাহকে সিজদা করে এবং তাদের ছায়াগুলোও সকাল ও সন্ধায় সিজদা করে।) [র্আ রাআ’দ/ ১৫]

উল্লেখিত আয়াত দুটিতে বলা হয়েছে যে, আকাশ ও যমীনে যা কিছু আছে,যত বস্তু আছে, সব ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় আল্লাহকে সিজদা করে। (তবে জড় পদার্থের সিজদা এবং মানুষের সিজদার মধ্যে পার্থক্য আছে। মানুষ মাথা নত করে, মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে সিজদা করে কিন্তু গাছপালা ও গাছপালার ছায়া কি ভাবে সিজদা করে, তার বিবরন বর্ণিত আয়াত দুটিতে আসেনি।)

মোটকথাঃ প্রত্যেক বস্তু ও তার ছায়া আল্লাহকে সিজদা করে। এখন প্রতিপক্ষের কাছে প্রশ্ন, নবী (সাঃ) কি আল্লাহর সৃষ্ট বস্তু সমূহের অন্তর্ভূক্ত না অন্তর্ভূক্ত নন। যদি তার অন্তর্ভূক্ত হয়ে থাকেন- এবং অবশ্যই তিনি সৃষ্টিকুলের অন্তর্ভূক্ত, তাহলে অবশ্যই তাঁর ছায়া ছিল। কারণ আল্লাহ বলেন ঃ( আকাশ যমীনে যা কিছু আছে সবই এবং তাদের ছায়াগুলোও ইচ্ছা অথবা অনিচ্ছায় আল্লাহকে সিজদা করে।

      প্রত্যেক বস্তুর ছায়া আছে হাদীস থেকে প্রমাণ

জাবের (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন ঃ এক ব্যক্তি নবী (সাঃ) কে নামাযের সময় সূচী সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে। নবী (সাঃ) তাকে বলেনঃ আমাদের সাথে নামায পড়। নবী (সাঃ) যোহরের নামায আদায় করেন যখন সূর্য মধ্য আকাশ থেকে ঢলে পড়ে। আর আসরের সম্পর্কে বলেন ঃ

 ” والعصر حين كان فيئُ كل شئٍ مثله ” النسائ،وأبوداؤد

‘‘আর আসরের নামায আদায় করেন, যখন প্রত্যেক বস্তুর ছায়া নিজ বরাবর হয়।’’ তারপর বাকি নামাযের বর্ণনা দেয়া হয়।

 [ নাসাঈ, আল্ মাওয়াকীত, আবূ দাউদ, আস্ স্বালাত]

এই হাদীসে দেখা যায় নবী (সাঃ) আসরের নামায পড়েন যখন প্রত্যেক বস্তুর ছায়া নিজ বরাবর হয়। বুঝা গেল, প্রত্যেক বস্তুরই ছায়া আছে। তাই যদি কেউ বলে যে, নবী (সাঃ) এর ছায়া ছিলনা, তাহলে সেটা ভুল ধারণা। এও বুঝা যায় যে, যদি নবী (সাঃ) এর ছায়া না হত, তাহলে তাঁর বলার দরকার ছিল যে, আমি ব্যতীত প্রত্যেক বস্তুর ছায়া যখন তার বরাবর হবে, তখন আসরের নামায পড়বে। কিন্তু তিনি (সাঃ) তা বলেননি, যা দ্বারা প্রমাণ হয়, তাঁর ছায়া ছিল।

ছায়াবিহীন নবী  তর্কের খাতিরে

যদি নূরী ভাইদের জিজ্ঞাসা করা হয় যে, নবীজীর ছায়া কেন ছিলনা? তাহলে উত্তর দেয়া হয়, তিনি নূরের ছিলেন বলে ছায়া হতনা। তাদের এই উত্তরকে কেন্দ্রকরে একটি প্রশ্ন করা ভালো, নূর বা জ্যোতির কি আকার-আকৃতি, চেহারা-ছবি হয়, যেমন মানুষ এবং অন্যান্য জীব-জন্তুর হয়? উত্তর হয়না। প্রকৃতপক্ষে জ্যোতির চেহারা-ছবি হয়না। যেমন লন্ঠন ও বাল্বের আলোর কোন শারিরীক আকৃতি নেই। তেমন জ্যোতির রক্ত, মাংস, হাড়-হাড্ডীও হয়না। কিন্তু আমাদের নবী তো সুন্দর চেহারা ছবির মালিক ছিলেন। সাহাবীবর্গ তাঁর সাথে সালাম-মুসাফাহা করতেন। তিনি তাঁর স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করতেন। যুদ্ধের সময় তরবারির আঘাতে তাঁর দাঁত ভেঙ্গে যায়। রক্ত ঝরে পড়ে। এখন বলুন, যদি নবীজী নূরের তৈরী হতেন, তাহলে কিভাবে সাহাবাবর্গ তাঁর সাথে মুসাফাহা করলেন? কি ভাবেই বা তাঁর দন্ত ভেঙ্গে গেল? কি ভাবেই বা রক্ত বের হল? কারণ নূরের তো শারিরীক আকৃতি হয়না এবং রক্ত-মাংসও হয়না।

     আশা করা যায় বিষয়টি পাঠকদের নিকট পরিষ্কার হয়েছে। কিন্তু তারা আরো একটি অসাড় যুক্তি খাড়া করে বলবে ঃ ভাই মানুষ মাটির তৈরী কিন্তু তার রক্ত-মাংস হাড় হয় কি হয় না? উত্তর হয়। যদি মানুষের আসল মাটি হওয়া সত্বেও তার রক্ত মাংস ও হাড় হতে পারে, তাহলে নবী (সাঃ) নূরের হলে  তাঁর রক্ত-মাংস হাড়-হাড্ডি কেন হতে পারেনা? যদি কেউ এই যুক্তি পেশ করেই দেয়, তাহলে জেনে নিন সে নিজের যুক্তি নিজেই ভেঙ্গে দিল। কারণ তার কথা অনুযায়ী নবীজীর দেহ মুবারক অন্যান্য মানুষের মত রক্ত মাংসের ছিল। অতএব যেমন অন্যান্য মানুষের ছায়া হয়, তেমন তাঁরও ছায়া হত। এর পরেও যদি কেউ বুঝতে না চান তাহলে ধরে নিতে হয় সে  কসম খেয়েছে যে, নবী নূরের তৈরী তাকে বলতেই হবে। দলীল প্রমাণ এবং যুক্তি সে মানেনা।

    ‘‘নূরূন মিন্ নূরিল্লাহ’’ শেরেকী আক্কীদাহ

নবীজী আল্লাহর নূরের মধ্য থেকে একটি নূর বা তাঁকে আল্লাহ তাআলা নিজ নূর দিয়ে তৈরী করেছেন এই ধারণাটির মধ্যে রয়েছে কয়েকটি অনৈসলামিক মুশরেকী আক্কীদাহ বা বিশ্বাস। নিুে বিষয়টির বিবরণ দেয়া হল ঃ

খৃষ্টানেরা হযরত ঈসা (আঃ) কে আল্লাহর পুত্র হিসাবে বিশ্বাস করে। আল্লাহ কুরআনে বহু স্থানে খৃষ্টানদের এই ভ্রান্ত আকীদার প্রতিবাদ করে বলেছেন যে, আল্লাহর সহধর্মিনী নেই। পিতা নেই। মাতা নেই। পুত্র সন্তানও নেই। তিনি এক অদ্বিতীয়। আল্লাহ তাআলা সূরা ইখলাসে বলেনঃ ( হে নবী তুমি বলে দাও, তিনি আল্লাহ একক। আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জম্ম দেননি এবং কেউ তাকে জম্ম দেয়নি এবং তার সমতুল্য কেউ নেই। ) কথাগুলো কত সুন্দর, কত স্পষ্ট। তিনি কাউকে জম্ম দেননি এবং কেউ তাকে জম্ম দেয়নি। এখন  যদি কেউ বলে যে, মুহাম্মদ (সাঃ) কে আল্লাহ নিজ নূর দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, তাহলে তার কথা কি কুরআনী এই বাণীর বিপরীত নয়? অন্যদিকে নাসারারা যখন বলল, ঈসা আল্লাহর পুত্র, তখন তারা মুশরিক কাফের ইসলাম বহির্ভূত দল। আর যখন অনুরূপ কথা নামধারী কিছু মুসলিম বললঃ ‘নবী হচ্ছেন আল্লাহর নূর’। প্রথমে আল্লাহ নিজ নূর দ্বারা নবীর নূরকে সৃষ্টি করেন তারপর সমগ্র পৃথিবীকে সেই নূর দ্বারা সৃষ্টি করেন, তাহলে তারা ইসলাম বহির্ভূত দল নয়। এই আকীদার লোকেরাই আবার দাবী করছে, তারাই নাকি সুন্নী দল। মুসলিম উম্মার অন্যান্য ভাইদের জোর গলায় কাফের বলে ফতোয়াবাজী করতেও দ্বিধা  করছেনা।

    আল্লাহ প্রথমে নবীর নূরকে সৃষ্টি করেছেন। পরে সেই নূর দ্বারা সারা জাহান তৈরী করেছেন। ধারণাটি হিন্দুইজমের আকীদার সাথেও যথেষ্ট মিল রাখে। তাদের বিশ্বাস, ইশ্বর প্রথমে ব্রম্মা বা পরমাত্মাকে সৃষ্টি করে।  তার পর পরমাত্মা থেকে সমস্ত আত্মা তথা সারা বিশ্বকে সৃষ্টি করে।

   এরপরেও কি আমরা এই আকীদাহ রাখব? আল্লাহর কাছে দু’আ করি যেন, তিনি নিজ করূণায় এই পুস্তক দ্বারা পথভ্রষ্ট ভাইদের  সঠিক পথের দিশা দেন। আমীন!

            আরো কয়েকটি ঠুন্কো সংশয়

প্রতিপক্ষের ভাইয়েরা বর্ণিত দলীল প্রমাণ ছাড়াও আরো কিছু কাল্পনিক যুক্তি ও কেচ্ছা কাহিনী দ্বারা জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করে থাকে। সে সমস্ত যুক্তি-তর্ক মূলতঃ কোনো দলীল নয় এবং তেমন গুরুত্বপূর্ণও নয়। তাই সেই সমস্ত সংশয়ের বর্ণনা এবং পর্যালোচনা করা অনুচিত মনে করলাম। তার পরেও দু’একটি কাল্পনিক চিন্তা ধারার উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি।

 *  তারা বলেনঃ নবীজী যদি নূরের তৈরী না হতেন, তাহলে মেরাজের সময় আল্লাহর একেবারে নিকটবর্তী কিভাবে হলেন? অন্যদিকে মুসা (আঃ) যখন আল্লাহর দর্শন কামনা করেন, তখন মহান আল্লাহ নিজ সত্তার বিন্দু মাত্র প্রকাশ করতেই পাহাড় ফেটে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। মূসা নবী অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যান।

   উত্তরে বলা যেতে পারে যে, আদম (আঃ) কে আল্লাহ নিজ হাতে তৈরী করেন। কিন্তু তিনি কি পুড়ে গেছিলেন ? না। কথা হল, আল্লাাহ যদি চান তাহলে তার নূর দ্বারা কাউকে জালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারেন। আবার কারো জন্যে তা মধুময় চিরশান্তির করে দিতে পারেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য তাই করে দেন। এমন নয় যে, নূরের তৈরী হতে হবে তার পরেই আল্লাহর কাছে যেতে পারবে। তাছাড়া প্রমাণ আছে যে, যখন নবী (সাঃ) কে মেরাজে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন ফেরেশতা তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করে , জমজমের পানি দ্বারা অন্তর ধৌত করেন। সেই সময় হয়তঃ ফেরেশতাগণ এমন কিছু ক্ষমতা নবী (সাঃ) এর বক্ষে ঢুকিয়ে দেন যে কারণে তিনি সপ্ত আকাশ পেরিয়ে আল্লাহ তাআলার সাথে কথোপকথন করতে সক্ষম হন।

* নূরের নবী প্রমাণে আবার কেউ বলেন ঃ একদিন মা আয়েশা কাঁথা সেলাই করছিলেন। হঠাৎ সুই হারিয়ে ফেলেন। অন্ধকার ঘর। এমন সময় নবী (সাঃ) এর শরীর থেকে নূর দিপ্ত হয় এবং সুই কুড়িয়ে নেন।

 প্রথমতঃ এটি একটি নিছক কাল্পনিক বা নিজের তৈরীকৃত কেচ্ছা মাত্র। সহীহ সীরাত বা হাদীসে এর কোন প্রমাণ নেই।   দ্বিতীয়তঃ তিনি (সাঃ) নূরের হওয়ার কারণে অন্ধকারে যদি সুই খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে শুধু সেই রাতেই আলো হল কেন? নূরের হলে তো সবসময় আলো হওয়ার কথা।

  নবী (সাঃ) নূরের তৈরী একথা প্রমাণ করার জন্য এ ধরণের আরো অনেক আজগুবি, অবাস্তব ও উদ্ভট কিচ্ছা-কাহিনীর অবতারনা করতে দেখা যায়। যে গুলোর না তো সহীহ প্রমাণ আছে, আর না হাত পা আছে, আর না আছে ঐতিহাসিক সত্যতা। তাদের প্রতিউত্তরে  পুস্তকটিতে যা কিছু বর্ণনা করা হল, আশা করি বিবেকবান ভাইদের জন্য যথেষ্ট।

নবীজী ‘‘আমাদের মত’’ বলা কি অপরাধ ?

প্রতিপক্ষের অনেককেই বলতে শোনা যায়, তারা জনসাধারণকে বলে থাকে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ‘‘আমাদের মত মানুষ’’ বলা, নাজায়েয। ‘‘আমাদের মত’’ বাক্যটি তাঁর শানে বেআদবী। যারা এরকম বলে তারা ওহাবী। নবী ওলীর দুশমন-শত্র“। এমনকি এরকম বললে ঈমান নষ্ট হয়ে যায় বা বেঈমান হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

  প্রিয় পাঠকবৃন্দ! আসলে কি এই ধরণের বাক্য ব্যবহারকারী নবীজীর দুশমন? এই পরিপ্রেক্ষিতে কুরআন মজীদের দুটি আয়াত উল্লেখ করা হল। আল্লাহ তাআলা বলেন ঃ

( قُل إنّما أنا بشَرٌ مثلُكم يُوحى إلىَّ ) الكهف/১১০

অনুবাদঃ হে নবী! ( তুমি বলে দাও, আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমার নিকট অহী করা হয়। ) [কাহাফ/১১০]

একই শব্দের আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেন ঃ

( قل إنّما أنا بشرمثلكم يوحى إلىَّ ) فصلت/৬

অনুবাদঃ হেনবী! (তুমি বলে দাও, আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমার কাছে অহী আসে। ) [ফুস্সেলাত/৬]

‘মিসলুকুম’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘‘তোমাদের মত’’। আল্লাহ এই শব্দটি কুরআনে উল্লেখ করেছেন এবং নবী (সাঃ) কে আদেশ করেছেন যে, তিনি যেন তাঁর উম্মতকে জানিয়ে দেন যে, তিনি (সাঃ) তোমাদের মতই মানুষ। জানিনা তাহলে আল্লাহ তাআলাকেও কি নবীর দুশমন বলা হবে? নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক। অবশ্যই নবীজী সাধারণ মানুষের মত ছিলেন। সাধারণ মানুষের যেমন আকার-আকৃতি, তেমন তাঁরও ছিল। মানুষের যেমন খাওয়া-দাওয়া, বিবাহ-শাদী, ঘুম-নিদ্রা ইত্যাদির প্রয়োজন হয় তেমন তাঁরও প্রয়োজন হত। আর এ ব্যাপারটিই বুঝাতে চান যারা বলেন নবীজী ‘‘আমাদের মত’’। যে বাক্যটি স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন।

তবে এটাও সত্য যে, তিনি (সাঃ) ‘‘আমাদের মত’’ তাই তাঁর মর্যাদা, সম্মান, মাহাত্ম এবং তাঁর আদেশ-নিষেধও আমাদের মত। এটা কস্মিনকালেও না। এইরকম আক্কীদাহ পোষনকারী মুসলিম হতে পারেনা।

       অনুরূপ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ছিল বিশেষ কিছু গুণ। যেমন তাঁর দৈহিক অতিরিক্ত শক্তি, নামাযরত অবস্থায় পিছনে দেখার ক্ষমতা, নিদ্রা অবস্থায় আত্মা চেতন থাকা, বিসাল রোযা রাখার ক্ষমতা ইত্যাদি । এসব গুণাবলী নবী (সাঃ) কে মানুষের গন্ডী থেকে বের করেনা বরং তাঁর বিশেষ কিছু গুণকে প্রমাণ করে যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজিত নয়।

বাড়াবাড়ির শেষ সীমা

যেহেতু নবী (সা:) নূরের তৈরী বিশ্বাসটি, তাঁর প্রতি অতিভক্তি এবং অতিরঞ্জনের ফলাফল। তাই অসঙ্গত হবে না যদি আমরা তাদের বাড়াবাড়ির বৃত্তান্ত হতে কয়েকটি নযীর পেশ করার প্রচেষ্টা করি। তার পূর্বে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, দশরথপুত্র রামচন্দ্র হিন্দুদের নিকট একজন অবতার এবং ভগবানরূপে স্বীকৃত। অবতার এইরূপে যে, তিনি ভগবান বিষ্ণুর সপ্তম অবতার ছিলেন। [ সংসদ বাংলা অভিধান/ ৫২৫ ] আর ভগবান এইরূপে যে, কারো কারো নিকট স্বয়ং ভগবান মানুষরূপী রাম হয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন। এই মতবাদ স্মরণে রেখে এবার নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই হি ওয়া সাল্লামের সম্পর্কে অতিরঞ্জনকারীদের কয়েকটি ভক্তিকথা পড়–ন। দেখবেন মতবাদদ্বয়ের মধ্যে কি কোনো অমিল পাওয়া যায় ?

নূর নবী আক্কীদাহ পোষনকারীদের জনৈক কবি বলেছেন ঃ

(ক)  وهى جو مستوى عرش تها خدا هو كر

اتر يرا هى مد ينه مين مصطفى هو كر

তিনিই যিনি আরশে ছিলেন খোদারূপে, অবতরণ করেন পৃথিবীতে মুস্তফারূপে।

(খ) আবার কেউ বলেন ঃ ‘ আরশে যিনি আহাদ্ ছিলেন, ফরশে (যমিনে) তিনি আহমদ হলেন’।  [আহাদ হচ্ছেন আল্লাহ আর আহমদ্ হচ্ছেন নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই হি ওয়া সাল্লাম]।

(গ) আবার কেউ বলেনঃ

‘ আহমদের ঐ মীমের পর্দা উঠিয়ে দে রে মন

দেখবি সেথা বিরাজ করেছে আহাদ নিরঞ্জন’।

অর্থাৎ আহাদ ও আহমদের মাঝে শুধু মীম অক্ষরের পার্থক্য রয়েছে, মীমকে মাঝ থেকে সরিয়ে দিলে আহাদ আর আহমদের মাঝে কোনো পার্থক্য থাকবে না, এক হয়ে যাবে।

(ঘ) আবার কারো উক্তিঃ ‘ রাসূলে খোদা খুদ খোদা বানকে আয়া’। আল্লাহর রসূল স্বয়ং খোদা হয়ে আগমন করেছিলেন।

(ঙ) কেউ আবার এভাবে বলেনঃ

“محمد كرجه خدا نهين ليكن خدا سى جدا بهى نهي “

‘ মুহাম্মদ যদিও খোদা নন, কিন্তু তিনি খোদা থেকে পৃথকও নন’।

(চ) এই মর্মে কারো মত এভাবে প্রকাশ পেয়েছে ঃ

محمد با شكل عرب آمده است * عين را حذف كن كه رب آمده است

‘ মুহাম্মদ (সাঃ) একজন আরবী মানুষের আকৃতিতে আগমন করেছেন, আরব শব্দের ‘আইন’ অক্ষরকে বিলুপ্ত করে দিলে দেখতে পাবে প্রকৃতপক্ষে রবই আগমন করেছেন’।

[ দেখুন, শির্ক কি ও কেন ? ২৮০-২৮১ ]

নূরের নবী আকীদার ক্ষতিকারক ১০টি দিক

১-  খৃষ্টানরা ঈসা (আঃ) কে আল্লাহর পুত্র বিশ্বাস করে তাঁর সাথে যে অংশী স্থাপন করেছে। মুসলমান নামধারী এই দলটি তার চাইতেও ভয়ানক এবং জঘন্য কথা বলেছে। কেননা তারা নবী (সাঃ) কে আল্লাহর নূর থেকে তৈরী বিশ্বাস করার মাধ্যমে , তাঁকে আল্লাহর অংশ হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। তাই এ বিশ্বাস স্থাপনে খৃষ্টানি এবং ইসলামি আকীদাহ  এক হয়ে যায়। মুসলিম এবং মুশরেকের আক্কীদাহ সমান হয়ে যায়।

২- এ বিশ্বাস স্থাপনে জরূরী হয়ে যায় আর এক বিশ্বাসের তা হল , নবী (সাঃ) কবরে পৃথিবীর জীবনের ন্যায় জীবিত। কারণ যেমন আল্লাহ চিরঞ্জীব তার মৃত্যু নেই তেমন তাঁর নূরও চিরঞ্জীব, তারও মৃত্যু নেই।

৩- এ বিশ্বাসের রেশ ধরেই পীর এবং ওলীরা জনসাধারণকে ধোকায় ফেলে এবং বলে ওলীরাও কবরে জীবিত। কারণ তারা নাকি নবীগণের উত্তরাধিকারী। তাই নবীগণ যেমন কবরে জীবিত তেমন তাঁদের উত্তরাধিকারী ওলীরাও জীবিত। আর জীবিত প্রমাণ হলে রাস্তা সাফ। এবার বুঝান হবে মৃত্যুর পরেও আমরা জীবিত তাই আমাদের কবর-দর্গাহে আস, নজর-মান্নত কর, বাবাকে খুশি কর, তাহলে আমরা তোমাদের জন্য সুপারিশ করে দেব।

৪- পৃথিবীর প্রারম্ভ থেকে আজ পর্যন্ত আল্লাহ মানব জাতির হিদায়েতের উদ্দেশ্যে মানবকেই নবী করে প্রেরণ করেছেন। উল্লেখিত আকীদার দ্বারা আল্লাহ তাআলার সেই সুন্দর নিয়মে হস্তক্ষেপ করা হয়। অর্থাৎ সর্বশেষ উম্মতের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ কোন মানুষকে নবীরূপে প্রেরণ না করে তাঁর নূরের তৈরী ভিন্ন স্বভাবলম্বী কাউকে নবী করে পাঠান।

৫- নবী (সাঃ) কে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানব জাতির সারি থেকে বহির্ভূত করা হয়। কারণ মানুষ মাটির তৈরী এবং তাদেরকে সৃষ্টির সেরা জাতি বলা হয়েছে কিন্তু নূরের তৈরী কোনো জাতি বা কোনো ব্যক্তিকে তা বলা হয়নি।

৬- যে সমস্ত আয়াতে আল্লাহ নবীকে বাশার বা মানুষ বলেছেন এবং যে সমস্ত সহীহ হাদীসে নবীজী নিজেকে বাশার বলেছেন, তার অস্বীকার করা এবং তার অপব্যাখ্যা করা জরূরী হয়ে যায়।

৭- অমুসলিমদের নবীজীর প্রতি ঈমান আনয়নে বাহানা করার দরজা উম্মুক্ত করে দেওয়া হয়। কারণ তারা বলার সুযোগ পায় যে, মুহাম্মদ তো আমাদের মত মাটির তৈরী মানুষ নয়। যদি আমাদের মত মাটির হত তাহলে ঈমান আনতাম।

৮- নবী (সাঃ) এর অসংখ্য সৎগুণাবলীকে হেয় নজরে দেখার সুযোগ করে দেয়া হয়। কারণ তারা বলবে: তিনি নূরের বলে এসব সম্ভব হয়েছিল মানুষ হলে অসম্ভব ছিল।

৯- কয়েকটি সহীহ হাদীসকে অস্বীকার করা হয়। যে সমস্ত হাদীসে কলমকে প্রথম সৃষ্টি বলা হয়েছে।

১০- উম্মতের শ্রেষ্ঠ মনিষীগণ, যেমন সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন এবং আইম্মাহগণ যে বিষয়কে কেন্দ্র করে আলোচনা বা বিতর্ক করার প্রয়োজন মনে করেননি এমন এক বিষয়ের অবতারনা করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়।

সমাপ্ত

                                   ১ম যিল্ হিজ্জাহ ১৪২৬ হিঃ

                                                   ১-১- ২০০৬ খৃঃ

পুস্তকটি লেখতে যে সমস্ত বইয়ের সাহায্য নেওয়া হয়েছে
১- আল্ কুরআন আলকারীম।
২- তফসীরে তাবারী। প্রকাশক, দারূ ইহ্ ইয়াইত্ তুরাস আল্ আরাবী ২০০১ খৃঃ ।
৩- তফসীরে কুরতুবী, দারূ আলামিল কুতুব, রিয়াদ, ২০০৩ খৃঃ।
৪- তফসীর ইবনু কাসীর, দারূল মারিফা বৈরূত, লেবানন, ১৯৮৬ খৃঃ
৫- তফসীর ফী যিলালিল কুরআন, সাইয়্যেদ কুতুব, দারূশ্ শারূক, বৈরূত, ১৯৯৬ খৃঃ
৬- তফসীরে সাদী, মুআস্ সাসাতুর রিসালাহ, বৈরূত, ১৯৯৮খৃঃ।
৭- কুরআনুল কারীম উর্দু তরজআ ও তফসীর, শাহ ফাহাদ কুরআন প্রকাশনা, মদীনা।
৮- সহীহ বুখারী ফতহুল বারী সহ, দারূস্সালাম রিয়াদ, ২০০০খৃঃ।
৯- সহীহ মুসলিম ইমাম নাওয়াভীর শারহ সহ, দারূল মারিফাহ, ১৯৯৯ খৃ ঃ।
১০- তিরমিযী তুহফাতুল আহওয়াযী সহ, দারূল কুতুব আল্ ইলমিয়াহ বৈরূত।
১১- সুনান নাসাঈ।
১২- সুনান আবুদাউদ।
১৩- সিল্ সিলা সহীহা (সহীহ হাদীস সিরিজ) শাইখ আলবানী, মাকতাবাতুল মাআরিফ, ২০০২ খৃঃ।
১৪- সিল্ সিলা যয়ীফাহ (যয়ীফ হাদীস সিরিজ) শাইখ আল্ বানী, মাকতাবাতুল মাআরিফ, ২০০২ খৃঃ।
১৫- আত্ ত্বাবাকাত আল্ কুবরা, ইবনু সাআদ, দারূল কুতুব আল্ ইলমিয়াহ বৈরূত। ১৯৯৭ খৃঃ।
১৬- শারহু আক্কীদাতিত তাহাবিয়্যাহ, ইবনু ইয্, সউদী ধর্ম মন্ত্রণালয় হতে প্রকাশিত, ১৪১৮ হিঃ।
১৭- মাউযু আউর মুনকার রিওয়ায়েত, ডঃ সাইয়্যেদ সাঈদ আহমাদ, বায়তুস্ সালাম, ২০০৫ খৃঃ।
১৮- রাদ্দে আক্বাঈদে বিদইয়্যিাহ, মাওলানা নযীর আহমদ রাহমানী , জামেয়া সালাফিয়্যাহ বেনারস, ১৯০৬ খৃঃ।
১৯- শিরক কি ও কেন? ড. মুহাম্মদ মুয্ যাম্মিল আলী, প্রকাশনায়, এডুকেশন সেন্টার, সিলেট, বাংলাদেশ। ২০০৭ খৃঃ।
১৯- আল্ কামুস আল্ মুহীত, ফিরূযাবাদী, মুআস্ সাসাতুর রিসালাহ, বৈরূত ১৯৮৭ খৃঃ।
২০- আল্ মুজাম আল্ ওয়াসীত্ব, মাকতাবা ইসলামিয়াহ,  ইস্তাম্বুল, তুরষ্ক।
_______________________________________________________________________________________
                                    
লেখক: শাইখ আব্দুর রাকীব (মাদানী)
লিসান্স, মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রভাষক ও দাঈ, জামেয়াতুল ইমাম আল বুখারী, কিশনগঞ্জ, ভারত
Email: a.raquib1977@yahoo.com

আরও পড়ুনঃ নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নূরের তৈরী, না মাটির তৈরী?

“প্রশ্নোত্তর” বিষয়ের উপর আরও পড়তে এইখানে ক্লিক করুন।
“বিদ’আত” বিষয়ের উপর আরও পড়তে এইখানে ক্লিক করুন।

পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না কিন্তু।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন